ভুটান সীমান্তের শেষ চুড়ো

একদিকে ভুটানের পাহাড়শ্রেণি, অন্যদিকে গোটা ডুয়ার্সের অলীক দৃশ্য

আলিপুরদুয়ার জেলার অন্যতম সুন্দর জায়গা বক্সা-জয়ন্তী। ঘন অরণ্য আর পাহাড়ে ঘেরা। এখানকারই সর্বোচ্চ বিন্দু পামসে টপ। উচ্চতা সাড়ে ছ'হাজার ফুট। এই পাহাড়ের পূর্বদিকে ভূটান, পশ্চিমে ভারত। প্রাকৃতিক সুউচ্চ প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পামসের শিখরে পৌঁছে একইসঙ্গে ডুয়ার্স, তরাই এবং ভুটানের বেশ কিছু অংশ দেখার ইচ্ছেটা মাথায় চাগাড় দিয়েছিল। যদিও শুনেছিলাম, পামসে টপে ওঠার পথ বেশ দুর্গম এবং দীর্ঘ। 

ভুটানের রূপম ভ্যালি ঘুরে ফিরেছি তাশিগাঁও। সেই গল্প তো আগেই বলেছি। এখানেই ফুবা কাকুর বাড়ির উঠোনে তাঁবু খাটিয়ে রাতে রয়ে গেলাম। টানা ঘুমের পর সকালে ঘুম ভাঙল পাঁচটার মধ্যেই। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করে না। দুজনে একে অপরকে তাড়া দিচ্ছি। এদিকে গাইড চলে আসবে সাড়ে ছ'টায়। কোনোমতে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। সকাল সকাল রুটি, সব্জি পেট ভরে খেয়ে নিলাম। কারণ, আজ ড্রাইফুড নিচ্ছি না সঙ্গে। আমাদের গাইড খুঁজতে একটু বেগ পেতে হয়েছে। তাশিগাঁওতে যাঁর বাড়িতে রয়েছি সেই কাকু নিজে রাস্তা চেনেন। অনেকবার স্থানীয় গাইড হিসেবে রোভার্স মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের সঙ্গে পামসে গিয়েছেন। কিন্তু এখন তাঁর কোমরে ব্যাথা, তাই আমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারলেন না। 

এখানকার খুব কম গাইড পামসে যাওয়ার রাস্তা চেনে। কারণ ওদিকে সাধারণত কেউ যায় না। কোনো রাস্তা সেভাবে নেই। বেশ খানিক খোঁজাখুঁজির পর গাইড হিসেবে যাকে পেলাম, তিনি সেই মানুষটি যাঁর সঙ্গে গতকাল সিঞ্চুলায় দেখা হয়েছিল। খুবই গরিব। রোজ ওই পথে ভুটানে যান পায়ে হেঁটে। ফল সংগ্রহ করে এনে এখানে বেচে দেন। অর্থাৎ পেশাদার গাইড নন। আগে দুবার পামসে টপ গিয়েছেন। কিন্তু কতক্ষণ সময় লাগবে বা কিলোমিটারের আন্দাজ কোনোটাই ওঁর নেই। 

সকাল সাতটা দশে যাত্রা শুরু হল। তাশিগাঁও থেকে প্রথমে রোভার্স পয়েন্ট, তারপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিঞ্চুলা হয়ে ইন্দো-ভুটান বর্ডার। এই অবধি রাস্তা রূপম ভ্যালি যাওয়ার রাস্তাটাই। অর্থাৎ, আজ আমাদের প্রথম তেরো কিমি পথ মাধ্যমিকের প্রশ্নের মতো কমন।

পায়ের অবস্থার উন্নতি হয়েছে বুঝলাম, যখন রোভার্স পয়েন্টে উঠে এলাম। কাল যে রাস্তা এক ঘন্টা লেগেছিল, আজ তা চল্লিশ মিনিটে উঠলাম। বিরতি নিয়ে আবার এগিয়ে চলা। নটা বাইশ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ইন্দো-ভুটান বর্ডার। কাল বর্ডার পেরিয়ে ভুটানের জাতীয় সড়কে নেমেছিলাম, আজ বর্ডার ধরেই দক্ষিণ-পূর্বের জঙ্গলে ঢুকব। 

জঙ্গলের ঘনত্ব ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। মুভি তুলতে গেলে পা লতাপাতায় জড়িয়ে আটকে যাচ্ছি। আমার সামনে বিশ্বকে কতবার হোঁচট খেতে দেখলাম বলা মুশকিল। একদিকে খাদ, যদিও গাছের সবুজে তা আড়ালে চলে গেছে। অন্যদিকে খাড়া পাহাড়। তার গায়ে সারি সারি গাছ আর তার থেকে লতা-পাতা নেমে এসে আমাদের পথ অবরুদ্ধ করেছে। গাইড কাকু ওঁর কুকরি দিয়ে যতটা সম্ভব গাছের ডাল সরিয়ে মানুষ যাওয়ার মতো ফাঁকা করে দিচ্ছেন। ওঁর পর বিশ্ব, শেষে যাচ্ছি আমি। মাঝে মাঝে কাঁটা গাছের সম্মুখীনও হতে হয়েছে যেগুলো ছাড়াতে ঘাম ছুটে গিয়েছিল। 

ঘন জঙ্গলের শেষে একটা বেড়া দেখলাম। ওটা টপকে এগোতে থাকলাম। সত্যিই মাঝে মাঝে রাস্তায় ভাগ আছে, গাইড না থাকলে সঠিক রাস্তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হত না। বেশ কিছুটা রাস্তা ওঠার পর জঙ্গলের ঘনত্ব কমল। একটা ভিউ পয়েন্টে পৌঁছে তখন দেখতে পাচ্ছি রোভার্স পয়েন্ট আমাদের পশ্চিম দিকের এক পাহাড়ের গায়ে। এনেকটা পথ এসেছি, কিন্তু দক্ষিণ দিকে পামসে টপের দিকে তাকালে বোঝা যায়, পৌঁছতে এখনো অনেকটা সময় লাগবে। 

একটু আগে ঘন জঙ্গলের মধ্যে রেইন ফরেস্টের মতো স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া ছিল। বর্ষায় এই অঞ্চলে জোঁকের উপদ্রব হয়, এখন সেই ভয়টা নেই। কিছুদূর এগোনোর পর দেখলাম এক জায়গায় লম্বা লম্বা পোড়া কাঠ পড়ে আছে। আমাদের গাইড অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। আমরাও অবাক। এই দুর্ভেদ্য জঙ্গল পেরিয়ে এতটা উঠে এসে কারা মড়া পুড়িয়েছে? উত্তর খুঁজে পাইনি। এগিয়ে গিয়ে আরো একটা বেড়া টপকে গেলাম। পথ মোটামুটি বর্ডার ধরেই। তবে আরো কতটা বলা মুশকিল। জল খুব মেপে খাচ্ছি, অনেকক্ষণ এখনো চালাতে হবে। পথ আর কতটা সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আদৌ ঠিক যাচ্ছি কিনা সেটা সম্পর্কেও গাইড কাকু নিশ্চিত নন, এদিকে ঠিক সময়ে সামিট করে নেমেও আসতে হবে। 

পাহাড়ে উচ্চতা পরিবর্তনের সাথে সাথে আবহাওয়ার যেমন পরিবর্তন হয়, তেমনি পরিবর্তিত হয় স্বাভাবিক উদ্ভিদ। আমরা প্রথমে পেলাম ঘন স্যাঁতসেঁতে জঙ্গল, তারপর জঙ্গলের ঘনত্ব কমল, ফার্নের শোভা দেখতে পেলাম, দেখলাম শতাব্দী-প্রাচীন কিছু ছায়াবৃক্ষ। এভাবে চলতে চলতে কখন যে লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি বুঝতে পারিনি। একটা চড়াই উঠে হঠাৎ করে দেখি আর বড়ো গাছ নেই; শুধু ঝোপ বা গুল্মজাতীয় গাছ। একদিকে খাদ সোজা নেমে গেছে ভুটানের দিকে। আর সেদিকে তাকিয়ে মন ভরে গেল। 

পূর্বে যতদূর চোখ যায় ভুটানের ঢেউখেলানো পাহাড়শ্রেণি। দক্ষিণ দিকে পাহাড় গিয়ে সমতলে মিশেছে। নদীগুলোর মধ্যগতি সুস্পষ্ট। দক্ষিণে রায়ডাক, জয়ন্তী; পশ্চিমে দূরে ডিমা ও কালজানি নদীর প্রবাহ দেখতে পাচ্ছি। গোটা ডুয়ার্স চোখের সামনে, রোভার্স পয়েন্ট, লেপচাখা, অসলুম দেখা যাচ্ছে বেশ নিচে। একটা অদ্ভুত আনন্দে মন ভরে গেল। ঘড়িতে তখন বাজে এগারোটা দশ। আমরা পামসে টপের ফ্ল্যাগ দেখে সেখানে এসে নতজানু হয়ে প্রকৃতি মাকে শ্রদ্ধা জানালাম। 

মনটা খচখচ করছিল। গাইডকাকুকে বললাম ব্যাপারটা। আসলে আমরা যে পতাকাগুলোকে টপ বলে চিহ্নিত করলাম তার থেকেও উপরে যাওয়া যায়। কিন্তু উনি বললেন এটাই টপ, এর উপরে কিছু ঝোপঝাড় আছে তাই গিয়ে লাভ নেই। 

কিছুক্ষণ পর আমরা ফিরব, কিন্তু গাইউ কাকুকে আর দেখতে পাই না। অনেকবার ডাকার পর তিনি সাড়া দিলেন ওপর থেকে, আমাদেরও ডাকলেন। আমরা উপরে উঠে দেখি মূল সামিটে এবার পৌঁছলাম। এখানটা একদম পাহাড়ের মাথা। চওড়া সমতলে এক জায়গায় পাথরের বেদী করা, তাতে কিছু ভুটানি টাকা রাখা আছে। উনি বললেন, সেই দুবছর আগে এসেছেন, তাই খেয়াল ছিল না যে উপরে যাওয়া যায়। আমরা বলার পর উনি দেখতে গিয়েছিলেন। সুতরাং, সাড়ে এগারোটার সময় আমরা অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছলাম। এবার একই পথে ফেরার পালা।

ফেরার আগে আরেকবার তাকালাম পিছনের দিকে। ভুটান, বিস্তৃত ডুয়ার্স। স্বর্গীয় সৌন্দর্য। পামসে টপ-এ ওঠার রাস্তা যেন এমনই দুর্গম থাকে। কিছু অলীক সৌন্দর্যকে দুর্গমতার কোলেই থাকতে হয়। সহজসাধ্য হতে নেই। 

ট্রেক করতে চাইলে:

কখন যাবেন?
পামসে টপ ট্রেক করুন বর্ষাকাল বাদে বছরের যে কোনো সময়ে। শীতকাল সবচেয়ে উপযুক্ত। 

কীভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে পদাতিক এক্সপ্রেস বা হাওড়া থেকে সরাইঘাট এক্সপ্রেস। তারপরে বাস বা গাড়িতে সান্তালাবাড়ি। সেখান থেকে বক্সা হয়ে তাশিগাঁও।

থাকবেন কোথায়?
তাশিগাঁওতে ফুবা-জির বাড়ি থাকতে পারেন। বড়ো দল থাকলে লেপচাখায় গিয়ে থাকুন। 

ছবি: লেখক
 

Developed by DXDasia