নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনে জমি হারান ১০৬ বছর বয়সী এই জোতদার

শিলিগুড়ির ইতিহাস তাঁর নখদর্পনে

নকশালবাড়ি কথাটির সঙ্গে জড়িয়ে কত রোমাঞ্চ, কত আবেগ। ১৯৬৭ সালে যুগান্তকারী কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল এখানে। তারপর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আগুন ছড়িয়ে পরে দিকে দিকে। কত প্রজন্মের স্বপ্ন, কত মানুষের মৃত্যু – নানা সমালোচনার পরও নকশাল আন্দোলন আজও চলমান। সেই নকশালবাড়ির কলমজোতে শিলিগুড়ির জোতদার কবিলাল বর্মনের একশ বিঘা জমিও কেড়ে নিয়ে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল কৃষকদের। কিছু বাঁশ বাগান ছিল তার মধ্যে। 

শিলিগুড়ি সেভক রোডের বর্মন পাড়ায় বসে পুরনো স্মৃতি আওড়াচ্ছিলেন কবিলাল। বলছিলেন, তাঁর বাবা প্রয়াত জোতদার পল্টন সিং বর্মনের কাছ থেকে শিখে তিনি সেই সময় প্রচুর জমি সংগ্রহ করছিলেন নকশালবাড়িতে। মোট ১৫০ বিঘা জমি। এর মধ্যে ১০০ বিঘাই নকশালবাড়ির আন্দোলনে চলে যায়। তির ধনুক নিয়ে তাঁদের জমি ছিনিয়ে নেন কৃষকরা। বাকি ৫০ বিঘা জমিতে এখনও বসবাস করছেন তাঁর ভাই বিজনলাল বর্মন।

আধার কার্ড অনুযায়ী কবিলাল বর্মনের বয়স ১০৪ বছর। আধার কার্ডে তাঁর জন্ম তারিখ ১৯১৬ সালের ১২ জুন। কিন্তু কবিলালের দাবি, তাঁর বয়স ১০৬ বছর। সন্তান বলতে পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে। এর মধ্যে তিন পুত্রের বিয়োগ হয়েছে। কন্যাদের মধ্যে বিয়োগ হয়েছে একজনের। নাতি-নাতনি রয়েছেন পনের জন। 

আগে নিজে হাতে জমিতে চাষবাস করতেন কবিলাল 

১০৬ বছর বয়স হলেও কবিলাল দিব্যি আছেন। কথাবার্তা পরিষ্কার। রোগব্যাধি সেভাবে নেই। তাঁর কথায়, আগে নিজে হাতে জমিতে চাষবাস করতেন ধান থেকে শুরু করে আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি-সহ অন্য সব সামগ্রী। গোবর সার ব্যবহার করা হত। ফলে মানুষের রোগব্যাধি যেমন কম ছিল, তেমনই দীর্ঘজীবন লাভ হত সহজেই। আজকের মত এরকম ভেজাল, কীটনাশকের চাষবাসে তৈরি খাবার খেতে হত না। এখন আর সেই চাষ-আবাদ নেই, সেই বিশুদ্ধ পরিবেশও নেই। 

সেভক রোডের বর্মন পাড়া এলাকাতেই কবিলালের বাবার ১৩০ বিঘা জমি ছিল। এখন তার প্রায় কিছুই নেই। প্রায় সবটাই এদিক-ওদিক চলে গিয়েছে। বহু জমি দখলও হয়ে গিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জমি দখল রুখতেই বহু গরিব মানুষকে আশি-নব্বইয়ের দশকে পাঁচ কাঠা করে জমি দান করেন কবিলাল। যা আজ দাদাভাই কলোনি নামে পরিচিত। স্থানীয় বর্মন পাড়ায় বাবা পল্টন সিং বর্মনের নামে ছেলেদের স্কুল, ঠাকুরদা ডুমরু সিং বর্মনের নামে প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং নিজের নামে বালিকা বিদ্যালয়কে জমি দান করেছেন কবিলাল।

এখন বয়স হওয়ায় সামাজিক কাজে সেভাবে অংশ নিতে পারেন না 

কবিলাল বলেন, “পুরনো শিলিগুড়ির কথা বলতে গেলে লোকে আমায় পাগল বলবে। কিন্তু যা সত্য তা শুনে রাখুন। স্বাধীনতার আগে শিলিগুড়ি ছিল এক গণ্ডগ্রাম। ধানি জমি ছিল সব। এদিক ওদিক কিছু কাঠের সেতু ছিলো। সেগুলোর নিচে দিনের বেলায় শিয়াল লুকিয়ে থাকত। রাত হলে শিয়ালেরা এদিক ওদিক দাপিয়ে বেড়াত। আজ বিধান মার্কেট বলে যে জায়গা বিখ্যাত, সেখানে আগে সবাই মলমূত্র ত্যাগ করত।” আজকের বাঘাযতীন পার্কে আগে জল ছেঁকে মাছ ধরতেন কবিলাল। শিলিগুড়ি একটিয়াশাল বলে এখন যে অঞ্চল, সেখানে আগে ছিল একটি শাল গাছ। গাছের ধারেই ছিল খড়ের তৈরি একটিয়াশাল স্কুল। সেই স্কুলেই দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা কবিলালের।

শিলিগুড়ি কোর্ট মোড়ে আগে ছিল একটি বড়ো গাছ। তার পাশেই টাউন স্টেশন। পশ্চিম দিকে বাজার বসত। তাঁর মনে আছে, একবার টাউন স্টেশনে একটি রেল ইঞ্জিন এলে তা দেখার জন্য এক মাস ধরে মানুষের ভিড় হয়েছিল। আজ আমরা হাকিমপাড়া বলে যে জায়গাকে জানি, সেখানে কাঠের প্লাঙ্কিং করা তিন তলা একটি খড়ের ঘর ছিল, থাকতেন এক হাকিম বা বিচারক। সেই থেকে হাকিমপাড়া নাম এসেছে। আজ যে জেলা হাসপাতাল, তা ছিল টিনের ছাউনি দেওয়া ছোটো একটি ঘর। 

শিলিগুড়ি হিলকার্ট রোডের হাওড়া পেট্রোল পাম্প বলে আজ যা পরিচিত, সেখান থেকে হাসপাতাল মোড় পর্যন্ত রাস্তার ধারে বলদ গরুর গাড়ির চাকা তৈরি করতেন বিহার থেকে আসা লোকজন। জওহরলাল নেহেরু ইন্দিরা গান্ধিকে নিয়ে একবার দার্জিলিং পাহাড়ে এলে তাঁদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন কবিলাল। 

শিলিগুড়ির ইতিহাস তাঁর নখদর্পনে 

কবিলাল তখন খুব ছোটো, একশ বছর আগে কলেরা মহামারির গল্প তিনি শুনেছেন তাঁর ঠাকুরমা বুধান সরির কাছে। মহানন্দা নদী তখন গুলমা নদী নামে পরিচিত। কাছেই তাঁরা থাকতেন । কলেরা দেখা দিলে তাঁর ঠাকুরমা বাড়ির সব গরু-মোষ, বাসনপত্র-সহ সব সামগ্রী ফেলে দিয়ে রাতারাতি এখনকার বর্মন পাড়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। তখন থেকে সেখানে আছেন। আর সেই সময় ছিলো না ডাক্তার, ঝাড়ফুঁকই একমাত্র চিকিৎসা। তবে ১৯৪৮ অথবা ১৯৪৯ সালে একবার ছয় মাসের জন্য পরিবারের মহিলাদের সম্মান বাঁচাতে তাঁদের শিলিগুড়ি রথখোলার পাশে মামাবাড়ির কাছে বসবাস করতে হয়েছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, ইংরেজ সেনা-জওয়ানরা সম্পূর্ণভাবে ভারত ছাড়ার আগে মহিলাদের সম্মানহানি ঘটাতে পারে। 

এখন বয়স হওয়ায় সামাজিক কাজে সেভাবে অংশ নিতে পারেন না কবিলাল । তবে কয়েক বছর আগে নিজের খরচে বিধবাদের নিয়ে তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। এই বয়সে এসে কার্যত ঘরেই বন্দি থাকেন তিনি। ভোর চারটেয় উঠে পুজোর বাসনপত্র নিজে হাতে ধুয়ে স্নান সেরে নেন। তারপর গীতা পাঠ, সংবাদপত্র পাঠ। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে বিশ্রাম, বিকেলে নামগান। এর ফাঁকে পার্কিং ফি আদায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পণ্য বোঝাই ট্রাকের পার্কিং এলাকা রয়েছে তাঁর জমিতে। সেখান থেকে পার্কিং ফি আসে। যদিও ফি আদায়ের বেশির ভাগ কাজই করেন কবিলালের পুত্র বা নাতিরা। 
 

Developed by DXDasia