সুনীলদার মূল উপন্যাসকে মাথায় রেখে কলকাতা ছাড়িয়ে আমরা চললাম শিমুলতলা

দুই বাংলার মহাকাব্য, ৪র্থ পর্ব

শিমুলতলায় ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর শুটিংয়ে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অন্যান্য কলাকুশলীরা 

২০০১ সালে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর পুরো দমে শুটিং চালু করলাম। বাংলাদেশে তখনও খালেদা জিয়া সরকার, ভারতবর্ষে তখন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার। বাংলাদেশে সেই মৌলবাদী ‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র বাহিনী। আর কলকাতায় ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ’-র রমরমে বাজার। দশ বছর পর এদের কারুরই কোনো হেলদোল ছিল না। এরই মধ্যে চালু হল ‘পূর্ব-পশ্চিম’। সুনীলদাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম।

(গত পর্বের পর) 

বাংলাদেশের ‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিষিদ্ধ করার দাবি এবং পরবর্তীকালে ভারত সরকারের নির্দেশের অভিঘাতে আপাতত প্রযোজনা প্রক্রিয়া বন্ধ রাখলাম।  কত দিন পরে আবার নতুন করে এই প্রযোজনা শুরু করা যায়, সেই ভাবনা যদিও বন্ধ হল না। আগেই লিখেছিলাম, ইতিমধ্যে কলকাতার প্রায় সব স্তরের কলাকুশলীরা যোগাযোগ করা শুরু করেছিলেন। যেমন সব ক্ষেত্রেই করে থাকেন। তফাতটা এই যে, যাঁরা এই প্রযোজনায় পার্ট চাইছিলেন, তাঁরা বা তাঁদের পরিবার কোনো না কোনোভাবে ওপার বাংলার সঙ্গে জড়িত। কলাকুশলীদের মধ্যে এই ভাবনাটা কোনো কারণে ঢুকে পড়েছিল যে, এই প্রযোজনা কেবলমাত্র পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যাঁদের আত্মিক যোগ, তাঁদেরকে নিয়েই করা হবে। এমনও হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে ওপার বাংলার কোনো সম্পর্কই নেই, যাঁদের জন্ম-কর্ম-বেড়ে ওঠা কলকাতায়, তাঁরা কিছুটা হলেও ইতঃস্তত করছিলেন পার্ট চাইতে। 

তারই পাশাপাশি টেলিভিশন মাধ্যমে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছিলাম। ১৯৯০ সালে ইতালিতে দেড় মাস ধরে থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম সিরিজ দূরদর্শনের জাতীয় চ্যানেলে সম্প্রচার করলাম। কলকাতা থেকে ৬ জন কারিগরি সহায়ক নিয়ে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি ইতালির রোম শহরের একটা হোটেল রুমে সেট আপ করানো হল। সেখান থেকে প্রত্যেক দিন স্যাটালাইটের মাধ্যমে ‘বিশ্বকাপ ইটালিয়া নাইনটি’-র সমস্ত খবরাখবর, ফিচার, ভারতে পাঠানো হত। আমাদের সংস্থাকে ফিফা এশিয়ার প্রথম বেসরকারি সংস্থা হিসেবে বিশ্বকাপের ঘটনা (Sidelights Italia 90) কভার করার অনুমতি দিয়েছিল। জুরিখে ফিফার সঙ্গে ফিফা হাউজে তৎকালীন সেক্রেটারি সেপ ব্লাটারের উপস্থিতিতে MOU স্বাক্ষর করেছিলাম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ফিফা পরিচালিত ওয়ার্ল্ডকাপের ঘটনা কভার করার এক্সক্লুসিভ স্বত্ব চেয়ে। সেই সুবাদে আমরা ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ চিনের ওয়াংঝাও শহরে প্রথম ফিফা উইমেনস ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপ কভার করি। ‘দর্পণ’ নামে বাংলা টেলিভিশনের প্রথম নিউজ কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সিরিজও চালু করি আমরা। ১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম আলোচনা-সহ সরাসরি সম্প্রচারের জন্য প্রযোজনাও করেছি। প্রথম ইটালিয়ান সকার এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখানোর ব্যবস্থা করি বাংলার অগণিত ফুটবলপ্রেমীদের জন্য। এরকমই নানাভাবে ছোটোপর্দার সঙ্গে নন-ফিকশন প্রযোজনায় দিন, মাস, বছর কাটতে থাকে। কিন্তু, সুনীলদাকে দেওয়া কথা, ভিতরের বাঙালপনা, সব মিলিয়ে এত সবের মধ্যেও ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর বেড়াজাল থেকে বেরোতে পারিনি। 

চিন্তার মধ্যে থাকত, উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্র প্রতাপ আর মামুন কারা টেনে নিয়ে যেতে পারবে। মনের মতো অভিনেতা পাওয়া যাবে তো? উপদেশের বন্যা আসতেই থাকত। কিন্তু, ঠিক মনের মতো হচ্ছিল না। আর যেহেতু আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো স্টারডমে বিশ্বাস করি না, তাই, বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশন জগতে পরিচিত এবং পপুলার মুখগুলো আমাকে খুব একটা উৎসাহ দিতে পারেনি। অসংখ্য ছবি আর অনুরোধ আসা শুরু করল। বাংলাদেশের থিয়েটারকর্মী বন্ধুবান্ধবদের কাছে বলা ছিল, উপন্যাসের চরিত্র অনুযায়ী কোনো সাজেশন থাকলে যেন জানায়। বাংলাদেশের চরিত্র কেবল বাংলাদেশি অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই করবে, আর এপারের চরিত্ররা কেবলমাত্র টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের মধ্যে সীমিত থাকবে, এই ভাবনা থেকে প্রথম বেরিয়ে এসেছিলাম আমরাই। তাই হয়তো, মামুনের মতো একটা চরিত্রের জন্য নাট্য অভিনেতা বিমল চক্রবর্তীকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল, জেলার নাটকের দলের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এই প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত করার। সেই মতো, শান্তিপুরের কিছু নাটকের দল, বহরমপুর রেপার্টারি-সহ আরও বেশ কিছু জেলাস্তরের দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হচ্ছিল। 

২০০০ সালে এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে পূর্ব পরিচিত একজন প্রোগ্রাম ইনচার্জ হয়ে যোগ দেয়। সে জানত ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর ইতিকথা। তার থেকেও বেশি বুঝত ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর মতো একটা প্রযোজনার গুরুত্ব। 

‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর শুটিংয়ের মাঝখানে চলছে আলোচনা 

ঠিক ১০ বছর পর আবার শুরু হল এই প্রযোজনার প্রক্রিয়া। বেসরকারি চ্যানেল থেকে অনুমতিপত্র এল। প্রথমে সুনীলদার কাছে গিয়ে সেটা জানালাম। বলা বাহুল্য, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বললেন, “বাঃ, তাহলে এবার শুরু করে দাও”।

পরিকল্পনা ছিল, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাস ঠিক যেভাবে শুরু হয়েছিল, ঘটনাপ্রবাহে যে জায়গাগুলোর উল্লেখ ছিল, সেখান থেকে কোনোরকম বিচ্যূতি করব না। উপন্যাসের শুরুতেই ছিল, প্রতাপ তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে শিমুলতলার দিকে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। কলকাতার যে কোনো জায়গায় সেটা শুট করতেই পারতাম, যেমন আর সব ছোটোপর্দার, এমনকি বড়োপর্দার প্রযোজনায় হয়ে থাকে। কিন্তু, ওই যে আগেই বললাম, উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ থেকে বেরোব না। তাই, ট্রেনে করে বাক্স-প্যাটরা, ছেলেমেয়ে-সহ শিমুলতলা পৌঁছনো এবং শিমুলতলায় শুটিং দিয়েই শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

আগামী পর্ব থেকে শুটিং-এর ঘটনা, বাধাবিপত্তি-সহ ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর চলার পথের অনেক ভিডিও নিয়ে আসছি। থাকছে কলাকুশলীদের স্মৃতিচারণাও। দুই বাংলার একমাত্র যৌথ টেলিভিশন প্রযোজনার গল্প এভাবেই মহাকাব্যিক গতিতে এগোতে থাকবে। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia