ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : প্রেম-পুলিশ আর চন্দন সাবানের কথা

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৯

সমুদ্র যাত্রা

  গত পর্বের পর  

জ ডিপার্টমেন্ট হেড মিটিং ডেকেছিলেন ক্যাপ্টেন টমাস বুশী। জাহাজ পরিচালনা সংক্রান্ত নানা জরুরি কথার পরে উনি গম্ভীরমুখে জানালেন যে, জাহাজে ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে প্রেমের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তারা নাকি ডেকে হাত ধরাধরি করে সূর্যাস্ত দেখছে এবং গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। দুদিন আগে নাকি সূর্যাস্তের পরে, প্রেমবিহ্বল  অবস্থায় দুজন ধরা পড়েছে লাইফবোটের ভিতর। ক্যাপ্টেন বললেন… অ্যাপারেন্টলি… দে ওয়্যার মেকিং আউট…! এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, এই জাহাজে ৬৯৮ জন ছাত্রের ভিতরে ৫১ জন মহিলা। অতএব, প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপার ঘটলে, যে সব ছাত্র প্রেমিকা জোটাতে পারেনি, তাদের ভিতর একটা বিক্ষুব্ধভাব দেখা যায়। অচিরেই ছাত্রদের ভিতরে মারামারি লেগে যায়। ক্যাপ্টেন বললেন যে, ঘটনা শুধু জাহাজেই সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়। গত বছর এইরকম একটি ভাসমান প্রেমঘটিত আবেগ পরের দিকে ডাঙায় পৌঁছে তার বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছিল। প্রেমিকপ্রবর তার পুরোনো বান্ধবীর কাছে ফিরে যায়, আর সদ্য প্রত্যাখ্যাতা প্রেমিকা ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট–এর মামলা ঠোকে। সেই মামলার প্রকোপে আর উকিলের বাড়ি দৌড়োদৌড়ি করতে জেরবার হয়েছিল ক্যাপ্টেন বুশী, কারণ তার  ওপরেই জাহাজের ছাত্রছাত্রীদের ভালোমন্দর দায়িত্ব। এটা খুবই দুঃখজনক যে আজকাল বেশিরভাগ প্রেমেরই নিষ্পত্তি হয় আদালতের চৌহদ্দিতে। অ্যান্ড দে লিভড হ্যাপিলি এভার আফটার… বড়ো একটা শুনি না।

তা এই ঘটনায় হাত পুড়িয়ে ক্যাপ্টেন-এর তাই প্রেমঘটিত যে কোনো ব্যাপারে বিশেষ বিরক্তি। উনি সাফ জানিয়ে দিলেন… দেয়ার ইজ এ রুল অন দিজ শিপ… ইফ দ্য ক্যাপ্টেন এন্ট গেটিং এনি… নোবডি ইজ গেটিং এনি! এই নিয়মের কথা শুনে তো ঘরের আমরা কজন মাথা নীচু করে মুখ টিপে হাসতে লাগলাম

প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপার ঘটলে যে সব ছাত্র প্রেমিকা জোটাতে পারেনি, তাদের ভিতর একটা বিক্ষুব্ধভাব দেখা যায়। অচিরেই ছাত্রদের ভিতরে মারামারি লেগে যায়। ক্যাপ্টেন বললেন যে, ঘটনা শুধু জাহাজেই সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়।

যাই হোক, আমাদের ওপরে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে আমরা যেন সদাসতর্ক থাকি… প্রেমের কোনো ছিটেফোঁটাও নজরে এলে যেন তা সমূলে বিনষ্ট করি বা ক্যাপ্টেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। পাঠ্যসূচির বাইরে এহেন জটিল দায়িত্ব পেয়ে বলাই বাহুল্য একটু হকচকিয়ে গেছি। আশা করছি বাকি দিনগুলোতে আমার সামনে কেউ হাতে হাত রাখবে না, গলা জড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখবে না, চুমু খাবে না বা তার চেয়েও ঘোরতর কোনো অপরাধ করবে না… আশা করছি… এইমাত্র…।

আলোর পথ

“সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়োনাকো তুমি; 
বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে— আরো দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেওনাকো আর।…”

এখন আর কোথাও তীরভূমি দেখা যায় না… যেদিকে তাকাই নীল আর নীল। স্থলভূমি থেকে এত দূরে আমরা যে পাখিরাও আর আমাদের নাগাল পায় না। ডেকে দাঁড়ালে মনে হয় আমাদের জাহাজের মানুষজন ছাড়া আশেপাশে বুঝি কোথাও জীবন নেই… প্রাণ নেই। পরক্ষণেই বুঝি সেটা ভ্রান্ত ধারণা… আমাদের চোখ এড়িয়ে গভীর জলে রয়েছে আরও একটা পৃথিবী… সেখানে কোটি কোটি জীবজন্তু উদ্ভিদের বাস… যতক্ষণ না ডলফিনেরা জলের ওপরে লাফিয়ে কসরত দেখায়, রুপোর ছিলার মতো উড়ুক্কু মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় ঢেউয়ের ওপর দিয়ে, তিমি মাছ তার রাজকীয় ল্যাজের ঝাপটা দেয়… তাদের উপস্থিতি টের পাই না… অবিশ্বাস করি তাদের অবস্থান… আসলে  দেখতে না পাওয়ার দায়টা তো আমাদেরই।

নীল জলের ডলফিন

আমার পাশের কেবিনে ঠাঁই পেয়েছেন এমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ক্রিস। ক্রিসের হাবভাব অনেকটা প্রেমেন্দ্র মিত্রের অবিস্মরণীয় চরিত্র ঘনাদার মতো। সে সব বিষয়েই শেষ কথা বলতে চায়। ফ্লাই ফিশিং নিয়ে কথা হলে অবশ্যই ওর ছিপে ধরা পড়বে সবচেয়ে বড়ো দৈত্যাকার মারলিন মাছ, ওয়াইনমেকিং নিয়ে কথা হলে ওর সেলারে থাকবে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সুরা, বাড়ি ঘর নিয়ে কথা হলে অবশ্যই ওর বাড়ির রিয়েল এস্টেটের ভ্যালু হবে আকাশছোঁয়া ইত্যাদি। খাবার সময় ক্রিসের আকাশকুসুম কল্পনায় রাঙা গল্পের ওজনে আমরা বেশ কাবু হয়ে পড়ি। ক্রিস সকলকে জানিয়েছে যে ও পোল্যান্ডের এক রাজপরিবারের বংশোদ্ভূত। তাই জাহাজ সুদ্ধ সকলে ওকে পোলিশ প্রিন্স নাম দিয়েছে।

তা আজ সকালে প্রাতঃরাশের সময় সবে এক গ্লাস কমলালেবুর রস আর এক ফালি খরমুজ নিয়ে টেবিলে বসেছি- দেখি ঘনাদা আমায় জিজ্ঞেস করছে, ‘মে আই জয়েন য়ু!’ আমি বেশ চমকে গিয়ে ‘নিশ্চয়ই, অবশ্যই’ বললাম। ক্রিস চেয়ার টেনে বসল আর আমাকে আরও চমকে দিয়ে বলল যে, ‘রোজ সকালে তোমার ঘর থেকে একটা সুগন্ধ আসে… তুমি কি কোনো ইনসেন্স স্টিক (ধূপকাঠি) জ্বালাও?’ আমাদের জাহাজ কেবিনে কোনোরকম আগুন জ্বালানোয় কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে। আমি বললাম, ‘না তো ক্রিস… আমি তো কিছু জ্বালাই না…’। পোলিশ প্রিন্স ক্রিস বলল, ‘আই গেট দিস বিউটিফুল ওরিয়েন্টাল স্মেল।’

চন্দন সাবান

অনেক চিন্তাভাবনা করে অবশেষে বুঝলাম যে, ও নিশ্চয়ই মাইসোর স্যান্ডাল সাবানের কথা বলছে। পাশাপাশি কেবিন হওয়ায় রোজ সকালে চন্দন সাবানের গন্ধ ওর ঘরে পৌঁছায়। আমি ক্রিসকে একটা সাবান দেবার অঙ্গীকার করে মুচকি হেসে ক্লাস পড়াতে গেলাম।

আশা করবো চন্দন সাবানের ‘বিউটিফুল ওরিয়েন্টাল স্মেল’-এর সুবাসে  আমাদের পোলিশ প্রিন্স, ওজনদার  গল্পগুলির ভার কাটিয়ে একটু ফুরফুরে হালকা হতে পারবে।

ক্রমশ…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia