ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : জ্যাক গোমসের ঠিকানা

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৮

  সপ্তম পর্বের পর  

খুব সকালে ঘুম ভাঙলো। পোর্ট হোল দিয়ে এক চিলতে আকাশ দেখা যায়। আকাশের পাঁশুটে রং দেখে  সময়টা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিলাম। ঘরের অন্ধকারে মনিবন্ধের ঘড়িতে সময় ঠিক ঠাহর করা যায় না৷ ভোর পাঁচটা হবে বোধহয়।

কলকাতা (Kolkata) থেকে বোস্টন (Boston) ফিরেই ঝটপট তল্পিতল্পা গুছিয়ে, তিন দিনের মাথায় জাহাজে উঠেছিলাম। অসম্ভব ব্যস্ততায় কেটেছিল দিনগুলো। কলকাতার শীতলতম ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বোস্টনের গতানুগতিক -৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আচমকা উৎপাটিত হয়ে, একটা গলা ব্যথা আর কাশি ঘ্যানঘ্যানে প্রেমিকার মতো সঙ্গ ধরেছিল। তার হাত থেকে রেহাই পেতে অন্যান্য বারের মতো শ্রীমান অ্যান্টিবায়োটিকের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে স্থিতপ্রজ্ঞ হোমিওপ্যাথির হাত ধরেছিলাম। স্থিতধীজন যে একটু ঢিলে ঢালা হবেন সেটা বলাই বাহুল্য। প্রেমিকা তাই সারারাত কাশির প্রকোপে বেশ ভুগিয়েছে। গলার আওয়াজ আষাঢ় মাসের কোলা ব্যাঙকেও লজ্জা দেবে। আজকে যারা ক্লাস পড়তে আসবে সেই সব ছাত্রদের কথা ভেবে বেশ খারাপ লাগছিল।

আমার কেবিনে ধীরে ধীরে সূর্যের আলো ফুটছে। এইবার আমার উচিত বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ হাত ধুয়ে ক্লাসের জন্য তৈরি হওয়া। তবু কিছুক্ষণ গড়িমসি করছিলাম৷ গত কয়েকদিনের স্থান-কাল-পাত্র পরিবর্তন চোখের সামনে ভাসছিল। এই কদিন আগেই কলকাতা… মা-বাবা, আত্মীয়-বন্ধু, নলেন গুড়ের সন্দেশ-মিহিদানা-পাটিসাপটা… তারপরেই হঠাৎ কনকনে বোস্টন। সেখানে কয়েকদিন দৌড়ঝাঁপ করে একেবারে অকূলপাথারে। খানিক সমুদ্র ভ্রমণ সেরে ট্যাম্পা (Tampa) আর অরল্যান্ডোর (Orlando) হাকুন মাটাটা। তারপর আবার সেই মহাসমুদ্র। চারিদিকে জল আর আকাশ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। কেমন যেন ছিন্নমূল চলমান অশরীরীর মতো মনে হয় নিজেকে। যেন কোনো ঘর নেই… ঠিকানা নেই… শিকড়  নেই।

ক্লাস পড়ানো মন্দ হচ্ছে না। আমরা পালা করে নৌ-বাণিজ্যের নানা বিষয় পড়াই। সকাল থেকে বিকেল অব্দি ক্লাস চলে। মাঝে এক ঘন্টা দুপুরের খাবার সময়। কখনো কখনো ছাত্রদের মিনিট দশেকের ছুটি দিই আর ওদের মতো নিজেরাও একটু ডেকে দাঁড়িয়ে এক বুক সমুদ্রের হাওয়া নিয়ে আবার ক্লাসে ফিরে আসি। যেদিকে দু-চোখ যায় কেবল জল আর জল। ভূগোলের বইয়ে ছোটোবেলায় পড়া পৃথিবীর তিন ভাগ জল ব্যাপারটা এর আগে কখনো এমন ভাবে বুঝিনি।

দমদমের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবার। বেশ কয়েক বছর আগে, জ্যাকের বাবা চাকরি সূত্রে বোস্টন আসেন। তারপরে আস্তে আস্তে এ দেশে আসে গোটা পরিবার।

জলরং

দিনের সময় অনুযায়ী জলের রং বদলায়। পরিষ্কার দুপুরগুলোতে জলের রং গভীর নীল। জাহাজের গতিপথে আছড়ে পড়ে ফেনার রুপোলী মুকুট পরা ঢেউ আর তাদের ওপরে  ভেসে যায় চকচকে ছিলে কাটা উড়ুক্কু মাছের দল। সে ভারী আশ্চর্য দৃশ্য।

উড়ন্ত মাছের দল

আজ ক্লাসের ফাঁকে ছাত্রদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কে কোন শহর থেকে এসেছে… কে কী নিয়ে লেখাপড়া করতে চায়… অবসর সময়ে কী করতে ভালোবাসে… ইত্যাদি প্রভৃতি৷ শুনছিলাম কেউ এসেছে মাসাচুসেটস (Massachusetts), কেউ ভার্জিনিয়া (Virginia), কেউ ফ্লোরিডা (Florida), কেউ বা পানামা (Panama) থেকে। ছাত্ররা একে একে তাদের শহরের কথা, তাদের বাড়ি ঘরদোরের কথা বলছিল৷ অনেকেই এই প্রথম বাড়ি ছেড়ে এতটা দূর এসেছে -তাও বা সমুদ্রের মাঝখানে। এমনিভাবে কথাবার্তা এগোচ্ছে… বেশ ভালো লাগছিল ক্লাসের পড়ার বাইরে এই অন্তরঙ্গতা।

এই কদিন আগেই কলকাতা… মা-বাবা, আত্মীয়-বন্ধু, নলেন গুড়ের সন্দেশ-মিহিদানা-পাটিসাপটা… তারপরেই হঠাৎ কনকনে বোস্টন। সেখানে কয়েকদিন দৌড়ঝাঁপ করে একেবারে অকূলপাথারে।

জাহাজের মধ্যে ক্লাসরুম

বাড়ির টান

আমার ক্লাসে জ্যাক গোমস নামে একটি লাজুক ছেলে পড়তে এসেছে। বাদামি গায়ের রং, কালো চুল- চুপচাপ থাকে ছেলেটি। গায়ের রং দেখে আন্দাজ করেছিলাম যে হয়তো মেক্সিকো বা পানামা থেকে পড়তে এসেছে। স্বল্পভাষী ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
সে বলল, ‘বাড়ি ইন্ডিয়া (India)।’
আমি বললাম, ‘সেকি! আমিও তো ইন্ডিয়া থেকে এসেছি। কোন শহরে তোমার বাড়ি?’
সে বলল, ‘কলকাতা। আমি দমদমের (Dumdum) ছেলে।’

আমি বহুদিন এতো অবাক হইনি। সঙ্গে সঙ্গে মাথার ভেতরে একছুট্টে মা-বাবা, আত্মীয়-বন্ধু, নলেন গুড়ের সন্দেশ-মিহিদানা-পাটিসাপটা…

দমদমের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবার। বেশ কয়েক বছর আগে, জ্যাকের বাবা চাকরি সূত্রে বোস্টন আসেন। তারপরে আস্তে আস্তে এ দেশে আসে গোটা পরিবার। হাইস্কুল পাশ করে জ্যাক মেকানিকের কাজ করত। কয়েক বছর টাকা পয়সা জমিয়ে এবার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছে। ক্লাসের শেষে জ্যাক আমাকে বাংলায় বলে গেল, ‘আপনার সাথে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগলো৷ আপনি ভালো থাকবেন।’

জ্যাক গোমসের সঙ্গে

রাতের খাবার পর থেকে ডেকে এসে দাঁড়াই। চারিদিক নিকষ কালো। অশান্ত ঢেউয়ের জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ার আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। মাথায়, মুখে ঝাপটা মারে জোলো হাওয়া। ডেকের পাটাতন ঢেউয়ের ধাক্কায় দোল খায়। মাথার ভেতরে, বুকের ভেতরে, সমস্ত চেতনা জুড়ে তখন জ্যাক গোমসের ঠিকানা।

‘সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন
দুঃখী ওঠে জেগে
চোখের সামনে দুলতে থাকে আকাশ
নিচে শহর দুলতে থাকে ঘর
তারার মতো মিলিয়ে যেতে থাকে
মানুষবিহীন রাত্রিবেলার পথ।’

ক্রমশ…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia