এপার বাংলা থেকেও ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিষিদ্ধ করার দাবি উঠল

দুই বাংলার মহাকাব্য, ৩য় পর্ব

দুই বাংলার টেলিভিশন সিরিজ ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট 

শুধু বাংলাদেশেই কেন, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিয়ে এপার বাংলাতেও এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়েছিল। ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ’ নামে কোনো এক সংস্থা, যাদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আদতে কী তাদের কার্যকলাপ, সেটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল। তৎকালীন এক প্রবীণ, সম্মানীয় ব্যক্তি, যিনি হয়তো পদ্মার ওপার থেকে চলে এসেছিলেন অনেকের মতো, ছিলেন এই সংস্থার কর্ণধার। ঢাকা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের পর কলকাতা প্রেস ক্লাবে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিয়ে এপার বাংলার মানুষকে জানান দেওয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ‘মৈত্রী’ সংস্থা থেকে ফোন আসতে শুরু করে। আমরা কারা, আমাদের কী উদ্দেশ্য, ভারতকে কীভাবে এই প্রযোজনায় দেখানো হচ্ছে, সেটা কতটা সমীচীন – ইত্যাদি বহু তাঁদের প্রশ্ন। প্রশ্ন এবং প্রশ্ন করার ভঙ্গিমায় বোঝানোর চেষ্টা, যে দুই বাংলার মানুষের সৌহার্দ্য এবং মৈত্রী বজায় রাখার ঠেকা নিয়ে বসেছিলেন ওঁরা। 

আমি তখন ব্যস্ত বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারির ভোররাতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট নেওয়ার প্রস্তুতিতে। এর মধ্যে বেশ কিছু মজার ঘটনা ঘটতে শুরু করল। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ টেলিভিশন প্রযোজনার কথা খবরের কাগজে বেরোনো শুরু করল। অভিনেতা অভিনেত্রীদের ঔৎসুক্য এবং যোগাযোগ চালু হতে লাগল। প্রায় প্রত্যেকেই এসে তাদের মা-বাবাদের ওপার বাংলার বসতভিটের কথা, বাড়িতে এখনও পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় কথা বলা, আর যা যা বাঙালপনায় তারা দিন কাটায় তার কথা বলা শুরু করতে লাগল। যেন, অভিনয় পারদর্শিতা অতটা প্রধান নয়, আমি কতটা বাঙাল, সেটাই একমাত্র সূচক ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ জায়গা পাওয়ার। বলা বাহুল্য, মনে মনে খুশি হলাম যে, হয়তো বা এই প্রযোজনা কিছু মানুষকে তাদের শিকড়ের খোঁজে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিল। ওই সময়কার প্রায় সমস্ত স্বনামধন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উৎসাহ ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও আবেগতাড়িত করেছিল। শিল্পী-কলাকুশলীদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হল।

কলকাতা থেকে হাইব্যান্ড ক্যামেরা, সঙ্গে পুনা ইনস্টিটিউট থেকে সদ্য স্নাতক এবং এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের প্রথম সারির সিনেম্যাটোগ্রাফার অমিত সেন, সহযোগী পরিচালক মিলন রায়চৌধুরী-সহ প্রায় আটজন বাসে এবং পরবর্তীকালে লঞ্চে করে পদ্মা পেরিয়ে ঢাকা পৌঁছলাম। একুশের ভোররাতে ঢাকার শহিদ মিনারে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ টেলিভিশন প্রযোজনার প্রথম শট। তখনকার সময় হ্যান্ডক্রেন জাতীয় কোনো উঁচু থেকে শট নেওয়ার যন্ত্রপাতি বাজারে আসেনি। বাংলাদেশে তো নয়ই। তাই, প্রথম শট অমিতকে মিলনের ঘাড়ে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হল। শহিদ বেদিতে একুশের ভাষাশহিদদের সম্মান জানানো ছিল দুই বাংলার টেলিভিশন সিরিজ ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট। দু’দিন ঢাকা থাকার পর সকলে কলকাতা ফিরলাম। কংগ্রেস আমলের তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী শ্রী অজিত পাঁজার মন্ত্রক থেকে একটা চিঠি এল। চিঠিতে লেখা, “দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ প্রযোজনা আপাতত বন্ধ রাখা হোক। পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে”। খবর নিয়ে জানলাম, সেই ‘মৈত্রী’ সংস্থার কোনো অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার থেকে এহেন নির্দেশ। 

মিলন রায়চৌধুরীর ঘাড়ে উঠে প্রথম শট নিচ্ছেন অমিত সেন, পাশে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু) 

বাংলাদেশের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিষিদ্ধ করার আর কলকাতায় ‘পূর্ব-পশ্চিম’ বন্ধ রাখার মধ্যে যোগসূত্র একটাই – দু’দেশের এই দুই গোষ্ঠীর কেউই জানার চেষ্টা করল না, উপন্যাসটাকে ছোটোপর্দায় কীভাবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা। এরকম মানুষ বা এই ধরনের গোষ্ঠী ২০২০তেও আমরা আমাদের আশেপাশে সর্বত্র দেখতে ও শুনতে পাই, ২৭ বছর আগের মানুষগুলোর সঙ্গে এদেরও কোনো তফাত খুঁজে পাই না।

স্বভাবতই, মনটা কিছুদিনের জন্য হলেও একটু দমে গিয়েছিল। কিন্তু, ওই যে প্রথম পর্বে  জানিয়েছিলাম, নিজের অসীম ধৈর্য এবং রক্তে বাঙালপনার ওপর ভরসা রেখে সুনীলদাকে বলেছিলাম, “সুনীলদা, চিন্তা করবেন না, আমি আমার শেষ নিঃশ্বাসের আগে এই ‘পূর্ব-পশ্চিম’ শেষ করব”।

দীর্ঘ দশ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বহু রকমের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সুনীলদাকে দেওয়া সেই কথাটাই মনে ঘুরপাক খেত। 

২০০১ সালে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর পুরো দমে শুটিং চালু করলাম। বাংলাদেশে তখনও খালেদা জিয়া সরকার, ভারতবর্ষে তখন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার। বাংলাদেশে সেই মৌলবাদী ‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র বাহিনী। আর কলকাতায় ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ’-র রমরমে বাজার। দশ বছর পর এদের কারুরই কোনো হেলদোল ছিল না। এরই মধ্যে চালু হল ‘পূর্ব-পশ্চিম’। সুনীলদাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia