২৭ বছর আগে আজকের দিনেই হয়েছিল ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর মহরত

দুই বাংলার মহাকাব্য, ১ম পর্ব

১৯৯২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর মহরত 

বিষয়টা আমাকে বরাবরই ভাবাত এবং এখনও ভাবায়, যখন দেখি, গাড়ি বা ম্যাটাডোর করে এই প্রজন্মের হাজার হাজার ছেলে যাদবপুর, বিজয়গড়, গড়িয়া, দমদম, বেলঘরিয়া বা আরও অন্যান্য প্রান্ত থেকে লাল-হলুদ পতাকা ওড়াতে ওড়াতে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থনে ময়দান বা সল্টলেকে ভিড় জমায়। কীসের অমোঘ টানে এই ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন? তাদের বাবা-মারা বা ঠাকুরদা ঠাকুমারা হয়তো ১৯৪৭ বা ১৯৭১-এ সীমান্ত পেরিয়ে  এই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের বাসস্থান তৈরি করেছিলেন। হয়তো বা নিজেদের বাড়ির আকাশে বাতাসে ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামের ভাষা উড়ে বেড়াত। হয়তো বা ছোটোবেলা থেকে বাবা-মা’র মুখে শোনা তাঁদের বসতবাড়ির গল্প – পুকুর, দালান, বাবার প্রিয় বন্ধু আবুল সাহেবের দম ফাটানো হাসির উক্তি – সব মিলিয়ে দেশভাগ হলেও হয়তো বা তাদের মননে শুধু নয়, তারা নিজেদেরও হয়তো তাদের পরিবারের আগের প্রজন্মের বেড়ে ওঠার এক অঙ্গই মনে করে। এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া খুব মুশকিল। কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও আমার ভিতরে এই বাঙালপনা কীভাবে কার মাধ্যমে কোন রাস্তায় ঢুকে পড়েছিল, জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এসেও তার কোনো হদিস পাই না। 

দুই বাংলার বিভাজন এক প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু, কেবল রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক দ্বিখণ্ডতা কি বাঙালি সমাজকেও দু’ভাগ করতে সক্ষম হয়েছে? মনে হয় না! আমরা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি বাঙালির প্রতি বাঙালির সহমর্মিতা, অভিন্ন হৃদয়ের আশা-আবেগ-উল্লাস। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে আরম্ভ আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি – এপার-ওপারের বাঙালি জনজীবনে যার প্রভাব ও সক্রিয়তা আজও অম্লান। সেই বিশাল সময়ের ক্যানভাসে কবি-সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন ইতিহাসতুল্য উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’। যাকে বরং উপন্যাস না বলে বাঙালির আপাদমস্তক উপাখ্যান বলাই ভালো। গল্পচ্ছলে লেখক আসলে চুলচেরা বিচার করেছেন বাঙালির মূল্যবোধ এবং মানবিক দোষগুণের। যে উপন্যাসের দিগন্ত বিস্তৃত হয়েছে একদিকে দুই বাংলার গ্রামেগঞ্জে-শহরে তেমনই আবার, পশ্চিমে সুদূর আমেরিকায়। প্রকৃত এই এপিক প্রবাসী অনাবাসী আর আবাসী বাঙালির মধ্যে যথার্থ সেতুবন্ধ রচনা করতে সক্ষম হয়েছে। অসংখ্য তার চরিত্র, অসংখ্য শাখাপ্রশাখা, তবু গাছ একটাই। বাঙালির মনোজগৎ আর তার গতিপ্রকৃতি। সুনীলদা সবসময়েই তাঁর লেখার মধ্যে সেই শিকড়ের খোঁজে সচেষ্ট ছিলেন। ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর ক্ষেত্রেও চর্চা ও গবেষণায় কোনোরকম অন্যথা হয়নি।  এই সুবৃহৎ উপন্যাসের একটি একটি করে পাতা ওল্টালেই এক গভীর মমত্ববোধ তৈরি হয়।  

এপার বাংলা ওপার বাংলার মানুষেরা একে অপরের প্রতি কতটা আকর্ষণ অনুভব করেন তা একদিকে কলকাতার বাংলাদেশ থেকে আগত থিয়েটার, সিনেমা, সংগীতানুষ্ঠানে মানুষের আবেগ-আপ্লুত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই বোঝা যায়, অন্যদিকে বাংলাদেশেও একই চেহারা পাওয়া যাবে। এই আন্তরিকতা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং মিলনাকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যথার্থ উপায় হিসেবে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসটিকে টেলিভিশন সিরিয়ালে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যথার্থই কষ্টসাধ্য প্রয়াস, সন্দেহ নেই। 

তবে, ১৯৮৬-৮৭তে অস্ট্রেলিয়ায় স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ওপরে তৈরি ‘বডিলাইন’ মিনিসিরিজের সঙ্গে যুক্ত থাকা, ১৯৯০ সালে ইতালিতে ফুটবল বিশ্বকাপ কভার করতে যাওয়া, তারপরে জুরিখের ফিফা হাউজে তৎকালীন সেক্রেটারি সেপ ব্লাটারের সংগে MOU স্বাক্ষর করা এবং পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে দক্ষিণ চিনের গোয়াংঝাওতে ফিফার প্রথম মহিলা বিশ্বকাপ কভার করার ফলে প্রোডাকশনের ব্যাপ্তি বা স্কেল নিয়ে আর কোনো আড়ষ্টতা ছিল না। মনে হয়েছিল, রুচিহীন স্লথগতি অপটু সিরিয়াল এবং সাবানযাত্রা দেখে দেখে দর্শক যখন ক্লান্ত, তখন, দুই বাংলার প্রায় দু’শো কলাকুশলীকে এক ছাতার তলায় এনে ছোটোপর্দায় একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তৈরি করা প্রয়োজন।  

কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে তখন আলোচনা শুরু হয়নি। পরিকল্পনা ছিল, প্রাথমিক অবস্থায় সারা বিশ্বে হোম ভিডিও সার্ভিস ক্যাসেটে আগ্রহী ক্রেতা-দর্শকের কাছে ‘পূর্ব-পশ্চিম’কে পৌঁছে দেওয়া এবং পরবর্তী পর্যায়ে দূরদর্শন, বাংলাদেশ টিভি এবং বিদেশি চ্যানেলগুলিতে সম্প্রচার করা।

সুনীলদার সঙ্গে এক কমপ্লেক্সে থাকার দৌলতে এই আবদারটা নিয়ে একদিন সকালে দরজায় কলিং বেল বাজালাম। আমার ওই বয়সে দুই বাংলাকে নিয়ে এই বিশাল কর্মকাণ্ডের কথা খুব মন দিয়ে শুনলেন। এখনও মনে আছে, সুনীলদা সেই পরিচিত চেয়ারে বসে পা নাড়তে নাড়তে একদৃষ্টে শুনে গিয়েছিলেন আমার স্বপ্নের কথা। আমার বলা শেষ হল। উনি শুধু বললেন, “কবে থেকে শুরু করতে চাও ইন্দ্রজিৎ, আমি আছি”।

আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইচ্ছের কথাটা প্রথমেই ঢাকাতে বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। সুনীলদা এক কথায় রাজি।

আমি আর সুনীলদা একসঙ্গে ঢাকা রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। প্রস্তুতি নিলাম দুই বাংলার মহাকাব্যের এক ঐতিহাসিক স্বপ্নের কথা প্রথমেই ওপার বাংলার মানুষদের কাছে জানাতে।

(চলবে)
 

Developed by DXDasia