
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৭
ষষ্ঠ পর্বের পর
আমাদের জাহাজে রবিবার আসে একটা অন্যরকম আমেজ নিয়ে। কয়েকজন মানুষ ছাড়া সেদিন সকলের ছুটি থাকে। যাদের রবিবারেও কাজ করতে হয় তারা হল রান্নাঘরের রাঁধুনি, ইঞ্জিন রুমের কিছু ইঞ্জিনিয়ার, খালাসী আর ওপরে ব্রিজে কিছু নেভিগেশন অফিসার। এরা হয় জাহাজ চালানোর কাজ নয়তো উদর চালনার কাজে ব্যস্ত থাকে। এদের রবিবারও ছুটি নেই। সোম থেকে শনিবার একটানা ক্লাস করার পরে রবিবার সব ছাত্র এবং শিক্ষকের ছুটি। আজকের প্ল্যান অফ দ্য ডে-তে (Plan of the Day) নিজের মর্জি মাফিক যা খুশি বসিয়ে নিলেই হল। ছাত্ররা খুব স্বাভাবিকভাবেই সানডে এট সি-র (Sunday at Sea) প্রতীক্ষায় থাকে। ক্লাস করতে হয়না – ইউনিফর্ম পড়তে হয়না – জাহাজের ছোটোখাটো সারাই আর সাফসুতরো কিছুই করতে হয় না। আর যেহেতু ছাত্রদের ছুটি, তাই শিক্ষকদেরও ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। সকাল থেকেই জাহাজের বিস্তীর্ণ ডেকে চড়ুইভাতির আমেজ।
আজকের দিনের শুরুটা একটু মেঘলা মত ছিল। আকাশের রং হাত বাড়িয়ে সবসময় জলকে ছুঁয়ে থাকে। সকালে আমার কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি সাগরের ঢেউ অভিমানিনী মতো মুখ কালো করে আছে। স্কুলে ভূগোলের বইতে পড়েছিলাম যে এই এলাকা দিয়ে আনাগোনা করে ট্রেড উইন্ড। বাংলায় বলে বাণিজ্য বাতাস। তারা সব ভীষণ ব্যস্তসমস্ত হয়ে রাগী থমথমে ঢেউয়ের চুলের টেরি নষ্ট করে মাথাগুলি আলুথালু করে দেয়। পালতোলা জাহাজের যুগে, চলমান বাতাসের ধরন, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় সাম্রাজ্য-নির্মাণ করতো বাণিজ্যের পসরা সাজিয়ে। আমাদের গন্তব্য পুয়ের্তো রিকোতে সারা বছর ধরে চলে এই ট্রেড উইন্ডের দস্যিপনা।
স্কুলে ভূগোলের বইতে পড়েছিলাম যে এই এলাকা দিয়ে আনাগোনা করে ট্রেড উইন্ড। বাংলায় বলে বাণিজ্য বাতাস। তারা সব ভীষণ ব্যস্তসমস্ত হয়ে রাগী থমথমে ঢেউয়ের চুলের টেরি নষ্ট করে মাথাগুলি আলুথালু করে দেয়।

ট্রেড উইন্ড গ্রাফিক্স
সকাল থেকে সূর্যদেব বেপাত্তা হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীরা, যারা সানডেতে বেশ ভালো করে সূর্য স্নান করবে ভেবেছিল তারা দেখলাম বেশ বিমর্ষ। হাতে ট্যানিং লোশন আর বড়ো তোয়ালে নিয়ে বেজার হয়ে বসেছিল সকলে। এরই মধ্যে খোলা ডেকে শুরু হয়েছে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। স্যালাড, বার্গার, হট ডগ, নানা রকম ফলের রস, কেক পেস্ট্রি ইত্যাদি সাজানো রয়েছে। যে যত ইচ্ছে খেতে পারো। গনগনে গ্রিলের আগুনে ঝলসানো হচ্ছে মাংস আর তার গন্ধ ছড়াচ্ছে সমস্ত ডেক জুড়ে৷ আজ ছাত্ররা এসেছে নানা রঙের সাঁতারের পোশাক, টি-শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরনে। কারো আজ ইউনিফর্মের বালাই নেই। যে গুরুগম্ভীর চেহারার ছেলেটি ক্লাসে মনোযোগী হয়ে অংক কষে, তার ডান হাতের বাইসেপে যে এরকম একটা কঙ্কালের খুলি উল্কি করা আছে তা কে জানতো! পুজো প্যান্ডেলের মতো ডেকে মাইক লাগানো হয়েছে আর তাতে সমানে বেজে চলেছে নানারকম নাচের বাজনা। খোলা আকাশের নিচে, জলে ভাসতে ভাসতে, এক মজাদার পিকনিকের ব্যবস্থা।

খোলা আকাশের নিচে, জলে ভাসতে ভাসতে, এক মজাদার পিকনিকের ব্যবস্থা

ছাত্ররা এসেছে নানা রঙের সাঁতারের পোশাক, টি-শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরনে
দুপুর নাগাদ সূর্যদেব মেঘের পর্দা সরিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলেন। ব্যাস আর যায় কোথা! চোখের পলকে আমাদের জাহাজের ডেক হয়ে গেলো এক সূর্যস্নানের বেলাভূমি। ছাত্ররা একে বলে ‘দ্য স্টিল বিচ’ (The Steel Beach) অর্থাৎ ইস্পাতের বালুকাবেলা। গায়ে জবজবে করে ট্যানিং লোশন মেখে, লম্বা তোয়ালে বিছিয়ে, সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে, কল্পনার ওপরে একেবারেই নির্ভরশীল না হয়ে, রোদে ভাজাভাজা হবার কর্মসূচি শুরু হল তৎক্ষণাৎ।

গ্রিলে ঝলসানো মাছ
সন্ধেবেলা যখন আবার ডেকে এলাম তখন ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ছটা বাজে। আমাদের জাহাজে এই সময়ে রাতের খাওয়া সেরে ফেলতে হয়। ছেলেমেয়েরা সারা দুপুর রোদে পুড়ে বেশ খোলতাই চেহারা করেছে। নার্স এন ফ্রেডরিকসন ব্যাজার মুখে তাদেরকে সানবার্নের মলম দিচ্ছেন। গ্রিলে ঝলসানো হচ্ছে মাংস। দূরে কিউবার তটরেখা দেখা যাচ্ছে৷ সকলের বেশ একটা গা এলানো ভাব। কিউবাকে মনে রেখে কিনা জানিনা, ডেকে দেখি কয়েকজন চুরুট ধরিয়েছে। চুরুটের গন্ধের সঙ্গে ঝলসানো মাংসের ককটেল কমলা রঙের সূর্যাস্তকে একটা অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে যেন।
যে গুরুগম্ভীর চেহারার ছেলেটি ক্লাসে মনোযোগী হয়ে অংক কষে, তার ডান হাতের বাইসেপে যে এরকম একটা কঙ্কালের খুলি উল্কি করা আছে তা কে জানতো! পুজো প্যান্ডেলের মতো ডেকে মাইক লাগানো হয়েছে আর তাতে সমানে বেজে চলেছে নানারকম নাচের বাজনা।
হঠাৎ ছাত্রদের মধ্যে একটা হইচই উঠলো। একদিকে বেশ একটা জটলা। ভিড় ঠেলে দেখি ওদের ফেলা ছিপে এক বিশাল সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়েছে। অনেকক্ষণ ধরে খেলিয়ে সেই মাছটিকে যখন ডেকে তোলা হলো তখন দেখি সে প্রায় আধ মানুষ সমান লম্বা। গায়ের রং আধপাকা পাতি লেবুর মতো হলদে আর সবুজ মেশানো। যে ছেলেটি মাছ ধরেছিল সে বীরবিক্রমে তখনও জীবন্ত, লেজ ঝটপটানো মাছটিকে নিয়ে নানা পোজে ছবি তুলতে লাগল। (প্রচ্ছদের ছবি দ্রষ্টব্য) এরপর ডেকের উপরে একটা প্লাস্টিক পেতে, ধারালো ছুরি দিয়ে মাছটির লম্বা কয়েকটা টুকরো করে আগুনে ফেলতে বড়োজোর পাঁচ মিনিট সময় লাগল ছেলেটির। ওর এই মুন্সিয়ানা দেখে মনে হল, লেক মার্কেটের মাছের বাজারে, ধ্রুবর দোকানের পাশে, অনায়াসে একটা স্টল খুলতে পারে! একটু পরেই আমাদের জাহাজের রাঁধুনি নুন আর লেবুর রস ছড়িয়ে, সেই টাটকা গ্রিলড মাছ পরিবেশন করতে লাগল কৌতূহলী জনতাকে। মেছুয়া ছেলেটি চোখের পলকে মাছের কঙ্কাল জলে ফেলে দিয়ে, ন্যাতা বালতি এনে, ডেকের রক্ত সাফ করে, খাওয়া-দাওয়ায় মন দিল।
আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : হাকুনা মাটাটা

সূর্য ডুব

স্মৃতির রঙে রাঙা হয়ে রইল এক আশ্চর্য কমলা রঙের আকাশ
এইসব রোমহর্ষক ঘটনার ফাঁকে সূর্যদেব এক উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় কমলালেবুর রূপ ধরে পশ্চিম আকাশের দিক বরাবর জলে ডুব দিলেন। তার স্মৃতির রঙে রাঙা হয়ে রইল এক আশ্চর্য কমলা রঙের আকাশ আর তাকে আলগোছে ছুঁয়ে থাকা অতলান্তিক। নির্জন হয়ে আসা ইস্পাতের বালুকাবেলা সমুদ্রে ছলাৎছল আওয়াজ করে ঢেউ তুলে এগিয়ে চলেছে আরও দক্ষিণে। আকাশে ধীরে ধীরে একটি তারাকে হীরের মতো চমকাতে দেখলাম। মেরিন ট্রান্সপোর্টেশনের এক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করে জানলাম যে এটি হলো ভেনাস। তারাদের সব খবর এদের নখদর্পণে। কারণ যন্ত্রপাতি বিকল হলে, মাঝসমুদ্রে এই নক্ষত্রের সাহায্যেই দিকনির্ণয় করতে হতে পারে।

ভেনাস, তারাদের সব খবর এদের নখদর্পণে
দূরে কিউবার তটভূমিতে একাকি লাইটহাউস দ্বীপ জ্বেলে আমাদের পথ বাতলে দিচ্ছে। ট্রেড উইন্ড তার বাণিজ্যের পসরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উড়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। চারিদিকে কেবল সমুদ্রের শব্দ আর গন্ধ। মাথার ওপরে জ্বলজ্বল করছে একাকী ভেনাস। অন্ধকারে ডেকে বসে মনে হলো যেন এক আশ্চর্য নৈসর্গিক বনভোজনে আমন্ত্রিত অতিথি আমি।
‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন।
নয়ন আমার রূপের পুরে সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন।’
ক্রমশ…
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

