বিষ্ণুকে পাওয়ার জন্য সমুদ্রের মধ্যে কঠোর তপস্যা করেছিলেন দেবী লক্ষ্মী!

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে আজ ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা হবে। সাধারণত এই পুজো হয় দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে। তবে এবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে কার্তিক মাসে। ‘কোজাগরী’ শব্দটি এসেছে ‘ কো জাগতী’ বা ‘কে জেগে আছো’ কথার থেকে। ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাস, কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী খোঁজ নেন, কে কে জেগে আছে। এই রাতে জেগে থাকলে দেবীর কৃপা পাওয়া যায়। যার ধনসম্পত্তি নেই, সে পাওয়ার আশায় জাগে। যার আছে, সে জাগে না হারানোর আশায়। এছাড়াও প্রত্যেক বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজো হয়ে থাকে অনেক গৃহস্থ বাড়িতে। কোথাও কোথাও ভাদ্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি, দীপাবলীতে লক্ষ্মীর আরাধনা করেন ভক্তেরা। 

ধর্মপ্রাণ বাঙালিরা দেবী লক্ষ্মীকে মনে করেন শিব-পার্বতীর সন্তান। যদিও পুরাণ অনুযায়ী তিনি ঋষি ভৃগুর কন্যা। তাঁর মায়ের নাম খ্যাতি। ধাতা ও বিধাতা নামে লক্ষ্মীর দুই ভাই রয়েছেন। স্কন্দ পুরাণে বলা আছে, নারায়ণ বা বিষ্ণুকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে কঠোর তপস্যা করেছিলেন দেবী লক্ষ্মী। ইন্দ্র এবং অন্যান্য দেবতারা বিষ্ণুর ছদ্মবেশে তাঁর কাছে হাজির হন। লক্ষ্মী জানতেন, একমাত্র বিষ্ণুই পারেন বিশ্বরূপ দেখাতে। তিনি বিশ্বরূপ দেখানোর জন্য দেবতাদের অনুরোধ করেন। তাঁরা না পেরে বিদায় নেন। অবশেষে লক্ষ্মীর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু গিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং বিশ্বরূপ দর্শন করান। বিষ্ণুর হাতে কন্যা লক্ষ্মীকে সমর্পণ করেন মহর্ষি ভৃগু। 

বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবত এবং মহাভারতে রয়েছে আরেক গল্প। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে স্বর্গরাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন লক্ষ্মী। দেবতারা হারালেন ধনসম্পত্তি। অসুররা গিয়ে স্বর্গরাজ্য দখল করে নিলেন। তখন দেবতাদের নিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা পরামর্শ দেন, এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন একমাত্র বিষ্ণু। তখন দেবতারা বিষ্ণুর শরাণাপন্ন হলেন। বিষ্ণু জানালেন, সমুদ্র মন্থন করতে হবে। তাহলে উঠে আসবে অমৃত, যা পান করে দেবতারা অমর হবেন। দেবী লক্ষ্মীকেও উদ্ধার করা সম্ভব হবে। অসুরদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষীরসমুদ্র মন্থন করা হল। উঠে আসল নানা রকম মণি-মাণিক্য-রত্ন, ঐরাবত হাতি, উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া এবং আরো কত কী! অমৃতের ভাণ্ড নিয়ে ধন্বন্তরী উঠলেন। সমুদ্র থেকে বেরিয়ে এলেন দেবী লক্ষ্মী। ঠাঁই নিলেন বিষ্ণুর বুকে।

প্রাচীন কাল থেকেই বঙ্গদেশে লক্ষ্মীর পুজো হয়ে আসছে। ত্রিবিক্রম রূপের বিষ্ণুর দুই পাশে শ্রী ও পুষ্টি অর্থাৎ লক্ষ্মী ও সরস্বতীর অধিষ্ঠান – এমন মূর্তি বাংলার নানা জায়গা থেকে পাওয়া গিয়েছে। বরিশালের লক্ষ্মণকাটি গ্রামে এক প্রকাণ্ড বিষ্ণুমূর্তি আবিষ্কার করা হয়েছে। তাতে বিষ্ণু গরুড়ের ওপর বসে আছেন। দু’দিকের দুই হাতে পদ্মনালের ওপর লক্ষ্মী-সরস্বতী। অন্য দুই হাতে চক্রপুরুষ-সহ চক্র ও গদাদেবী। এটি গুপ্তযুগ অথবা তার কিছু পরে নির্মিত হয়েছিল। নানা তাম্রশাসনে লক্ষ্মী-নারায়ণের উল্লেখ দেখা যায়। বগুড়ায় একটি অষ্টধাতুর লক্ষ্মীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। দেবীকে স্নান করাচ্ছে দু’টি হাতি। এই ধরনের মূর্তিকে গজলক্ষ্মী বলা হয়। প্রাচীন বাংলার গজলক্ষ্মী মূর্তির খোঁজই বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া দুই হাত-বিশিষ্ট সাধারণ লক্ষ্মীমূর্তিও বেশ কিছু মিলেছে। 

তথ্যঋণ – রমেশচন্দ্র মজুমদার, নীহাররঞ্জন রায়, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থসারথী পাণ্ডা। 

Developed by DXDasia