
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২১
প্রায় দুই সপ্তাহ জলে ভাসার পরে আজকে প্রথম জাহাজ ভিড়লো ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্তর্গত কুরাসাওতে। ভেনেজুয়েলার ৩৮ মাইল উত্তরে এই দ্বীপের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৩৬ মাইল ও ৬ মাইল। জাহাজ থেকে প্রথম যখন কুরাসাওকে দেখতে পেলাম, দেখা গেল বেলেপাথর, চুনাপাথর আর প্রবালের তৈরি পাহাড়, নীল সমুদ্রকে উপেক্ষা করে হাত বাড়িয়েছে আকাশের দিকে। আমাদের জাহাজ ভিড়েছে এই ছোট্ট দ্বীপের রাজধানীতে, যার নাম উইলেমস্টেড। কুরাসাও (Curacao) পাহাড়ি দ্বীপ। একটু কাছে আসতে ঠাহর করতে পারলাম অদ্ভুত রংচঙে এখানকার বাড়িঘর। কেউ হলুদ, কেউ নীল, কেউ কমলা রঙে রাঙানো। সূর্যের আলোয় ঘন নীল জলকে সামনে রেখে, যেন কোনো চিত্রকর তার রঙের পসরা সাজিয়ে রেখেছে। চোখে পড়লো সেন্ট আনা বে’র ওপরে কুইন এমা পন্টুন ব্রিজ, যা তৈরি হয়েছিল ১৮৮৮ সালে।

শুনেছিলাম যে শহরে প্রায় ৮০% মানুষ আফ্রিকান দাসেদের বংশোদ্ভূত। ১৭৯০ সালের ভেতরেই এখানকার আরাওয়াক জাতির মানুষদের মেরে কেটে সাফ করে দিয়েছিল ঔপনিবেশিকদল। যদিও এখানকার সরকারি ভাষা ডাচ এবং মুদ্রার নাম গিল্ডার, তবু অন্য আরেকটা ভাষাতেই মানুষজন কথা বলে, যার নাম পাপিয়ামেন্ত। এই ভাষাতে নাকি পর্তুগিজ, ডাচ আর স্প্যানিশ অংশবিশেষ আছে। ১৯৫১ সালে কুরাসাও স্বাধীনতা পায়। এখানে অর্থনীতির শিরদাঁড়া হলো পর্যটন। এছাড়া এই দ্বীপের রপ্তানির ভেতরে আছে ক্যালসিয়াম ফসফেট আর কুরাসাও নামে এক ধরনের মদ। এখানে একরকম টক কমলালেবু পাওয়া যায়; তার খোসা দিয়ে তৈরি হয় কুরাসাও মদ যা বহির্বিশ্বে কুয়ান্ত্র (Cointreau) নামে পরিচিত।

আমাদের জাহাজ যখন উইলেমস্টেড বন্দরে ভিড়লো তখন কাস্টমসের নানা খুঁটিনাটি নিয়মকানুনের ফাঁকে ডেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম পাথুরে পাহাড়ের গায়ে গজিয়েছে মানুষের চেয়েও লম্বা ক্যাকটাস। প্রবাল আর চুনাপাথর পাহাড়ের ফাঁকে ফোকরে বাসা বেঁধেছে অসংখ্য ছোটো ছোটো পাখি, যারা আমাদের বিশাল জাহাজ দেখে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওড়াউড়ি শুরু করেছিল। অবশেষে জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণা করা হলো—
“All officers and crew have been granted liberty.”
ব্যাস আর যায় কোথায়! অমনি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কুরাসাওর পথে। চোখ জুড়ানো শহর.. চোখ জুড়ানো রং… চোখ জুড়ানো হাসি খুশি মানুষজন। সারা শহর জুড়ে হৃদয় জুড়ানো ক্যারিব সাগরের হাওয়ার অতিব্যস্ত যাতায়াতে বিচলিত খেজুর গাছের পাতারা। সব সময় সেই হাওয়ার আর পাতার কথাবার্তা শোনা যায় দ্বীপে। হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম কুরাসাও শহরের মাঝে একটা টাউন-স্কোয়ারে। জলের সামনে সুন্দর বেদি করে বসার ব্যবস্থা …মাথায় ছাতা ধরে আছে খেজুর গাছের পাতা… বাচ্চারা খেলে বেড়াচ্ছে …রোদ-ঝলমল দিনে আর ক্যালিপসো বাজনা বাজছে চারিপাশে। দেখলে মনে হবে না এই শহরে কোনো দিন সোমবার সকাল আসে আপিসের সাজে।

আজ এখানে নির্বাচন। দেখলাম একদল হল নীল পতাকার লোক… আরেকদল লাল পতাকার। বেশিরভাগ গাড়িতে নীল পতাকা দেখে মনে হল ওদেরই বোধ হয় জেতার সম্ভাবনা বেশি। টাউন স্কয়ারের সামনে কুইন এমা পন্টুন ব্রিজ ভারি মজার। কোনো জাহাজ এসে পড়লে জোরে ঘণ্টি বাজে। ব্রিজের ওপরের মানুষজন দৌড়ে ব্রিজ থেকে নেমে পড়েন আর ব্রিজটা খুলে গিয়ে জাহাজ যাবার পথ করে দেয়। তারপরে আবার ব্রিজ চিচিং বন্ধ হয়ে যায়। বেশ খানিকটা সময় ধরে নতুন দেশের নতুন নিয়ম কানুন দেখে, খেজুর গাছের তলায় সুস্থির হয়ে বসে একটা টুনা ফিস স্যান্ডউইচ খেয়ে ভাবলাম এবার একটু দ্বীপটা ঘুরে দেখা যাক।
একবার টিকিট কেটে সামনের গেট দিয়ে ঢুকলে আরামসে তুমি বসে থাকতে পারো যতক্ষণ না বাস আবার উইলেমস্টেড ফিরে আসে। ১ ডলারে একটা গোটা দ্বীপ চষে ফেলার সুবন্দোবস্ত আর কি।
টাউন স্কোয়ারের ঠিক পিছনে শহরের বড়ো বাস স্টপ। সেখানে ইনফর্মেশন বুথে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে দুপুর একটায় ‘লাগুন’ অভিমুখে বাস ছাড়বে যেটা আমাকে দ্বীপের একেবারে অন্য প্রান্তে নিয়ে যাবে। বাস ভাড়া প্রায় ১ ডলার। মাত্র এক মুদ্রায় একটা গোটা দ্বীপ দেখে ফেলার সুযোগ অর্থনীতির লোক কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারে না। অতএব টিকিট কাটা আর ছাউনির তলায় অপেক্ষা করা। একটু পরেই বাস চালিকা এলেন। এর মধ্যে লক্ষ্য করছিলাম যে এখানকার মেয়েদের চুল এমনিতে কোঁকড়ানো হলেও ওরা ট্রিটমেন্ট করিয়ে চুল সোজা করে ফেলে আর ভীষণ লম্বা নখে অনেক রকম রংয়ের কারিকুরি করে। নখের ওপরে মানুষ যে এত রকম চিত্র-বিচিত্র করতে পারে তা কুরাসাও না এলে জানতেই পারতাম না। মেয়েরা প্রত্যেকেই আঁটোসাঁটো গেঞ্জি আর জিন্স পরা। আমাদের বাসের চালিকাও মাথার চুল সোজা করে এত হেয়ার স্প্রে দিয়েছেন যে তাতে একটা ঢিল মারলে আসবেষ্টস চালের মত ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে! এইসব বাসে কোনো কন্ডাকটর হয় না। সামনের দিকের দরজা দিয়ে উঠে চালিকাকে ভাড়া দিতে হবে আর একটা ছোটো গেট ঠেলে সিটে গিয়ে বসতে হবে। নামার সময় ঘণ্টা বাজিয়ে ওনার দৃষ্টি আকর্ষন করতে হবে আর পিছনের দরজা দিয়ে নেমে যেতে হবে। অর্থাৎ একবার টিকিট কেটে সামনের গেট দিয়ে ঢুকলে আরামসে তুমি বসে থাকতে পারো যতক্ষণ না বাস আবার উইলেমস্টেড ফিরে আসে। ১ ডলারে একটা গোটা দ্বীপ চষে ফেলার সুবন্দোবস্ত আর কি।
বাস এগোল পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। একদিকে জনবসতি আর অন্যদিকে ঘন নীল সাগর। বাসের জানালা নামানো তাই বাইরের আলো বাতাসের আড়াল ছিল না কোনো। আমি অন্তরঙ্গ হচ্ছিলাম নতুন দেশের সঙ্গে, কোনো রকম ব্যবধান না রেখে। নির্বাচনের উত্তেজনা চোখে পড়ল বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে। দেখলাম এখানকার মানুষেরা তাদের বাড়ির সামনের এক চিলতে বাগানে আম, কাঁঠাল, রঙ্গন, জবা, কাঁঠালিচাঁপার গাছ লাগিয়েছে। দেশের থেকে এত দূরে, দেশের কথা মনে পড়ানো গাছগুলি দেখে যে কতটা ভালো লাগছিল, তা বোধহয় লিখে বোঝানো যাবে না।
সামনের দরজা দিয়ে মানুষ ওঠে আর পিছনের দরজা দিয়ে নামে। সবকটি বাসস্টপে দেখি সাইনবোর্ডে লেখা আছে বুসাল্টে (Bushalte)। ভাবলাম বুসাল্টে নিশ্চয়ই এখানকার একটা মস্ত প্রদেশের নাম। দ্বীপের ভিতর ছোটোখাটো রাজ্য আর কি। কিছুক্ষণ পরে ছাগ-ভাব অস্তমিত হলে বুঝলাম যে, বুসাল্টে সন্ধি বিচ্ছেদ করলে হবে Bus+Halte অর্থাৎ ‘বাস স্টপ’।

সেই কারণেই মানুষ জনেরা ওঠানামার পথে এই সাইনবোর্ড লটকানো রয়েছে। চোখ ভরে, প্রাণ ভরে দেখলাম ঘরোয়া কুরাসাওকে। দ্বীপের একেবারে শেষ প্রান্তে এক মায়াবী লাগুন। সাগরের খানিকটা জল উৎসুক হয়ে ঢুকে পড়ে আর বুঝি ফিরে যাবার পথ খুঁজে পায়নি। কী সুন্দর সেই জলের রং… কী সুন্দর পাখিদের উড়ে বেড়ানো আর কী সুন্দর তাদের ঘিরে থাকা গাছের সবুজ।
বাস যখন আবার তার গুমটিতে ঢুকলো আমার চোখে তখনও আশ্চর্য সব রঙের খেলা। বিকেল ঘনিয়ে আসছিল। আমি কুইন এমা পন্টুন ব্রিজ হেঁটে পার হয়ে পৌঁছলাম জলের ধারে সুন্দর ছাতার তলায় টেবিল সাজানো ইগুয়ানা কাফেতে। এক কাপ চা আর অল্প ‘টা’ বলে থিতু হলাম কিছুক্ষণ।

কাফে ইগুয়ানোর সামনে সূর্য ডুবলো ক্যারিব সাগরের নীলে। মাথার উপরে আকাশের তারারা ফুটে উঠল ধীরে ধীরে। চারিধারে ক্যালিপসো বাজনার সুর… আর আমি সেদিনের মতো আস্তানা গাড়লাম আমার একান্ত নিজস্ব বুসাল্টেতে।
‘এ আকাশ ভাঙ্গে মাঝে মাঝে
ও আকাশ মেঘে আত্মহারা
সে আকাশে নৌকা খোলা আছে
মা আমি আকাশ ভরা তারা’
চলবে…
___________________
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
