ভোটের আগে ছক্কা হাঁকাচ্ছে ‘রাজনৈতিক’ সন্দেশ, জানেন কোথায়?

সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস, খেলা হবে – ট্রেন্ডিং মিষ্টি জমজমাট

একাশি বছর বয়স্ক যাদবপুরবাসী সদানন্দ ভট্টাচার্যের সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প হচ্ছিল। এইটবি বাসট্যান্ডের কাছে নচিকেতার চায়ের দোকানের সামনে প্রতিদিন আড্ডা দেন কিছু পুরোনো বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে। তাঁর মতে, “ভোট নিয়ে এত উন্মাদনা শুধুমাত্র ভারতের পক্ষেই সম্ভব। শুধু ভোট কেন, পুজো-বিয়ে-জন্মদিন-শ্রাদ্ধ-মিছিল-আন্দোলন সবকিছু নিয়েই সাংঘাতিক উন্মাদনা। ভারতের মানুষ উৎসবের আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে পছন্দ করেন। এই তিনি তেড়ে যাচ্ছেন কারোর ওপর, পরেরদিনই তাঁর বাড়িতে মিষ্টি পাঠাচ্ছেন।”

দেশের কথা ছেড়ে দিলাম, পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে এ কথাটি গভীরভাবে খেটে যায়। কারণটা অবশ্যই বাঙালি। বাঙালি মানেই হরেকরকম মিষ্টি। বিয়ে বাড়ি মানে মিষ্টি, শ্রাদ্ধ মানে মিষ্টি, মুখে ভাত মানে মিষ্টি, বাড়িতে অতিথি এলে মিষ্টি, পুজো মানে মিষ্টি – মিষ্টিপ্রেমী বাঙালি কি আর এমনি বলে! তবে এখন নতুন সংযোজন হয়েছে ভোটের মিষ্টি। আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে কলকাতা ছাড়িয়ে বাংলার বিভিন্ন জেলা-গ্রামে হইহই করে বিক্রি হচ্ছে ভোটের মিষ্টি। এ মিষ্টি কীরকম? কড়া পাকের সব সন্দেশ। তাতে রয়েছে বিভিন্ন ছাঁচ। রাজনৈতিক দলগুলির সিম্বল – সিপিএম (CPIM), তৃণমূল (AITC), বিজেপি (BJP), কংগ্রেস (CONGRESS)। এমনকি সাম্প্রতিককালে ট্রেন্ডিং ‘খেলা হবে’র ছাঁচও রয়েছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চিহ্ন দেওয়া এইসব সন্দেশ বেশ কিছু বছর ধরেই জনপ্রিয় হচ্ছিল। কখনও মোদির মুখ আবার কখনও দিদির মুখ। তেমনই একটি মিষ্টির দোকানের খোঁজ পেয়ে তড়িঘড়ি সেখানে যেতেই হল এবং চেখে দেখতে হল ভোট-মিষ্টির স্বাদ। 

লোকেশনঃ হিন্দুস্তান সুইটস (যাদবপুর, দক্ষিণ কলকাতা)

– “দাদা, আমাকে একটা সিপিএম, আরেকটা কংগ্রেস দিন।” (জোটের ভোট বলে কথা)
– “কংগ্রেসের তেমন চাহিদা নেই দাদা। কম করছি। আপনি বরং ‘খেলা হবে’টা খেয়ে দেখুন।”

তাই সই! একটা সিপিএম। একটা খেলা হবে।

আহা! খেলাম এবং উপভোগ করলাম। মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে জন্ম নেওয়া এই সব সন্দেশ অচিরেই প্রবল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দোকানে যিনিই আসছেন তিনিই কৌতূহল নিয়ে দেখছেন পার্টির প্রতীক আঁকা মিষ্টি। সাদা চৌকো কড়া পাকের সন্দেশ। এখন প্রশ্ন হল, যিনি এই মিষ্টি কিনবেন তিনি কী ভেবে কিনবেন? তিনি কি পছন্দের পার্টির চিহ্ন দেখে দেখবেন? নিজের পার্টিকে খেতে ইচ্ছে করবে? নাকি পেটের ভেতর পুরতে চাইবেন অপছন্দের দলকে? তাতে আবার হজমের সমস্যা হতে পারে।

পরিচিত কাচের শো-কেসে, চেনা মিষ্টির মধ্যে এমন অভিনব মিষ্টি পেয়ে খুশি ক্রেতারাও। স্বাভাবিক ভাবেই জানার কৌতূহল থাকে কোন দলের মিষ্টির চাহিদা বেশি? হিন্দুস্তান সুইটসের এক কর্মী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) উত্তর দেন, ‘খেলা হবে’র চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তারপরেই সিপিএম।

যাদবপুর অঞ্চলের বহু পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান হিন্দুস্তান সুইটস। এর আগেও তাঁরা মিষ্টি নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। লকডাউনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁরাই প্রথম বানিয়েছিলেন ‘করোনা’ মিষ্টি। যাদবপুরের হিন্দুস্তান সুইটসের দোকানের শো-কেসে থরে থরে সাজানো অবিকল করোনা ভাইরাসের মতো দেখতে মিষ্টি। আর তার পাশেই ছিল ‘করোনা’ কেক ও কুকিজ। এবার ভোট-মিষ্টি। লোকমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিষ্টিগুলির নাম।

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত হিন্দুস্তান সুইটসের মিষ্টি বাংলার অন্যান্য জেলাতেও সুপ্রসিদ্ধ। কর্তৃপক্ষের দাবি, তাঁরাই একমাত্র ভেষজ মিষ্টি প্রস্তুত করে থাকেন। গাজরের রসগোল্লা, জিলিপি, ভাজা মিষ্টি-সহ একাধিক ভেষজ মিষ্টিকে প্রাধান্য দেন তাঁরা। এছাড়াও দোকানের হার্বাল দই, স্পন্দন সন্দেশ, বিট দিয়ে তৈরি রক্তিম সন্দেশ কলকাতা বিখ্যাত। এবার নতুন সংযোজন ভোটের সন্দেশ। যার মূল্য ২৫ টাকা পার পিস।

মিষ্টি চেখে আবার গেলাম সদানন্দ জেঠুর কাছে। উনি কি খেলেন ভোটের মিষ্টি? উত্তর এল, “না খাইনি। চারদিকে যা অবস্থা! ওসব কড়া পাক খেয়ে এই বয়সে আর হজম করতে পারব না।”

ছবিঃ সুমন সাধু

Developed by DXDasia