শান্তিপুরের ঐতিহাসিক তিন কামরাযুক্ত মার্টিন রেল

দীর্ঘদিন ধরে এই ট্রেন চলাচল করলেও রেল কর্তৃপক্ষের নজরে সে ছিল দুয়োরানি

পর্যটন শিল্পের বিজ্ঞাপনে একটি রাজ্যের প্রচারে বলা হয় ‘হিন্দুস্থান কি দিল দেখো’। এই বিজ্ঞাপনকে যদি ভারতের পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ‘হৃদয়’ কোনটা প্রশ্ন করা হয়, উত্তর চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যেতে পারে – ‘ভারতীয় রেল পরিষেবা’। 

সত্যিই যাত্রী পরিবহনে বিশেষ করে লোকাল ট্রেন বন্ধ হবে কোনোদিন, সেটা কি আমরা ভাবতে পেরেছিলাম? কিন্তু যেটা কোনোদিনই সম্ভব হতে পারে না সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে একটি মারণ ভাইরাস (যদিও জরুরি পরিষেবা চলছে প্রথম থেকেই)।

অথচ এই তো কয়েক মাস আগেও কত রকমের মানুষের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে জমজমাট হয়ে উঠত নয় কিংবা বারো কামরার টিনের বগিগুলি। কত আনন্দ, বেদনা, হতাশা, নতুন আশা, ভালোবাসায় ভরপুর মানুষদের ঠেলাঠেলি, অল্প একটু পা রাখার জায়গা করবার চেষ্টা, প্রচণ্ড ভিড়ে ওঠা নামা – কত লড়াই চলত যাতায়াতের পথে। কত ফেরিওয়ালা, কত নিত্য নতুন জিনিস, মানুষের সমাহারে দোদুল্যমান হয়ে একটি রিদমে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলত রেলগাড়ি।

আজ সেই কোলাহল, হাসিঠাট্টা, গ্রুপবাজি – সব এক নিমেষে বন্ধ হয়েছে কয়েকমাস। করোনার প্রকোপে বন্ধ হয়ে থাকা রেল চলাচলের কথা মাথায় আসতেই হঠাৎই নস্টালজিক হয়ে ফিরে গেলাম তিন কামরার ন্যারোগেজ লাইনের রেলের ইতিহাসের সন্ধানে। মার্টিন রেলের সময়কালের ইতিহাসের পর্দায় চোখ ফেলে দেখি – অষ্টাদশ শতকে অবিভক্ত বাংলায় শুধুমাত্র শ্যামবাজার নয়, কালীঘাট-ফলতা, হাওড়া-আমতা, যশোর-ঝিনাইদহ, আহমেদপুর-কাটোয়া, শান্তিপুর -কৃষ্ণনগর-নবদ্বীপ ঘাট – আরো অনেক রুটে মার্টিনের এই লাইট রেল চলত।

ট্রেন চলত ধীর গতিতে

১৮৩২ সালে ভারতেও রেল চালানোর পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ভারতবর্ষে রেল চালু হওয়ার আগেই বাঙালিদের মধ্যে প্রথম যিনি বাষ্পীয় শকটে চড়েছিলেন, তিনি রাজা রামমোহন রায়। ১৮৩১ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর ব্রজেন্দ্রনাথ বন্ধোপাধ্যয় সম্পাদিত ‘সংবাদ পত্রে সেকালের কথা’ পত্রিকায় একটি সংবাদে রামমোহনের রেলে চড়বার যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে লেখা ছিল “লিভারপুলে অবস্থানের সময় ম্যাঞ্চিষ্টার নগরের লৌহঘটিত রাস্তা দৃষ্টি করিয়া তাহার বিশেষ চমৎকার হয়, তিনি পরীক্ষাদ্বারা ঐ অদ্ভুত ব্যাপারের প্রকার সকলের বিষয় বিবেচনা করিতে সক্ষম হন এতদর্থ তৎকর্স্মাধ্যক্ষেরা রাস্তায় উপরি তাঁহার সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইতে প্রস্তাব করিলেন। অতএব তাঁহারা পূর্বাহ্নে সাত ঘণ্টার সময় যাত্রা করিয়া ম্যাঞ্চিষ্টর নগরে পঁহুছিলেন। যাত্রাকালীন গাড়ি কোনো কোনো সময়ে ঘণ্টায় পনেরো ক্রোশের হিসাবে চলিল, তাহাতে রামমোহন রায় যে পর্য্যন্ত চমৎকৃত হইলেন তাহা তিনি কহিতে অসর্মথ”।

দ্বারকানাথ ঠাকুর ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম রেলপথ স্থাপনের জন্য চেষ্টা করেন। ১৯৪৩ সালে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, স্টিমার করে এলাহাবাদের পথে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু পৌঁছেছিলেন ভাগলপুর পর্যন্ত – “আমাদের পবিত্র গঙ্গা তো আর তোমাদের দেশের ছোট্ট রাইন নদী নয় – স্রোত এত তীব্র ছিল যে আমায় কলিকাতায় ফিরে আসতে হয়।……দুর্ভাগ্যবশত ভারতে আমাদের রেলপথ নেই এবং এখানে ভ্রমণ করা সামান্য ব্যাপার নয়, সহজ সাধ্যও নয়”। যাত্রাপথের এই অসুবিধার জন্য রোন্যান্ড ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি’র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম রির্পোট পেশ করেন, তখন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর জানিয়েছিলেন যে তিনি কলকাতা থেকে কয়লাখনি অঞ্চল অবধি রেলপথ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ করে দেবেন। পরবর্তীকালে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

১৮৪৪ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ যখন বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে ভারতে রেলপথ স্থাপন করার অনুমতি দান করেন, তখন থেকে মার্টিন কোম্পানি ভারতবর্ষ তথা বাংলার বিভিন্ন স্থানে যেখানে যেখানে তাদের ব্যবসায়িক মুনাফা হবে সেখানে সেখানে রেল লাইন পাতে।

হাওড়া থেকে শিয়াখালা পর্যন্ত মার্টিন বার্ন কোম্পানির একটি লাইট রেল খোলা হয়েছিলো। এই লাইট রেলটি চলতো কদমতলা থেকে চণ্ডীতলা, চণ্ডীতলা থেকে কেষ্টরামপুর এবং কেষ্টরামপুর থেকে শিয়াখালা পর্যন্ত ধাপে ধাপে। এও তিনটি রুটে লাইন চালু হয়েছিল যথাক্রমে ২/৮/১৮৯৭, ১০/৯/১৮৯৭ এবং ৭/১১/১৮৯৭ তারিখে। চণ্ডীতলা থেকে জনাই পর্যন্ত তিন মাইলের আরেকটি ছোটো লাইন খোলা হয়েছিল ১৮৯৮ সালের ৫ মে। বেশ কয়েক বছর এই রুটে ট্রেন চলার পর ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি এই লাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আমতা থেকে শিয়াখালা: আমতা থেকে শিয়াখালা পর্যন্ত মার্টিন কোম্পানির দু’ফুট চওড়া যে রেল লাইন পাতা হয়েছিল, তাতে ১৮৯৭ সালে প্রথম ট্রেন চলাচল শুরু করেছিল।

যশোর থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত আরেকটি ছোটো লাইন পাতা হয়েছিলো। এই লাইনটির ম্যানেজিং এজেন্ট ছিলেন বি. সি. রায়। তৎকালীন বাংলা সরকার এই রুটে লাইন পাতার সম্মতি জানায় ১৯১০ সালে ২ ডিসেম্বর। ১৯১৩ সালে ১ অক্টোবর থেকে যশোর থেকে ঝিনাইদহ রেলচলাচল শুরু হয়। এই লাইনে রেল কয়েক বছর চলার পর ১৯৩৩ সালে ১ এপ্রিল সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

১৯১৭ সালে ২৮ মে কালীঘাট স্টেশনের কাছে ঘোলসাহাপুর থেকে ফলতা পর্যন্ত একটি লাইট রেলওয়ে চলাচল করত। পরবর্তীকালে ১৯২০ সালে ১ মে আসাম রেলওয়ের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এরপর ভারত সরকার ১৯৪৭ সালের ১ এপ্রিল রুটটি কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে লাইনটি উপড়ে ফেলে। বাঁকুড়া থেকে দামোদর নদ পর্যন্ত একটি ৬০ মাইল দীর্ঘ ম্যাকলিয়ড কোম্পানির ন্যারোগেজ  রেলপথ তৈরি করে বাঁকুড়া দামোদর নদ রেলওয়ে কোম্পানি। এই রুটে রেল চলাচলের অনুমতি পাওয়া যায় ১৯১৪ সালের ১ মে।

আহমদপুর থেকে কাটোয়া পর্যন্ত ৩২ মাইল দীর্ঘ ম্যাকলিয়ড কোম্পানির ছোটো রেল, আহমদপুর থেকে পাচন্ডি পর্যন্ত ৩০মে ১৯১৭ এবং পাচন্ডি থেকে কাটোয়া পর্যন্ত খোলা হয় যথাক্রমে ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৭ সালে। এরপর ১ জুলাই ১৯৬৭ সালে সরকার লাইনটি কিনে নিয়ে পূর্ব রেলপথের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছিল।

১৮৫৭ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠিত হলে কোম্পানির সঙ্গে সরকারের এই মর্মে চুক্তি হয় যে, তারা কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত ১১১ মাইল রেলপথ খুলবে এবং চুক্তির প্রায় ৫ বছর পরে ১৫ নভেম্বর ১৮৬২ সালে শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেললাইন গঠিত হয়ে, ওই পথে রেল চলাচল শুরু হয়। ইষ্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি,  শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেল চালু করলেও সেই যাত্রাপথে তৎকালীন অষ্টাদশ -ঊনবিংশ শতকের শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলায় উৎকর্ষতার উচ্চ আসনে আসীন দুই ঐতিহ্যময় পুরানো শহর কৃষ্ণনগর ও শান্তিপুর যুক্ত ছিল না। এর ফলে কলকাতা-রানাঘাট থেকে এই দুই শহরের সঙ্গে রেলপথে যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছিল। তাই এই সমস্যার সমাধানের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি ১৮৯৯ সালের ৫ এপ্রিল রানাঘাট রেল স্টেশন থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যে লাইন ছিল, তার সোজা পথ ছেড়ে দিয়ে বড়ো লাইনেরই এক শাখাপথের দু’মাইল দূরে চূর্ণি নদী পার করে আঁইশতলাঘাট থেকে শান্তিপুর ভায়া হয়ে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত ৭৬২ মিলিমিটার অর্থাৎ আড়াই ফুট প্রশস্ত ন্যারোগেজের  লাইট ট্রেনের যাত্রাপথ শুরু হয়। মার্টিন কোম্পানির ট্রেন চালু হওয়া প্রাক্কালে ১৮৯৭ সালে ১০ই জুলাই স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা হয়েছিল “আমরা রানাঘাট -কৃষ্ণনগর ট্রামওয়ে পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাই। এই পরিকল্পনা কার্যকর করবার জন্য একটি সীমাবদ্ধ দায়িত্ব সকান্ন (লিমিটেড লায়েবিলিটি) কোম্পানি সম্প্রতি রেজেস্ট্রি করা হয়েছে। এই কোম্পানির মূলধন ৭ লক্ষ টাকা। এখন জনসাধারণকে ডাকা হচ্ছে এই মূলধনের অংশ (শেয়ার) কেনবার জন্য। প্রস্তাবিত বাষ্পীয় ট্রামওয়ে কিংমা লাইট রেলওয়ে নদীয়া জেলার প্রধান শহর কৃষ্ণনগরকে পূর্ববঙ্গ রেলপথে অবস্থিত রানাঘাটের সঙ্গে যুক্ত করবে শান্তিপুর হয়ে। কৃষ্ণনগর কোনো রেলপথের সঙ্গেই যোগ নেই”।

শান্তিপুর -কৃষ্ণনগর রেলপথ চালু হবার কিছু দিন পর সেটি নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে দেওয়া হয়। এইভাবে কিছু বছর চলার পর ১৯০৬ সাল নাগাদ ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে এই রুটটিকে মার্টিন কোম্পানির কাছ থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। প্রথমে যে রেলটি আঁইশতলা ঘাট থেকে চলত, সেই গাড়ি কেমন ছিল? একটি বর্ণনায় পাই, এই লাইট ট্রেনটি খুব বেশি সভ্য ছিল না, গাড়িতে ফার্স্টক্লাস বলে কিছুই ছিল না। 

কামরাগুলির মাথায় ছিল টিনের ছাউনি, কামরাগুলির ভিতরে বসবার জন্য বেঞ্চি পাতা থাকত আর বৃষ্টি আটকাবার জন্য ছিল ক্যাম্বিসের ছেঁড়া পর্দা। রাত্রিবেলায় আলোর একমাত্র অবলম্বন ছিল কেরোসিন ল্যাম্প, কেননা সে সময় ট্রেনে গ্যাসের কিম্বা ইলেকট্রিকের আলোর ব্যবস্থা হয়নি। যাই হোক, ১৯২৫ সালে ৩১ মে তারিখে চূর্ণি নদীর উপর পুল নির্মাণ হলে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট হয়ে শান্তিপুর পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন সম্প্রসারিত হয়। ফলে আঁশতলা ঘাট থেকে শান্তিপুর পর্যন্ত যে ছোটো ট্রেন চলত, সেটার প্রয়োজন ফুরাল কিন্তু শান্তিপুর থেকে কৃষ্ণনগর হয়ে নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত ন্যারোগেজ লাইন থেকে গেল তখন থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। 

শান্তিপুরের ২ এবং ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে বাষ্পীয় রেল চলত, বিংশ শতকের আটের দশকের প্রথম দিকে সময় পর্যন্ত। ট্রেনটিতে থাকত তিনটি কামরা। কখনো কখনো চারটি কামরাও জোড়া হতো। ট্রেনের প্রথাগত যে লালচে রং হত, সেই রঙের ছিল কামরাগুলি। এরপর বিংশ শতকের আটের দশকের দ্বিতীয় পর্যায়ে স্টিম ইঞ্জিন উঠে গিয়ে তার জায়গায় স্থান নেয় ডিজেল চালিত রেল ইঞ্জিন। ডিজেলে রূপান্তরিত হবার পর দিনে তিন জোড়া ট্রেন চলতো এই রুটে। স্থানীয় উৎসব রাসযাত্রা উপলক্ষে ট্রেন বাড়ানো হত। এই ট্রেনের জন্য ইঞ্জিন সমেত মোট আটটি কামরা ছিল। ৭০৩১ ও ৭০৪১ নম্বর যুক্ত কামরা দু’টি ছিলো ইঞ্জিন কাম প্যাসেঞ্জার। এখানে রেল চালকের আসন এবং রেলচালকের বাঁ দিক ছিল ডিজেল ইঞ্জিনটি। সেটি ছিল এখনকার লোকাল বাসে যেরকম ইঞ্জিন থাকে ঠিক সেইরকম। এই জায়গাটুকু বাদ দিয়ে, যাত্রীদের জন্য ছিল চালকের পেছন থেকে কামরার শেষ পর্যন্ত লম্বা টানা সিট। যাত্রীদের সঙ্গে চালকের কোনো আড়াল থাকত না। বসবার জন্য কামরা দুটিতে ২৬টি আসন থাকতো। ৭০৩৮, ৭০০২, ৭০৩৯ নম্বরযুক্ত কামরাগুলি ছিলো মাঝের। এটি সম্পূর্ণটাই ছিলো যাত্রীদের, যেখানে ৪২টি করে বসবার আসন থাকত। শেষের কামরাগুলির নম্বরগুলি ছিল যথাক্রমে ৭০৪০, ৭০৪২ এবং ৭০৪৫। এগুলি ছিল গার্ডকামরা, যেখানে ৪২-এর মধ্যে চারটি সিট কমিয়ে দিয়ে গার্ডের জন্য আলাদা কক্ষ থাকত। প্রত্যেক কামরায় যাত্রীদের ওঠানামার জন্য দুটি করে দরজা থাকত। ট্রেনটি চলবার সময় একটি ইঞ্জিন কামরা, একটি মিডল ও একটি গার্ডকামরা জুড়ে বাদবাকি কামরাগুলি আলাদা করে রেখে দেওয়া থাকত। যখন কোনো কোচ খারাপ হতো তখন খারাপটি মেরামতির জন্য ওর্য়াকসপে পাঠিয়ে, রেখে দেওয়া ভালো কামরা নেওয়া হত। শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত লাইনটির দূরত্ব ছিল ২৭.৩৯ কিলোমিটার এবং ট্রেন এতটাই কম গতিতে চলত যে, যাত্রা শুরুর স্থান থেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় নিত প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। প্রথম প্রথম যখন ডিজেল চলা শুরু করেছিল তখন ট্রেনটির কামরাগুলি রং ছিলো ওপরে ও নিচে কমলা আর মাঝখানে সাদা ক্রিম মতো। পরে অবশ্য সেই কমলা রঙের বদলে আসে ঘন সবুজ রং, মাঝের রং একই থাকে। আসলে কাঁচড়াপাড়া ওয়ার্কশপে যখন যে রঙের আমদানি হত, কামরার রং সেটা করা হত। তিন জোড়া যে ট্রেনগুলি চলত, সেগুলি যথাক্রমে 1/2NS, 3/4NS এবং 5/6NS। যাত্রপথের ভাড়া ছিল ৫ টাকা। সিগন্যাল ব্যবস্থা ছিল ম্যানুয়াল। ডিজেল ইঞ্জিনটা একমুখী হওয়ায়, নবদ্বীপ ঘাট থেকে শান্তিপুরে আসবার পর এক বিশেষ পদ্ধতিতে ইঞ্জিনের অভিমুখ ঘোরানো হত। প্রথমে তিন কামরা থেকে ইঞ্জিন কামরাটি বাকি দু’টি কামরা থেকে আলাদা করে দেওয়া হত। এরপর সেটি ব্যাক করে প্ল্যাটফর্ম থেকে কিছু দূরে রাখা কুমোড়ের চাকার মতোন আকৃতিযুক্ত টার্ন টেবিলে নিয়ে গিয়ে কামরাটিকে লক করে দেওয়া হত। তারপর টার্ন টেবিলের দু’প্রান্তে রাখা লোহার রড ধরে টানতে টানতে ১৮০ ড্রিগ্রি ঘোরালে ইঞ্জিনের অভিমুখ আবার নবদ্বীপ ঘাটগামী হলে, টার্ন টেবিলের লক খুলে আবার প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে বাকি দুটি কামরার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হত।

দূরদূরান্ত থেকে কত মানুষজন ছুটে চলে আসতেন ছোটো রেলে চড়তে 

প্রথমদিকে ট্রেনটি শান্তিপুর থেকে রওনা দিয়ে দিগনগর (কেউ কেউ বলেন, গোবিন্দপুর কালীবাড়িতে থামত) কৃষ্ণনগর, কৃষ্ণনগররোড, আমঘাটা মহেশগঞ্জ হয়ে নবদ্বীপ ঘাটে পৌঁছাত, পরবর্তীকালে কৃষ্ণনগর রোড স্টপেজটি উঠে যাওয়ার পর শেষদিন পর্যন্ত বাদবাকি স্টেশনে থামত। ট্রেনটি ছোটো হলেও যাত্রীদের মধ্যে এতে চড়বার প্রচণ্ড উৎসাহ থাকত। শান্তিপুর থেকে যাত্র শুরু করে ধীরগতিতে জোরে জোরে হর্ন বাজিয়ে গোবিন্দপুর কালীবাড়ি পার করে সেখানকার বাজারের বুক চিড়ে যাওয়ার সময় পথে থাকা মানুষ তার দিকে অবাক নয়নে চেয়ে থাকত। ট্রেনের গতি কম থাকায় ছেলের দল হল্লা করতে করতে তার পেছনে দৌড়ে উঠে পড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর আবার নেমে যেত, আশ্চর্য রকমের অনুভূতি ছিল এই ট্রেনে চড়ার। এরপর ট্রেনটি ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশ দিয়ে সবুজ ধানের জমি, সবুজে ঘেরা পথের মধ্যেখান দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে দুলতে দুলতে চলত। দূরে সড়কের ওপর ছুটে চলা বাসের যাত্রীরা, তন্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত সেই রেলের দিকে, বাচ্চাদের সেই ট্রেন দেখে আনন্দ উৎসাহের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যেত। ট্রেনটি সময়ের কাছে, গতিবেগের কাছে হার মানলেও অতীতের আবেগ ও ঐতিহ্য অহঙ্কার নিয়ে সদর্পে মাথা উঁচু করে নিজস্ব ভঙ্গীতে এগিয়ে চলত। চলার পথে কেউ বা তাকে দেখে হাসাহাসি করত আবার কেউ বা একমুহুর্তের জন্য দাঁড়িয়ে যেত। দীর্ঘ একশো বছর সময় অতিবাহিত করে বহু ইতিহাসের উত্থান পতনের সাক্ষ্য বহন করেও প্রত্যহ শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত কয়েকশো মানুষকে নির্ভয়ে, নিরাপদে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিত। তাঁকে একটিবার দেখা ও ইতিহাসের সাক্ষী জন্য দূরদূরান্ত থেকে কত মানুষজন ছুটে চলে আসতেন ছোটো রেলে চড়তে।

দীর্ঘদিন দিন ধরে ঐতিহ্যবাহী ট্রেনটি চলাচল করলেও রেল কর্তৃপক্ষের নজরে সে ছিল দুয়োরানি। অবজ্ঞা, অবহেলায় জীর্ণ দশাতেও শত অসুবিধা সত্ত্বেও প্রত্যহ শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ ঘাট পর্যন্ত যাত্রীদের পরিষেবা দিয়ে চলত। শুধুমাত্র এলাকাবাসীদের কাছে নয় রেল কর্মচারীদের বড়ো ভালোবাসার পাত্র ছিল এই রেলটি। এরপর শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন ২০০৯ সালে রেলমন্ত্রকের নজরে পড়ল, তখন সেটি ন্যারোগেজের জন্য নয়, সেটি ব্রডগেজ জন্য। ২০১০ সালে ৫ জানুয়ারি রেল কর্তৃপক্ষের অর্ডার আসল এই রুটে আর ছোটো রেল চলবে না, ব্রডগেজ লাইন পাতা হবে। অবশেষে সেই অর্ডার মতে ২০১০ সালে ১৭ জানুয়ারি অতীতের ঐতিহ্য, এলাকাবাসীর অহংকারকে দূরে সরিয়ে রেখে 5/6NS ট্রেনটি শেষবারের মতো এই রুটে চলে। যাত্রীদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে মানুষের আবেগ ও পুরানো ঐতিহ্যকে দূরে সরিয়ে রেখে নতুন ব্রডগেজ লাইন পাতা হয়। বর্তমানে শান্তিপুর থেকে কৃষ্ণনগর হয়ে আমঘাটা পর্যন্ত বড়ো লাইন পাতা হলেও সারাদিনে শান্তিপুর থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত দুই জোড়া ট্রেন চলে।

সহায়ক গ্রন্থ :
১. কলিকাতা দর্পণ, রাধারমণ মিত্র, সুবর্ণরেখা, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর ১৯৫২।
২. কলের শহর কলকাতা, সিদ্ধার্থ ঘোষ, রীডার্স কর্নার, প্রথম প্রকাশ, রাসপূর্ণিমা, ১৩৬৬।

Developed by DXDasia