
এই প্রথম কোনও ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে মউ স্বাক্ষরে রাজি হল ফিফা
ভারতেও ফুটবলের বিশ্বকাপ হবে। এমনই স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। সেই স্বপ্ন বাস্তব করতেই পৌঁছে যাওয়া সুইজারল্যান্ড। ক্যালেন্ডারের হিসেবে ১৯৯০ সালের হেমন্ত তখন। প্যারিস থেকে সারারাত ট্রেনজার্নি করে জুরিখে পৌঁছালাম ২২ নভেম্বর। এখানেই ফিফার হেডকোয়ার্টার। আমাদের ভীষণভাবে মনে হয়েছিল, বাংলা তথা ভারতের ফুটবলকে বিশ্ব-মানচিত্রে জায়গা করে দিতে ফিফার সঙ্গে একটা গাঁটছড়া বাঁধা প্রয়োজন। জুরিখে আসার আগে প্রায় ছ-মাস ধরে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ, কথাবার্তা চলছিল এই বিষয়ে। ’৯০-এর ইটালিয়া বিশ্বকাপের পর থেকেই।
ফিফার সঙ্গে স্বাক্ষরিত মউ-এর বয়ান
জুরিখ পৌঁছোই ভোরবেলা। চারদিকে দুধসাদা বরফ। শীত এ দেশে আগেই চলে আসে। ওখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ইস্কন যাওয়া। জুরিখে ইস্কনের যে থাকার জায়গা, তার নীচের তলায় মন্দির ও ওপরে স্রেফ একটা থাকার ঘর। ট্যাক্সি করে পৌঁছোলাম। আমি ইস্কনের লাইফটাইম মেম্বারশিপ নিয়েছিলাম আগেই। বিদেশ-বিভুঁইতে গেলে যাতে সস্তায় থাকা যায়। জুরিখের ঘরটা ছিমছাম, কিন্তু জানলা খুলতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। পিছনে পাইন বন, বরফের চাদরে ঢাকা।
বেলা দুটোয় মিটিং-এর সময়। মিটিং-এ উপস্থিত থাকার কথা ফিফার জনসংযোগের কর্তা গিডো টোনিওনি-র, সঙ্গে তখনকার ফিফা সেক্রেটারি শেপ ব্লাটার। দুপুরবেলা ইস্কনেই খেলাম। আবার ট্যাক্সি নিয়ে, জুরিখে ফিফার হেডকোয়াটার্সে পৌঁছনো। প্রায় আধঘণ্টার মতো মিটিং হল এবং একটা মউ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হল। যার মূল বিষয়, ভারতে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করতে ফিফার সাহায্য পাওয়া। ওই মিটিং-এই বোঝা গেল যে, ভারত সম্পর্কে ওঁদের কিছু অদ্ভুত ধারণা আছে। ভারতে নাকি বড় রাস্তায় গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে গরুও চরে বেড়ায়। তাছাড়া, বাংলা তথা ভারতে ফুটবল নিয়ে যে বিপুল উদ্দীপনা, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আঁচ-আন্দাজও এঁদের ছিল না। অবশ্য, ফিফাকে ভারতের ফুটবল উন্মাদনা সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়ার জন্যই তো সুদূর বাংলা থেকে জুরিখ পৌঁছনো। প্রধানত বাংলাকে মাথায় রেখেই ফিফার সাহায্যের দিকে হাত বাড়ানো ছিল আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। মউ-এর বিভিন্ন শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা হয়ে একটা পরিণতিতে পৌঁছোল।
এর আগে কোনও ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে মউ স্বাক্ষর করেনি ফিফা। আমাদের সংস্থা ‘ওপেন এয়ার কমিউনিকেশন’ই প্রথম ভারতীয় সংস্থা যার সঙ্গে তারা মউ স্বাক্ষরে রাজি হল। অতএব, ভারতীয় ফুটবলের বিচারে দিনটা ঐতিহাসিকও বটে। মউ স্বাক্ষর হয়েছিল পরের বছর, মে মাসে। তা নিয়েও কিছু গল্প আছে, যথাসময়ে বলব।
আরও পড়ুন
“খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে”—বাঙালির বিশ্বকাপ
ইস্কনে আবার ফিরে এলাম। সেদিন রাতেই ট্রেন ধরে প্যারিসে ফেরা, সেখান থেকে মার্কিন মুলুকের দিকে যাত্রা। ইস্কন থেকে সন্ধেবেলা ট্রেন ধরতে যাওয়ার সময়, ইস্কনের একজন অস্ট্রেলিয়ান ভক্ত, যিনি ওই মন্দিরের তত্ত্বাবধায়কও বটে, আমার হাতে গুঁজে দিলেন একটা প্যাকেট। তাতে তাঁরই নিজের হাতে বানানো হালুয়া আর শিঙাড়া। বললেন, পথে যেতে যেতে খাবেন। অদ্ভুত আন্তরিকতা। জুরিখে বসে বাংলার স্বাদ যে জিভে এবং কাজে -– দুভাবেই পাব, ভাবিনি।
কিন্তু হঠাৎ বাংলা থেকে ফিফার হেড কোয়ার্টারসে যাওয়ার কারণই বা কী! ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে গলফগ্রিনে কলকাতা দূরদর্শনের ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে আমি আর আমার বন্ধু দেবকান্ত চক্রবর্তী ঠিক করেছিলাম, এবার ইটালিতে ফিফা বিশ্বকাপ কভার করতে যাব। তার জন্য যা যা প্রস্তুতি, সেগুলো নেওয়াও শুরু করব বলে ঠিক করি। মজাটা হচ্ছে, বিশ্বকাপ শুরু হতে তখন তিন মাসও বাকি নেই। বরাবর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খেলাবিষয়ক টেলিভিশন প্রোগ্রাম ভারতীয় দূরদর্শনে দেখানোর ব্যবস্থা করার তাগিদ ও অভিজ্ঞতা থেকেই আরও একধাপ এগিয়ে নিজেরাই একটা বিশ্বকাপে দলবল নিয়ে হাজির হওয়ার এই সিদ্ধান্ত আমাদের। হাতে সময় খুব কম, তাতে কী! বিশ্বকাপের ভূত ততদিনে চেপে বসেছে মাথায়। যে ভূতই পরে আমাদের টেনে আনবে খোদ ফিফার অফিসে।
(ক্রমশ)
