দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সবথেকে বড়ো সামরিক আত্মসমর্পণ ঘটেছিল ঢাকায়

আজ বাংলাদেশের বিজয় দিবস

১৯৭১ সালে আজকের দিনে পৃথিবীর বুকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল। এদিন ঢাকার রমনা রেসকোর্সে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। আজকের দিনটি বাংলাদেশে মহান বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হয়। 

পাকিস্তানের জন্ম হওয়ার সময় থেকেই তার পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ভয়াবহ আর্থিক শোষণের শিকার, সাংস্কৃতিকভাবেও পূর্ববঙ্গকে পঙ্গু করে রাখার চেষ্টা হত। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের ভোটে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন পরিষদে আওয়ামি লিগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের একক জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। পরিষদে তিনিই হলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা। এই নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি। এই দলের নেতা জুলফিকর আলি ভুট্টো শেখ মুজিবুরকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। এই নিয়ে বৈঠক চলে, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনও বাতিল করা হয়। 

মুজিব সারা দেশে ধর্মঘটের আহ্বান করলেন। সমস্ত পূর্ববঙ্গে শুরু হয় আন্দোলন। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে মুজিবের বৈঠক ব্যর্থ হয়। সেই রাতেই মুজিব ও তাঁর ৫ সহযোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে শেখ মুজিবুর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে যান। এদিকে পাকিস্তানি সেনা শুরু করে ভয়াবহ হত্যালীলা, যার পোশাকি নাম ছিল অপরেশন সার্চলাইট। সমস্ত পূর্ববঙ্গ জুড়ে মানুষ স্বাধীনতা লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করেন। পূর্ববঙ্গে অত্যাচারিত মানুষদের আশ্রয় দিতে সীমান্ত খুলে দেয় ভারত সরকার। ভারত সর্বতোভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনা। ঘটনার গতি অন্যদিকে ঘোরাতে ৩ ডিসেম্বর ভারতের ওপর বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার। ভারত সরাসরিভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী যুক্ত হয়ে তৈরি হল যৌথ বাহিনী। তারা দ্রুত পূর্ববঙ্গের দখল নিতে থাকে। এই সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে পাকিস্তান। 

শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দান (যার বর্তমান নাম সোহরাওয়ার্দি উদ্যান)-এ আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল নিয়াজি। প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা এভাবে আত্মসমর্পণ করে, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে বড়ো সামরিক আত্মসমর্পণ। ঢাকার রাস্তাঘাট মুখরিত হয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে সমস্ত পাকিস্তানি সৈন্যকে আত্মসমর্পণ করাতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লেগে যায়। এভাবেই সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ। রাষ্ট্রসংঘের সদস্য প্রায় সবক’টি দেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। 
 

Developed by DXDasia