ভারতীয় টেলিভিশনে প্রথমবার বিশ্বকাপ-যুদ্ধ

দূরদর্শনের ইতিহাসে দ্রুততম অ্যাপ্রুভাল। ন্যাশনাল নেটওয়ার্কের প্রাইমটাইমে বিশ্বকাপ চলাকালীন আধঘণ্টার স্লট

গল্ফগ্রিন দূরদর্শনের অফিসে নিয়মিত যাওয়া-আসা ছিল আমার। পি কে ব্যানার্জিকে সঞ্চালক করে ইটালিয়ান সকার লিগ দেখানো চলছিল তখন। সেই সুবাদেই যাতায়াত। তেমনই এক দুপুরে, ক্যান্টিনে চা-সিঙাড়া খেতে খেতে সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার বিশ্বকাপ কভার করব। হাতে মাস তিনেকও সময় নেই। যা করার খুব দ্রুত করতে হবে। কিন্তু প্রথমে এই কথা কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতেও পারছিলাম না। কারণ, এটা এমন স্তরের চিন্তাভাবনা যে কে কীভাবে নেবে,  হাসিঠাট্টা করবে কি না-– সেই টেনশনও ছিল। কিন্তু আবার এমন কিছু বন্ধুবান্ধব ও চেনাজানা মানুষও ছিলেন, যারা আগেকার আন্তর্জাতিক কোল্যাবোরেশনের বিভিন্ন টেলিভিশন প্রোগ্রামগুলোর সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত। তাই শেষপর্যন্ত কে কী ভাববে বা বলবে, তাকে খুব একটা প্রাধান্য দিইনি।

দিল্লির মান্ডি হাউস বা জুরিখে ফিফার সঙ্গে অফিশিয়ালি কাজটা কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তার পরিকল্পনা শুরু করাটাই ছিল প্রধান ভাবনার বিষয়। এক বন্ধুর পিসেমশাই সেই সময় কেন্দ্রীয় তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি ও ফিনানশিয়াল অ্যাডভাইসার ছিলেন। পি কে সরকার। প্রথমে বন্ধুর সূত্রে ও পরে টেলিফোনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে, দিল্লি যাওয়ার জন্য কালকা মেলে চড়ে বসলাম। উদ্দেশ্য শাস্ত্রী ভবন যাওয়া। আমি আর দেবকান্ত অশোক যাত্রীনিবাসে তিন-চার রাত থাকার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লি পৌঁছোলাম।

পুরো সিরিজের পরিকল্পনাটা একটা প্রোপোজাল ফর্মে লেখা হল এবং সেদিন বিকেলেই কনট প্লেসের পাশে একটা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে প্রিন্ট আউট নিলাম। পরেরদিন বেলা এগারোটায় সরকার সাহেবের সঙ্গে মিটিং। রাতে ঘুম উবে যাওয়ার অবস্থা। হয় হ্যাঁ হবে, অথবা না। এর মাঝামাঝি কিছু হতে পারে না। অন্তত মান্ডি হাউস বা শাস্ত্রী ভবনে ১৯৮৬ থেকে যাতায়াতের ফলে আমার অভিজ্ঞতা তাই-ই বলে। ফলে, বন্ধুর পিসেমশাই অতএব আমারও পিসেমশাই। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া এবং একটা সিদ্ধান্ত পাওয়া প্রায় ডু অর ডাই সিচুয়েশনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অভ্যাসমতো আমি আর দেবকান্ত পরেরদিন সকালে অশোক যাত্রীনিবাসের ক্যান্টিনে বেলা দশটায় রাজমা চাউল আর একপিস করে গোলাবজামুন খেলাম। তারপর অটোয় চেপে শাস্ত্রী ভবন যাওয়া। মাথায় ঘুরছে দূরদর্শন ভবন মান্ডি হাউসে আমার বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা। যদিও প্রায় প্রতিটি তিক্ত অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত কাজে পরিণত হয়েছিল। বেলা এগারোটা দশে সরকার সাহেব ডেকে পাঠালেন। মধ্যবয়স্ক, শান্ত সৌম্য চেহারা। বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, পিসেমশাই সবসময় নাকি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, আর নিজে প্রবাসী বাঙালি হয়েও বাংলা থেকে কারোর কিছু প্রস্তাব তাঁর কাছে পৌঁছোলে একটু আলাদা চোখে দেখেন। এসব হোমওয়ার্ক করেই গেছিলাম। অভিজ্ঞ আমলারা যেমন একনজরে একটা চিঠি দেখে তার আগাপাস্তালা উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন, ওঁর চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমার এই প্রস্তাব পড়ে উনি খুশি হয়েছেন। আমার মনে হওয়াটা আমার কাছে একধাপ এগোনো। ফোনটা তুলে দূরদর্শনের ডিরেক্টর জেনারেলকে সরকার সাহেব বললেন, ‘আই অ্যাম সেন্ডিং এ প্রোপোজাল অন দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ। মিস্টার ইন্দ্রজিৎ সেন, হু হ্যাজ কাম ফ্রম ক্যালকাটা, উইল টেক দ্য প্রোপোজাল উইথ হিম। ইজ ইট পসিবল ফর ইউ টু মিট হিম টুডে?’ বরাবরই জানি, সিনিয়রমোস্ট আমলাদের এহেন প্রশ্নের মানে হচ্ছে – সময় দাও, দেখা করো। আর একটা প্রচ্ছন্ন অ্যাপ্রুভাল।

বেলা এগারোটা পঁচিশে শাস্ত্রী ভবন থেকে বেরিয়ে মান্ডি হাউসের পাশে বেঙ্গলি মার্কেটের একটা রেস্টুরেন্টে সোয়া দুটো অবধি সময় কাটালাম। দূরদর্শনে মিটিং-এর সময় আড়াইটে। মান্ডি হাউসের মতোই, এই দোকানের মালিক থেকে ওয়েটার-– সবাই মুখচেনা। গত চার-পাঁচ বছর এতটাই নিয়মিত দূরদর্শনে যেতে হয়েছিল যে, তার ফলে এই দোকানেও একটা চেনা-পরিচিতির আওতায় ঢুকে পড়েছিলাম। চোখে শুধু ভাসছিল আমার এই ফাইলে নোটিং আর এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে তার আনাগোনা।

মান্ডি হাউসে ঢুকতেই রিসেপশনে দেখা হল আরেক পরিচিত মুখ মিসেস দাসের সঙ্গে। সরকারি চাকরির মেয়াদ আর একবছর বাকি। বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়েছেন তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের দূরদর্শনে। একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই যে, আবার নতুন কী আনলেন?’ কিছু বলিনি, শুধু হেসে নিজেদের নামধাম একটা চিরকুটে লিখে দিলাম।

হলফ করে বলতে পারি, ভারতের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের অধীনে দূরদর্শনের ইতিহাসে দ্রুততম অ্যাপ্রুভাল পেলাম আমরা। ন্যাশনাল নেটওয়ার্কের প্রাইমটাইমে বিশ্বকাপ চলাকালীন আধঘণ্টার স্লট – ‘সাইডলাইটস্‌ ইটালিয়া ৯০’ – বিশ্বকাপের ময়দান থেকে খেলার বাইরের উৎসাহ-উদ্দীপনা-ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ। এখন ভাবলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। ভারতীয় সংবাদপত্র থেকে কাগজে লেখার জন্য সাংবাদিক বন্ধুরা যেত কিন্তু টেলিভিশন মাধ্যমে ভারতবর্ষ থেকে এটাই প্রথম।

ফিফার সঙ্গে কথাবার্তা এগিয়েই ছিল। দূরদর্শনের অ্যাপ্রুভাল পাওয়ার একসপ্তাহের মধ্যে ফিফা ভারতের ইতিহাসে প্রথম একটি বেসরকারি টেলিভশন প্রোডাকশন সংস্থাকে অ্যাক্রিডিটেশন মঞ্জুর করল। এই দুই ‘প্রথম’-এর গুরুদায়িত্ব ঠাহর করতে পেরে শুরু করে দিলাম প্রস্তুতি – কে বা কারা দলে যাবে, কবে যাওয়া, ইতালিতে কোথায় থাকা, আপলিঙ্কিং-ডাউনলিঙ্কিং-এর সময় ইত্যাদি।

শুরু হল বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবনার রাজসূয় যজ্ঞ।

Post Tags
Developed by DXDasia