কাঁচালঙ্কার রসগোল্লা!

মিষ্টিরসে টইটম্বুর বর্ধমানের চিলিগোল্লা, কামড় দিলেই কাঁচালঙ্কার স্বাদ!

আনন্দে কেঁদেছেন কখনও? কিংবা ভরা রোদ্দুরে বৃষ্টি হতে দেখেছেন? হেঁয়ালি নয়, এসবের কম্বোস্বাদ যদি মিস করতে না চান, তাহলে আপনাকে খেতেই হবে চিলিগোল্লা। চিলি অর্থাৎ লঙ্কা আর গোল্লা অর্থাৎ রসগোল্লা। এ-দু’য়ের যুগলবন্দি ঘটিয়েই বর্ধমান শহরে আবির্ভাব ঘটেছে এ মিষ্টির। সৌজন্যে নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। শহরের প্রাণকেন্দ্র কার্জন গেট থেকে বিসি রোড ধরে হাঁটা পথ। কয়েকটা দোকান পেরিয়ে রাস্তার ডানদিকে তাকালেই দেখবেন হাসিমুখে বসে আছেন সৌমেন দাস। যিনি কিনা কাঁচালঙ্কার রসগোল্লা অর্থাৎ চিলিগোল্লার ডিরেক্টর। অভিনব এই মিষ্টির স্ক্রিপ্ট এবং প্রযোজনা তাঁরই। তবে শুধু চিলিগোল্লাই নয়, তেঁতুলগোল্লা, স্ট্রবেরিগোল্লা, চিলি-কালাকাঁদের মতো বিচিত্র সব মিষ্টি নিয়েও সৌমেনবাবু সদা-পরীক্ষমান।

রোজ প্রায় ১৫ কেজি ছানার চিলিগোল্লা বিক্রি হয়

চিলি অর্থাৎ লঙ্কা আর গোল্লা অর্থাৎ রসগোল্লা। এ-দু’য়ের যুগলবন্দি ঘটিয়েই বর্ধমান শহরে আবির্ভাব ঘটেছে এ মিষ্টির। সৌজন্যে নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।

কিন্তু কীভাবে এল চিলিগোল্লার ভাবনা? এর পিছনে অবশ্য রয়েছে কলকাতার বাগবাজার রসগোল্লা উৎসবের অবদান। ২০১৮ সালে সে উৎসব হয়েছিল প্রখ্যাত কেসি দাসের তত্ত্বাবধানে। আর সেখানেই প্রথমবার ‘বর্ধমান সীতাভোগ-মিহিদানা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের’ অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ডাক পড়ে সৌমেনবাবুর। নতুন কিছু করে দেখানোর জেদ চেপে বসে তাঁর। কী করা যায়, কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই আইডিয়াটা মাথায় আসে। আচ্ছা, রসগোল্লায় চিলির ফ্লেভার রাখলে কেমন হয়? এই ভাবনা থেকেই বানিয়ে ফেলেন চিলিগোল্লা। সেবার উৎসবে সাড়া ফেলে দিয়েছিল বর্ধমানে তৈরি এই অভিনব মিষ্টি। সেই শুরু, আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে রোজ প্রায় ১৫ কেজি ছানার চিলিগোল্লা বিক্রি হয়। প্রতি পিসের দাম মাত্র ৬ টাকা। সকলেই যে খান, এমন নয়, কিন্তু যাঁরা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য খোঁজেন, তাঁরা অবশ্যই শহরে এলে একবার স্বাদ নেন চিলিগোল্লার। উপরে মিষ্টিরসে টইটম্বুর। কামড় দিলেই কাঁচালঙ্কা!

স্বয়ং নেতাজি নাকি আচমকাই ঢুকে পড়েন এই দোকানে

কীভাবে তৈরি হয় চিলিগোল্লা? সৌমেনবাবু বলে দিলেন রেসিপিও। প্রথমে বীজমুক্ত কাঁচালঙ্কা আর কিউবি ফল (কিউবি দেওয়া হয় সবুজাভ রং আর অম্লভাব আনার জন্য) মিক্সিতে পেস্ট করে নেওয়া হয়। তারপর সেই পেস্ট মাখা হয় ছানার সঙ্গে। বাকি পর্ব সাধারণ রসগোল্লা তৈরির মতোই। অর্থাৎ ছাঁকা এবং রসে ডোবানো। এরপর রয়েছে ডেকরেশন পর্ব। পাত্রে চিলিগোল্লা রাখার পর উপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বুকচেরা কাঁচালঙ্কা। তবে এ-শুধু দর্শক টানার জন্য! ক্রেতাদের প্লেটে দেওয়ার সময় একইভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়। যাঁরা প্রথমবার খাবেন, তাঁরা ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড করবেন অবশ্যই। নয়তো পাশের জনের জিভে জল এসে যেতে পারে!

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি এখনও জ্বলজ্বল করছে নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দেওয়ালে

প্রথমে বীজমুক্ত কাঁচালঙ্কা আর কিউবি ফল (কিউবি দেওয়া হয় সবুজাভ রং আর অম্লভাব আনার জন্য) মিক্সিতে পেস্ট করে নেওয়া হয়। তারপর সেই পেস্ট মাখা হয় ছানার সঙ্গে। বাকি পর্ব সাধারণ রসগোল্লা তৈরির মতোই। অর্থাৎ ছাঁকা এবং রসে ডোবানো।

এ-প্রসঙ্গে আরও একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য, বর্ধমান শহরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকানটি কিন্তু আজকের নয়। দোকানের প্রতিষ্ঠা ১৯৩৮ সালে। নাম-মাহাত্ম্যের পিছনেও রয়েছে ইতিহাস। সে-বছর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বর্ধমান পৌরসভার একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। বিসি রোড দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আচমকাই ঢুকে পড়েন এই দোকানে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি এখনও জ্বলজ্বল করছে নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দেওয়ালে। মাঝখানে দামোদর দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে আজও একই ছাদের তলায় ধরে রেখেছে নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। চিলিগোল্লাই এ-দোকানের আইকনিক মডেল। তবে গ্রীষ্মকালে যাঁরা আসবেন, তাঁরা স্বাদ নিতে পারেন তেঁতুলগোল্লারও। তার টেস্টও মন্দ নয়। একবার জিভে নিলে আপনাকে বলতেই হবে-একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো আগে…

 

নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের তৎকালীন ছবি আজও দোকানে জ্বলজ্বল করছে

আর যাঁরা কবিতাপ্রেমী, তাঁরা চিলিগোল্লা-তেঁতুলগোল্লায় হয়তো একই সঙ্গে পেয়ে যাবেন ভাস্কর চক্রবর্তী আর তারাপদ রায় সমগ্রের স্বাদ! ভেদাভেদের পৃথিবীতে সহবৎ শিক্ষা দিচ্ছে কিনা সামান্য রসগোল্লা। জাস্ট ভাবা যায় না!

ছবি : নিজস্ব

Developed by DXDasia