
ভারতীয় ছবিতে বাস্তবধর্মিতার প্রথম উদাহরণ নিমাই ঘোষ পরিচালিত এই ছবি
এই লেখার উপলক্ষ্য বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর হতেই পারতো কিন্তু, নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’-এর কথা মনে করালো ‘রাশিয়া’; পৃথিবীজুড়ে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ রব তুলে দেশটি এখন খবরের শিরোনামে যে! ৫০-এর দশকে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র-পরিচালক ভিসেভেলদ পুদভকিন সে দেশ থেকে কলকাতায় এসে ‘ছিন্নমূল’ ছবিটি দেখে এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে সেই ছবির প্রিন্ট কিনে নিয়ে যান এবং পরবর্তীকালে ছবিটি রাশিয়ার ১৮৮টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। এর আগে কোনও ভারতীয় চলচ্চিত্র দেশের বাইরে এত বড়ো পরিসরে প্রদর্শিত হয়নি। এমনকি, পুদভকিন নিমাইবাবুর এই সৃষ্টি নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদা-য়। বিশ্বযুদ্ধ, রক্তপাত, ভাগাভাগির সূচনা সত্ত্বেও তখন সারা পৃথিবী জুড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে শিল্প-সংস্কৃতির আদান-প্রদান ছিল কাঁটাতারবিহীন।
দেসা পিকচার্স নিবেদিত, বিমল দে প্রযোজিত, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্যের ‘নোঙর ছেঁড়া নৌকো’ কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত নিমাই ঘোষের এই ‘ছিন্নমূল’-কে বলা হয় ভারতের প্রথম ‘নিও রিয়ালিস্টিক ফিল্ম’। টাইটেল কার্ডে ছবিটির পরিবেশনায় নাম ছিল ইউনিয়ন ডিস্ট্রিবিউটরস্-এর, সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন কালোবরণ। ১৯৪৮ সালেই ছবিটির চিত্রগ্রহণের কাজ শুরু করেন নিমাইবাবু, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫১-তে মুক্তি পায় ছবিটি। শোনা যায়, ‘ছিন্নমূল’ মুক্তির সময় সেন্সর ছাড়পত্র নিয়ে আপত্তি ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধির। থাকারই কথা, যেভাবে আজও থাকে। তবে তৎকালীন চেয়ারম্যান বীরেন্দ্রনাথ সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে নাকি সেন্সর সার্টিফিকেট পেয়েছিল ছবিটি। অনেকেই পরিচালক নিমাই ঘোষের সঙ্গে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষকে গুলিয়ে ফেলেন। যদিও, মাত্র ১৯ বছর বয়সে নিমাই ঘোষ অরোরা ফিল্ম কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন ক্যামেরাম্যান বিভূতি দাসের সহকারী হিসেবে। শ্রমিক-মালিক দ্বন্দ্বে শ্রমিকদের পক্ষ নেওয়ায় চাকরি যায় তাঁর। প্রথম স্বাধীনভাবে ক্যামেরাম্যানের কাজ করেন পরিচালক খগেন রায়ের ‘প্রতিমা’ ছবিতে। পরে বিমল দে-র সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে গণনাট্যে যোগাযোগ। পরে চলে গিয়েছিলেন মাদ্রাজ, সেখানে তামিল ছবিতে কাজ করেন। নিমাই ঘোষের মতো পরিচালকের চলে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছিল বাংলা ছবিরই।
মৃণাল সেন লিখেছিলেন, পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি চিরকালের মতো ছেড়ে নিরাশ্রয় বাস্তুহারার দল কলকাতার ইট পাথরের রাস্তায় কীভাবে মাথা খুঁড়ে মরেছে, কীভাবে শিয়ালদা’র প্ল্যাটফর্মের নোংরা পরিবেশে তারা রাতের পর রাত কাটিয়েছে, খিদের তাড়নায় তারা রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেরিয়েছে কাজের আশায়— ‘ছিন্নমূল’ সেই সব বুকভাঙা ঘটনারই জীবন্ত দলিল।

পরিচালক নিমাই ঘোষ
চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে এবং তারও আগে মূলত যন্ত্রের বিন্যাসে চলচ্চিত্র কতটা সাহিত্যের গল্প বলতে পারছে, এই ছিল সিনেমার সাফল্যের মাপকাঠি। এর নেপথ্যে ছিল ‘নিউ থিয়েটার্স’। সংলাপের বিন্যাসে আর কিছুটা গানের উপর নির্ভরশীল ছিল সেই সময়ের ছায়াছবি। এই গতানুগতিক স্রোতের বাইরে বেরিয়ে কাজ করতে হবে, চলচ্চিত্র-ভাবনায় এই নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটেছিল স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েই, যার কাণ্ডারি ছিল ‘ছিন্নমূল’। ছবিটি অনেক কারনেই উল্লেখযোগ্য। ছবিটি দেশভাগ সম্পর্কিত সেলুলয়েডের প্রথম একটি বাস্তব দলিল, তার থেকেও জরুরি যে নিমাই ঘোষের ক্যামেরা উদ্বাস্তু জীবন সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব সত্যের সাক্ষর রেখেছিল অত্যন্ত আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেও। এই প্রথম অভিনয় প্রশিক্ষিত মানুষজনের সাহায্য ছাড়া প্রায় অপেশাদার নাট্যকর্মীদের নিয়ে নিমাই ঘোষ ১০ হাজার ফুটের এক সেলুলয়েড ইতিহাস লিখতে পেরেছিলেন। তখন কোথায় সত্যজিৎ, কোথায় ঋত্বিক! নিঃসন্দেহে বলা যায় স্বাধীনতার পরে সাংস্কৃতিক পালাবদল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে ঘটেছিল বাংলা ছবিতে। অনেকেই জানেনন না যে ঋত্বিক ঘটক ‘ছিন্নমূল’ ছবিতেই প্রথমবার অভিনয় করেছিলেন, শুধু তাই নয় পরিচালনায় নিমাইবাবুর সহকারী হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ঋত্বিক ছাড়াও এই ছবিতে অভিনয় করেন শোভা সেন, বিজন ভট্টাচার্য, জলদ চ্যাটার্জি, গঙ্গাপদ বসু, শান্তি মিত্র, প্রমথেশ রায় প্রমুখ। ছবিটিতে পরিচালক পুব বাংলার কথ্যভাষা ব্যবহার করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেই প্রথম স্টুডিও থেকে ক্যামেরা বের হয়েছিল—শিয়ালদহ স্টেশনে। শিয়ালদা স্টেশনের দৃশ্যে সত্যিকারের ছিন্নমূল মানুষদের উপস্থিতি ছবিটিকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়।
নিমাই ঘোষের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ জানিয়েছিলেন, “তিনি ছিলেন ক্যামেরাম্যান, তবে মনে মনে তিনি ছবি পরিচালনার ইচ্ছা পোষণ করতেন… পার্টিশান নিয়ে ‘ছিন্নমূল’ ছবি পরিচালনা করেন নিমাই ঘোষ। বাংলা ছবিতে বাস্তবধর্মিতার প্রথম উদাহরণ এই ছবি।” আর মৃণাল সেন লিখেছিলেন, “পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি চিরকালের মতো ছেড়ে নিরাশ্রয় বাস্তুহারার দল কলকাতার ইট পাথরের রাস্তায় কীভাবে মাথা খুঁড়ে মরেছে, কীভাবে শিয়ালদা’র প্ল্যাটফর্মের নোংরা পরিবেশে তারা রাতের পর রাত কাটিয়েছে, খিদের তাড়নায় তারা রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেরিয়েছে কাজের আশায়— ‘ছিন্নমূল’ সেই সব বুকভাঙা ঘটনারই জীবন্ত দলিল।”
ছিন্নমূলের একটি দৃশ্যে, এক বৃদ্ধা বাড়ির খুঁটি ধরে চিৎকার জুড়ে দেন – ‘যাম না, যাম না, যাম না আমি’, কারণ তার শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে আর কোথাও যে তার বাড়ি থাকতে পারে, এমনটা তার ভাবনার অতীত। বৃদ্ধার প্রিয়জন বলে, ভিটেয় থাকলে শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে। ভিটেমাটি এমন এক বন্ধন, যে, শত কষ্ট সয়েও সেখানে খুঁটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে চায় মানুষ, কিন্তু খাবার-নিরাপত্তার জ্বালায় জর্জরিত হতে হতে বোধহয় একসময় খুঁটি আলগা হয়ে পড়ে। আজও পৃথিবী জুড়ে ‘ছিন্নমূল’ হয়ে বেঁচে আছেন অসংখ্য মানুষ। সেই যে শুরু হয়েছিল তার যেন আর শেষ নেই। দেশভাগের ক্ষতের কোনও উপশম হয় না, ক্ষত খানিক সারে, আবার উস্কে ওঠে; এক গভীর বিষাদের দিকে ঠেলে দেয় আমাদের। নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ তাই সঞ্চিত থাকে তাদের জন্য, যারা “যুদ্ধ দ্যাখে নাই, মন্বন্তর দ্যাখে নাই, দাঙ্গা দ্যাখে নাই, দেশভাগ দ্যাখে নাই।”
তথ্যসূত্রঃ ইরাবতী, দেশভাগের সিনেমা, আনন্দবাজার পত্রিকা
