১০০ ছুঁল বনগাঁর প্রথম মেয়েদের স্কুল ‘কুমুদিনী বালিকা বিদ্যালয়’

ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য জন্ম হয় কুমুদিনী বিদ্যালয়ের

বিভূতিভূষণের দৌলতে মনে মনে আমরা সবাই ‘অপু’ হতে চেয়েছি। পথের দেবতা জীবনের বিচিত্র আনন্দের অদৃশ্য তিলক আমাদের কপালে এঁকে চলেছেন প্রায় প্রতি মুহূর্তেই। দিনরাত্রি, জন্ম-মৃত্যু,  মহামারী বা মন্বন্তর পেরিয়ে আমরা আদতে হেঁটেই চলছি। আর সেই চলার প্রতিটি বাঁকে 'জীবন' নামক এক আশ্চর্য অনুভব ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখায় ফেলে আসা পথ। করোনাকালীন এই সংকটময়  আবহেও উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ মহকুমার মানুষ বারেবারেই তাই ফিরে যাচ্ছেন পুরোনো দিনে।

বনগাঁ মহকুমায় মেয়েদের প্রথম স্কুল ছিল কুমুদিনী বালিকা বিদ্যালয়

একশো বছর আগের সময়, কাগজ কলমের নথিতে  বা কথা পরম্পরায় উঠে আসছে তাঁদের মুখে। আর এই স্মৃতিচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে যে নামটি রয়েছে, তা হল বনগ্রাম কুমুদিনী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই  স্কুলটির বয়স এবছরই একশো ছুঁল।

বনগাঁ মহকুমায় মেয়েদের প্রথম স্কুল ছিল এই কুমুদিনী বালিকা বিদ্যালয়। দেশে তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চেতনার স্বাধীনতা প্রাপ্তির আশায় বুঁদ হয়ে রয়েছেন একদল মানুষ। এমনই এক শিক্ষাব্রতী, জনদরদী মানুষ ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই বনগাঁর মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য প্রথম কুমুদিনী বিদ্যালয়ের জন্ম হয়৷ লোলিতমোহন তাঁর মা 'কুমুদিনী' দেবীর স্মৃতিতেই মেয়েদের জন্য এই স্কুল গড়ে তোলেন। লোকপ্রিয় জমিদার ব্যারিস্টার সীতানাথমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্যা স্ত্রী হিসেবে কুমুদিনীদেবী সেই পরাধীন ভারতবর্ষেই ব্রিটিশ বিরোধী নানা কাজে সমর্থন করতেন, কখনও প্রত্যক্ষ সাহায্যও করেছেন সেসব কাজে। স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য শিক্ষার ভিত শক্ত থাকা যে কতটা জরুরি, সে বিষয়ে সজাগ ছিলেন কুমুদিনীদেবী।  নানা কাজে সেই সময়ের মেয়েদের প্রেরণা ও শক্তির উৎস ছিলেন এই মানুষটি।

জনদরদী মানুষ ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই বনগাঁর মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য প্রথম এই স্কুলের জন্ম হয়

কুমুদিনীদেবীর সুযোগ্য সন্তান লোলিতমোহন বনগাঁ মহকুমায় প্রথম মেয়েদের জন্য তাই যখন স্কুল তৈরি করলেন, সেই স্কুল তিনি উৎসর্গ করলেন তাঁর মায়ের নামে। লোলিতমোহন সলতে পাকানোর কাজটি করলেও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন এলাকার কিছু শিক্ষা সচেতন মানুষ। পঞ্চাননবাবু, সত্যচরণবাবু, প্রবোধবাবু; স্কুলের পুরোনো নথিপত্রে তখনকার এমনই সব উদ্যমী নাম আজও উজ্জ্বল। যে সময় প্রান্তিক অঞ্চলের মেয়েরা তখনও গৌরিদান প্রথার শিকার ছিল, সেই সময়ে ঘরের মেয়েদের বাইরে এনে হাতে বই-খাতা তুলে দেওয়ার কাজটি মোটেই সহজ যে ছিল না, আমাদের ইতিহাস সে কথার প্রমাণ দেয়৷ এমনই সব প্রতিকূলতা মাথায় নিয়ে যে স্কুল পথ চলা শুরু করেছিল, বয়সের ভারে শতবছর পেরনোর ন্যুব্জতা আজও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি মোটেই।  স্কুলের ক্লাসঘর, বারান্দা কিংবা ছায়াঘেরা উঠোন জুড়ে আজও সে ছড়িয়ে রেখেছে বহু গৌরবময় সতেজ স্মৃতি। প্রথমে ইউ.পি স্কুল, তারপর মাইনর, তারপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় এম.ই জুনিয়র স্কুলের তকমা পেরিয়ে কুমুদিনী বিদ্যালয় ১৯৭৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছয়।  মাটির দেওয়াল আর খড়ের চালের দিন পেরিয়ে আজকের সুবিস্তৃত ঘরবাড়িতে পৌঁছাতে কুমুদিনীকে পেরোতে হয়েছে নানা চড়াই-উৎরাই। কখনও খুব কম পারিশ্রমিকে আবার কখনও শুধুমাত্র ভালোবাসার বিনিময়ে বহু শিক্ষাব্রতী মেয়েরা এই স্কুলে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। স্কুল সরকারি আওতায় আসার পরেও বহু ছাত্রী পুরোনো দিনের ‘গুরুগৃহে থেকে পড়াশোনা’ করার মতো সুযোগ তাদের দিদিমণিদের কাছে পেয়েছেন। শতবর্ষ ছোঁয়া কুমুদিনীর কুমুদরা ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জু্ড়ে, এমনকি বিদেশেও।  পড়াশোনার পাশাপাশি, খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কুমুদিনীর মেয়েরা আজও সমান উজ্জ্বল। কুমুদিনীর অনেক কৃতিরাই জীবনের মেধাতালিকাতেও নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চলেছে।

শতবর্ষ ছোঁয়া কুমুদিনীর কুমুদরা ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জু্ড়ে, এমনকি বিদেশেও

যেকোনো স্কুলের কাছেই একশো বছর উদযাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বহু পরিকল্পনা, পরিশ্রম জড়ো হচ্ছিল কুমুদিনীর শতবর্ষেও। কিন্তু বাধ সাধল কোভিড-১৯। পৃথিবীর এই অতিমারীর দিনে সব স্কুল যখন কার্যত বন্ধ, এমন অবস্থায় কুমুদিনী কর্তৃপক্ষও একশো বছর উদযাপনের বাহ্যিক আয়োজন স্থগিত রেখেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁদের অভিনব উদ্যোগ রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

অতি সম্প্রতি এই উদ্যোগ ৭৫ দিন পার করল

বর্তমানে সরকারিভাবে বহু স্কুলে যখন অনলাইন পড়াশোনাকেই মান্যতা দেওয়া হয়েছে, তখন অনলাইনে পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের শতবছর উদযাপনে স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রীদের স্মৃতিচারণার অনবদ্য আয়োজন করেছেন স্কুলের শিক্ষিকারা। সোম থেকে শনি প্রতিদিন সন্ধে সাতটায় স্কুলের প্রাক্তনীদের এই অনলাইন সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকা স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন বহু শিক্ষিকা, সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কুমুদিনীর ‘কুমুদ’রা। কখনও বনগাঁ, কখনও ব্যাঙ্গালোর, কখনও গ্লাসগো আবার কখনও ভিয়েতনামে থাকা কুমুদিনীর প্রাক্তনীরা এভাবেই এক সুতোয় বাঁধা পড়ছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও সহ শিক্ষিকাদের উদ্যোগে। শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ ছাড়াও বর্তমান সমাজ, ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের নানা দিক ছুঁয়ে থাকছে সেসব আলোচনা। প্রাথমিক পর্যায়ে খুবই ঘরোয়াভাবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়। অতি সম্প্রতি এই উদ্যোগ ৭৫ দিন পার করল। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে স্কুল শুরু হলেও স্কুলের নতুন-পুরোনো এই সেতুবন্ধন তাঁরা সারাবছরই চালিয়ে যাবেন। পৃথিবীর মারণ ভাইরাস যেখানে মানুষের থেকে মানুষকে পৃথক করে দিয়েছে শারীরিকভাবে, সেখানে একটি স্কুলের শতবর্ষ পালনের অনলাইন উদযাপনে মানসিকভাবে এই জুড়ে থাকার প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসিত। 

Developed by DXDasia