
‘ধেড়ে গোপাল’, ‘থ্যাবড়া গোপাল’, ‘হামা গোপাল’ আর আশ্চর্য উৎসব
দোল পূর্ণিমা সমাসন্ন। রঙে-উৎসবে মাতবেন বাংলার মানুষ। মেতে উঠবে কবিগুরুর প্রাণের স্থান শান্তিনিকেতন। নবদ্বীপ, মায়াপুরের মতো ধর্মীয় স্থানেও চলবে উৎসব। এই সব অঞ্চলের বসন্ত উৎসব কিংবা দোল উৎসবের দৃশ্য আমাদের পরিচিত। কিন্তু নদীয়া জেলার অন্তর্গত শান্তিপুর অঞ্চলে দোলপূর্ণিমা বা দোলযাত্রা খানিক ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন চরিত্রের।
গঙ্গাতীরবর্তী এই অঞ্চল এমনিতেই ধর্মীয় দিক থেকে বেশ প্রসিদ্ধ। যার সুবাদে শান্তিপুরবাসী প্রায় সারাবছরই নানা পার্বণে, উৎসবে মেতে থাকেন। গণেশপুজো, দুর্গাপুজো, কালিপুজো কিংবা রাসযাত্রা ছাড়াও সেই তালিকায় রয়েছে গণেশজননী, নেত্যকালির পুজো। এবং এ’সবেরই পাশাপাশি দোলযাত্রাকে কেন্দ্র করে গোপাল পুজোর রীতিও শান্তিপুরের প্রত্যেক মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং ভালোবাসার উৎসব। আসন্ন দোলপূর্ণিমার সময় শান্তিপুরের চৌগাছা পাড়া, গোপালপুরের কুমোরটুলিতে চোখ রাখলেই দেখতে পাওয়া যাবে ছোট, মাঝারি, বড়মাপের গোপাল তৈরিকে কেন্দ্র করে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা। রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য গোপাল দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ রং মাখবার আগে রোদে শুকোচ্ছে, আবার কেউ রং মেখে সেজেগুজে রোদে শুকনো হচ্ছে। আর মাত্র কিছু সময়ের অপেক্ষা। তারপরেই ওইসব গোপালেরা রওনা দেবে অঞ্চলের বারোয়ারিতলা থেকে শুরু করে গৃহস্থ বাড়ির উদ্দেশ্যে।

কথিত আছে, শান্তিপুরে গোপাল বিগ্রহের আগমন ঘটে শ্রী অদ্বৈত আচার্যের হাত ধরে বাংলাদেশের যশোর থেকে। কিন্তু ওই গোপালের ভঙ্গিমা দাঁড়ানোর। আবার শান্তিপুরের একজন প্রবীন বাসিন্দা অরুণ সরকারের কাছ থেকে জানা গেল ভিন্ন একটি তথ্য। অধ্যাপক ব্রজলাল বন্দোপাধ্যায়ের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তিনি জানালেন, এই দোল পূর্ণিমার দিনেই শ্রী চৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেছিলেন। চৈতন্যদেবের জন্মতিথিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই নাকি শান্তিপুরে শ্রীকৃষ্ণ তথা গোপাল এবং শ্রীচৈতন্যের পূজা একই সঙ্গে পালিত হয়।
অন্যদিকে মৃৎশিল্পীদের সূত্রে জানা গেল, শান্তিপুরে গোপালপুর অঞ্চলের মৃৎশিল্পী বিনয়কৃষ্ণ পাল, শম্ভুনাথ পাল-সহ আরো বেশ কয়েকজন মৃৎশিল্পী একত্রিতভাবে দোলপূর্ণিমার পঞ্চমী তিথিতে প্রথম ‘ধেড়ে গোপাল’ বা ‘থ্যাবড়া গোপাল’ (বসার ভঙ্গিমা অনুযায়ী এই ধরনের গোপালের নামকরণ) তৈরি করে পুজোর প্রচলন করেন। এর ঠিক পরের বছর ওই মৃৎশিল্পীদের দেখাদেখি চৌগাছা পাড়ার মৃৎশিল্পী অজিত পাল, যোগেন পাল, মহানন্দ পাল, ফণী পাল, বক্রেশ্বর পাল প্রমুখরা ‘হামাগোপাল’ (হামাগুড়ি দেওয়ার আদলে তৈরি গোপাল) বানিয়ে দোলপূর্ণিমায় বড়গোপালের মন্দিরে পুজো শুরু করেন। সেই সময় থেকেই শান্তিপুরে গোপাল পুজোর রীতি আজও সমানভাবে বহমান।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এখানে বারো (১২) দোলে গোপাল পুজোর রীতি প্রচলিত। এর মধ্যে প্রথম দোল অথাৎ দোলপূর্ণিমার দিনে চৌগাছা পাড়া অঞ্চলে গোপাল পুজো হয়। প্রথম দোলের দিন থেকে ঠিক পাঁচ দিন পরে পঞ্চম দোল গোপালপুর অঞ্চলে আনুষ্ঠিত হয়। সপ্তম দোল বাবলায় পালিত হয়। এইভাবেই তিথি অনুযায়ী শান্তিপুরে বিভিন্ন জায়গায় গোপাল পুজোর প্রচলন রয়েছে।
এছাড়াও শান্তিপুরে শ্যামচাঁদ ও গোকুলচাঁদ মন্দিরে বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হয় দোল। উল্লেখ্য, শ্যামচাঁদ দোল হয় পূর্ণিমার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদে। গোস্বামীবাড়ির দোলও বেশ জনপ্রিয়।
শান্তিপুরের গোপালগুলিতে আয়তনের দিক থেকেও বিভিন্নতা লক্ষ করা যায়। প্রায় ছয় ফুট থেকে শুরু করে বার এমনকি চোদ্দ ফুট উচ্চতারও বিশালাকার গোপাল তৈরি হয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে। বারোয়ারি পুজোগুলিতে কখনও বারোয়ারিতলাতেই কাঠামো বেঁধে এইধরনের সুউচ্চ গোপাল তৈরি করা হয়। আবার এই ধরনের বড় গোপালের অনুকরণে পাঁচ-ছয় ইঞ্চির ছোট ছোট গোপালও বানানো হয় ছাঁচের মাধ্যমে। সেগুলো বাড়িতে ‘হাওদায়’ (সুসজ্জিত সিংহাসন যার মধ্যে গোপালকে বসানো হয়) বসিয়ে পুজো করা হয়। শুধুমাত্র বাড়িতেই নয়, বারোয়ারি পুজোগুলিতেও গোপালকে নয়নাভিরাম সাজে সজ্জিত হাওদায় বসানো হয়।

লোকমুখে এই অঞ্চলে গোপালের বহুবিধ নাম প্রচলিত। যেমন- ‘ধেড়ে গোপাল’, ‘থ্যাবড়া গোপাল’, ‘হামাগোপাল’, ‘ননীগোপাল’ ইত্যাদি।
থ্যাবড়া গোপাল- বসার ভঙ্গিমা অনুযায়ী এই গোপালের এমন নামকরণ। এই গোপালের মেদবহুল চেহারা। মাটির ওপর পা মুড়ে বসে থাকে। এক হাতে বাঁশি ও অন্যহাতে ধরা ক্ষীরের পাত্র বা নাড়ু। গোপাল এখানে নগ্ন, গায়ের রং নীলাভ।
হামাগোপাল- ছোট শিশুর হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিমার অনুকরণে এইধরনের গোপাল তৈরি করা হয়। গোপাল এখানে অলংকার পরিহিত, নগ্ন নীলাভ গায়ের রং। শিশুসুলভ বাম হাত মাটির ওপর ভর দিয়ে রাখা এবং ডান হাত বুকের কাছে ওঠানো। ওই হাতে ধরা থাকে মিষ্টি জাতীয় খাবার, যেমন- নাড়ু, মোদক, ক্ষীর ইত্যাদি।

গোপাল পুজোকে কেন্দ্র করে এখানে ডালি নিবেদন উৎসবের প্রচলনও রয়েছে। বারোয়ারি পুজোগুলিতে ডালি নিবেদন করা হয়। অঞ্চলের আরও এক বাসিন্দা মণিমালা দাসের কথায় জানা যায়- কোনও পাড়ায় কোনও বাড়িতে (বিশেষ করে অবস্থাপন্ন) গোপাল পুজোতে অন্য বাড়ির গোপালকেও ডালি নিতে আমন্ত্রণ করা হয়। তখন অন্য বাড়ির সদস্যরা হাওদা করে গোপালকে ওই বাড়িতে নিয়ে যায় এবং আমন্ত্রণ করেছেন এমন ব্যক্তি সকলকে সামর্থ্যমতো লুচি, আলুরদম, সুজি, মিষ্টি ইত্যাদি খাইয়ে থাকেন।
গোপাল পুজোর পরদিন ওই গোপাল নিয়ে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে শোভাযাত্রা বার হয়। ওই শোভাযাত্রায় জাঁকজমকও হয় ভালোই। সেখানে নয়নাভিরাম সাজে সজ্জিত হাওদায় গোপাল বসিয়ে সমগ্র অঞ্চল পরিক্রমা করা হয়। শোভাযাত্রায় বাতি-লন্ঠন নিয়ে পরিক্রমার একটি রেওয়াজ এখানে রয়েছে, যা আলোকসজ্জায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
বিজয়া দশমীতে যেমন দুর্গার মুখে মিষ্টি অর্পণ করে কৈলাসের পথে বিদায় দেওয়া হয়, ঠিক একইভাবে গোপালের শোভাযাত্রাতেও রাস্তার দুইধারে সমবেত হওয়া অসংখ্য মানুষ তাঁদের হাতে থাকা নাড়ু, মুড়কির মোয়া, সন্দেশ গোপালের হাতে তুলে দেন। এমনকি গোপালকে উদ্দেশ্যে করে ছোঁড়া হয় মুঠো মুঠো আবির, যা গোপালের ওই শোভাযাত্রাকে আরো বর্ণময় করে তোলে।
শান্তিপুরে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে জানলার পাশে সুসজ্জিত হাওদায় বসানো ছোট্ট গোপাল, হাতে ধরা একটুকরো সন্দেশ– এমন দৃশ্য খুব স্বাভাবিক। ফাগুনের আকাশে রং লাগতেই হাওদায় গোপালের আগমন ঘটে দোলপূর্ণিমায়। কোথা থেকে যেন ভেসে আসে পরিচিত সুরেলা গান–
‘জয় রাধে গোবিন্দ গোপাল বনমালী।
শ্রীরাধার প্রাণধন মুকন্দ মুরারি।।’
কৃতজ্ঞতা স্বীকার- দীপঙ্কর পাড়ুই, প্রবর্তক সেন, অরুণ সরকার, মণিমালা দাস। এছাড়াও শান্তিপুরের চৌগাছা, গোপালপুর অঞ্চলের সকল মৃৎশিল্পীবৃন্দ। আনন্দবাজার পত্রিকা (শনিবার, ৯ মার্চ, ২০১৯)।
আলোকচিত্র- শ্রীদত্তা সেন, লেখক।
