
ছোটোবেলায় প্রথম এই ছবিটি দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন স্করসেসি
হলিউড ছবির নতুন যুগের প্রবর্তক আমেরিকান চলচ্চিত্রকার মার্টিন স্করসেসি (Martin Scorsese)। ‘দি আইরিশম্যান’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’-এর মতো ছবি বানিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন, বানিয়েছেন ‘নো ডিরেকশন হোম: বব ডিলান’ বা ‘দ্য লাস্ট ওয়ালৎজ’-এর মতো সাড়া জাগানো তথ্যচিত্রও। সেই স্করসেসি যখন তাঁর প্রথম ছবিটি (Who’s That Knocking at My Door, 1967) নির্মান করছেন, সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) প্রায় কুড়িটি ছবি বানিয়ে ফেলেছেন, হইচই ফেলেছেন বিশ্বজুড়ে। এতদিন পর আর আলাদা করে না বলে দিলেও চলে, রায়বাবুর বিশ্বজোড়া খ্যাতির নেপথ্যে ছিল ‘পথের পাঁচালি’ (Pather Panchali)। ১৯৫৫ সালে ৩ মে ছবিটি সর্বপ্রথম দেখানো হয়েছিল নিউ ইয়র্কের মিউজিয়িম অব মর্ডান আর্ট-এ। কলকাতায় মুক্তি পেয়েছিল তারও সাড়ে তিন মাস পর, ২৬ অগাস্ট। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মানুষজন প্রথম ভারতের শিকড় অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এই ছবির ভিতর দিয়ে -একথা বারবার স্বীকার করেছেন সারা পৃথিবীর একাধিক সেরা চলচ্চিত্রকাররা। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম স্করসেসি।
সত্যজিতের শতবর্ষ পেরিয়ে গিয়েছে অথচ তার রেশ এখনও চলছে। এরকম এক বহুমুখী ব্যক্তিত্ব – তাঁর কাজের বিশ্লেষণ বোধহয় সময় দিয়ে বেঁধে ফেলা যায় না। তাছাড়া সম্প্রতি অনীক দত্ত পরিচালিত ‘অপরাজিত’ ছবিটি ঘিরে ফের বিভিন্ন সমীকরণে আলোচিত হচ্ছে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালি’। সেই সূত্রেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বেশ কিছু তথ্য।
পথের পাঁচালি একই সঙ্গে কাব্যিক, তাৎক্ষণিক, প্রবহমান এবং অন্তরঙ্গ। ম্যানহাটনের একটি থিয়েটারে বসে এক নিঃশ্বাসে ট্রিলজি দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ি।
আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে সিনেমা সংরক্ষণের জন্য ২০১৪ সালে Unite4:Humanity এবং Variety-র তরফে ‘Variety Creative Conscience award’ তুলে দেওয়া হয় স্করসেসি’র হাতে। Unite4:Humanity-প্রচারিত একটি ইউটিউব ভিডিওতে দেখা যায় সেই সম্মাননা গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠে মার্কিন পরিচালক বলছেন ছবি বানানোর একেবারে শুরুতে বা তারও আগে, ছোটোবেলায় কার ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে অবলীলায় তিনি উচ্চারণ করলেন- সত্যজিৎ রায়, পথের পাঁচালি ও ভারত। এবং শুধু উচ্চারণই করলেন না, একই মালায় গেঁথে দিলেন এই তিন-কে। “ছোটোবেলায় প্রথম আমি যে ছবিটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম, তা ছিল ভারতের—সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালি’। ছবিটি তৈরি করেছিলেন একজন ভারতীয় – ভারতের জন্য, সারা পৃথিবীর জন্য। আমার মনে হয়েছিল ছবিটি পৃথিবীর এমন একটি পাঠশালা, যেখানে সমগ্র সংস্কৃতির পাঠ পাওয়া যায়।”
বহু জায়গায় বহুবার এই একই কথা বলতে শোনা গেছে তাঁকে। ২০২০ সালে এক জনৈক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছিল সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে স্করসেসি’র একটি নিবন্ধ, যা লিখেছিলেন তিনি স্বয়ং। লিখেছিলেন, “আমাদের এখানে অর্থাৎ পশ্চিমে, ‘অপু ট্রিলজি’ (পথের পাঁচালি, অপরাজিত এবং অপুর সংসার) ছিল একটি মাইলফকের মতো। আমরা পর্দায় ভারতকে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম কিন্তু সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যেখানে পশ্চিমীরাই ছিল মুখ্য চরিত্র। এভাবে ভারতকে চেনা সম্ভব ছিল না। যেমন, জঁ রেনোয়া’র ‘দ্য রিভার’ (১৯৫১) ছবিটি। ভারত এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। সত্যজিৎ তাঁকে লোকেশন খুঁজতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু, ছবিটিতে প্রধান চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করেছিলেন, হয় ইংরেজ নয় আমেরিকান। দু’একজন ভারতীয় ছিলেন। ঠিক এই কারণেই, পশ্চিমে আমাদের বেশিরভাগের কাছেই প্রথমবার ‘অপু ট্রিলজি’ দেখার অভিজ্ঞতা অন্য মাত্রায় পৌঁছেছিল। চোখ খুলে গিয়েছিল। ইতালীয় নিও-রিয়ালিজম্-এর সঙ্গে কিছুটা মিল ছিল এই ছবির। আর শৈল্পিকতা? চলচ্চিত্র নির্মাণ? দম বের করে দিয়েছিল একেবারে। পথের পাঁচালি একই সঙ্গে কাব্যিক, তাৎক্ষণিক, প্রবহমান এবং অন্তরঙ্গ। ম্যানহাটনের একটি থিয়েটারে বসে এক নিঃশ্বাসে ট্রিলজি দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ি। পথের পাঁচালিতে অপুর চোখের সেই অসাধারণ ক্লোজ-আপ… রবিশঙ্করের সঙ্গীতের মূর্ছনার সঙ্গে যেভাবে শটটি নেওয়া হয়েছিল — আমার জন্য, এটি ছিল মূল্যবান উদ্ঘাটন মুহুর্তগুলির মধ্যে একটি এবং গভীর। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে যা আমার উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গিয়েছিল। আমাদের সকলকে সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখতে হবে এবং বারবার দেখতে হবে। সিনেমার মহান সম্পদ।”

‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘অপুর সংসার’ অবধি যে সময়কাল বিধৃত সত্যজিতের ছবিতে, সেটা মোটামুটি কুড়ির দশক, পরাধীন ভারতের গল্প, আপাত ভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও শিকড় ছেঁড়ার একটা যোগসূত্র হয়তো খুঁজে পাচ্ছিলেন পশ্চিমি মানুষজন।
২০২১ সালে গোয়ায় ৫২তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (IFFI) ‘সত্যজিৎ রায় লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ পুরস্কার পেয়েছেন দুই বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। মার্টিন স্করসেসি এবং ইস্টভান জাবো। মার্কিন মুলুক বারবার মনে করিয়েছে সত্যজিৎ রায় সে দেশের কাছে কতটা বিশেষ। ২০১৫ সালে নি উ ইয়র্কের মিউজিয়ম অব মডার্ন আর্ট ৪ মে পালন করেছিল ‘পথের পাঁচালি’র ষাট বছর। নিউ ইয়র্কেরই ফিল্ম ফোরাম-এ সে বার আট সপ্তাহ চলেছিল অপু-ট্রিলজি, টিকিট কেটে সর্বসাধারণের জন্য। জ্যানাস ফিল্মস আর ক্রাইটেরিয়ান কালেকশন-এর পক্ষে পিটার বেকার এবং লি ক্লাইন অপু-ট্রিলজি ‘রেস্টোরেশন’ করেন। এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে দু’জনে আশির দশকে অপু-ট্রিলজি দেখতে শুরু করার কথা প্রসঙ্গে জানান, সত্যজিতের ট্রিলজিতে ‘ফার্স্ট ফ্লাওয়ারিং অব পোস্ট-ওয়ার গ্লোবালাইজেশন’ খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা। ‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘অপুর সংসার’ অবধি যে সময়কাল বিধৃত সত্যজিতের ছবিতে, সেটা মোটামুটি কুড়ির দশক, পরাধীন ভারতের গল্প, আপাত ভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও শিকড় ছেঁড়ার একটা যোগসূত্র হয়তো খুঁজে পাচ্ছিলেন পশ্চিমী মানুষজন। স্টেফানি জাকারেক, নিউ ইয়র্কের একটি পত্রিকার বিশিষ্ট সমালোচক, প্রথম অপু-ট্রিলজি দেখেছিলেন বস্টনে, ১৯৯৫-এ। কুড়ি বছর বাদে, ২০১৫ সালে দেখার পর দীর্ঘ এক রচনায় লেখেন ‘Apu Trilogy is inseparable from life… you can go home again. Just not back to your own.’
তথ্যসূত্রঃ
IndianExpress.com
variety.com
Youtube
Anandabazar.com
