কলকাতায় প্রথম French Film Festival : ফরাসি এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের মেলবন্ধন

ফরাসি সিনেমার সঙ্গে উদযাপিত হলেন সত্যজিৎ, মৃণাল

ফ্রান্স ও বাংলার সম্পর্ক অনেকদিনের। সমাজ-সাহিত্যে তো বটেই সিনেমাতেও তার প্রভাব স্পষ্ট। ফরাসি সিনেমার বিচিত্র জীবনীশক্তি তাকে যুগ যুগ ধরে বিশ্বের পুরোধা বলে চিহ্নিত করে এসেছে। ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় মিলে যেদিন নিজেদের তৈরি প্রজেক্টরে তাঁদেরই তোলা দুটি তথ্যচিত্র দেখিয়ে প্যারিসের দর্শকদের চমকে দিয়েছিল, সেদিন শুধু ফ্রান্সের নয় সারা বিশ্বের চলচ্চিত্রে ছিল একটা ঐতিহাসিক দিন। লুই দেলুক থেকে লুই বুনুয়েল, জঁ ককতো থেকে জঁ রেনোয়া, আল্যাঁ রেনে, ফ্রঁসোয়া ত্রুফো, রোবের ব্রেঁসো… গোদার তো আছেনই; ফরাসি সিনেমা মানে প্রথম মহাবিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আভাঁ গার্দ (avant-garde movement) আন্দোলন, পঞ্চাশের দশকের সিনেমা ভেরিতে, নব্যতরঙ্গ বা ‘নিউ ওয়েভ’। যেসব আন্দোলনের ঢেউ এদেশেও ধাক্কা খেয়েছিল, বিশেষত কলকাতায়। আন্দোলিত হয়েছিলেন সত্যজিৎ, মৃণাল – আবিশ্বের কিংবদন্তি পরিচালকদের তালিকায় তাঁরাও অধিষ্ঠিত। ফ্রান্স ও ভারতের এই মেলবন্ধনেই সম্প্রতি কলকাতায় উদযাপিত হলো ‘ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসব’ (French Film Festival 2024)।

১৬ ফেব্রুয়ারি ‘নন্দন ১’ (Nandan)-এ অনুষ্ঠিত হয় ফরাসি ছবির উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (Inagration of the 1st French Film Festival)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অনিল কাপুর (Anil Kapoor), অনুরাগ কাশ্যপ (Anurag Kashyap), ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত (Rituparna Sengupta), শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় (Saswata Chatterjee), রিচা শর্মা সহ আরও অনেকে। চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি।

ফরাসি সিনেমা মানে প্রথম মহাবিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আভাঁ গার্দ (avant-garde movement) আন্দোলন, পঞ্চাশের দশকের সিনেমা ভেরিতে, নব্যতরঙ্গ বা ‘নিউ ওয়েভ’। যেসব আন্দোলনের ঢেউ এদেশেও ধাক্কা খেয়েছিল, বিশেষত কলকাতায়।

কলকাতায় এই ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান উদ্যোক্তা আলিয়ঁস ফ্রসেঁ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম সেন্টার। এই বছরই প্রথম কলকাতায় আয়োজিত হল এই চলচ্চিত্র উৎসব। ভারতীয় এবং ফরাসি সিনেমার মেলবন্ধন নিয়ে মঞ্চে স্বাগত ভাষণ রাখেন নিকোলাস ফ্যাসিনো।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথো'র সঙ্গে আলিয়ঁস ফ্রসেঁ দ্যু বেঙ্গল-এর বর্তমান ডিরেক্টর নিকোলাস ফ্যাসিনো ও অন্যান্যরা

 

প্রসঙ্গত, প্রথম বর্ষ ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসবে কোনও প্রতিযোগিতা ছিল না। ছিল না কোনও এন্ট্রি-ফি। মালয়ালম চলচ্চিত্র নির্মাতা কারুণের তৈরি ছবি ‘পিরাভি’, কান ফিল্ম ফেস্টিভেল এবং ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে। অনুরাগের ‘কেনেডি’ ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়। সেটির স্পেশাল স্ক্রিনিং হয়েছে এই চলচ্চিত্র উৎসবে। এছাড়াও যেসব বাংলা ছবি ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’-এ পুরষ্কৃত হয়েছে সেগুলিও দেখানো হয়েছে কলকাতায় আয়োজিত এই ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসবে। এই উৎসবে ফরাসি ছবির পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে বাংলা ছবি ‘পদাতিক’, ‘আগন্তুক’, ‘তাহাদের কথা’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘উত্তরণ’-এর মতো আইকনিক ছবিও। 

চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমা প্রদর্শন ছাড়াও ছিল সিনেমা সম্বন্ধীয় নানা মনোজ্ঞ আলোচনা। ২২ তারিখ প্রদর্শিত হয় সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি আগন্তুক। এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক চিন্ময় গুহ ও চলচ্চিত্রবেত্তা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। নন্দন ১, ২, ৩ প্রেক্ষাগৃহে ছাড়াও উৎসব শেষের আগের দিন সারা রাত পার্ক ম্যানসনে আয়োজিত হয়েছিল ফ্রেঞ্চ শর্ট মুভি নাইট ম্যারাথন। একনাগাড়ে ছবি প্রদর্শিত হয় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা অবধি। 

চলচ্চিত্র উৎসব দেখতে এসেছিল কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা

৮২-তে কান-এ জুরর/ জুরি মেম্বার ছিলেন মৃণাল, ‘খারিজ’ তৈরি হচ্ছে তখন, শুটিংয়ের কয়েকটা ছবি নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিলেন জিন মাসকোভিচ’কে। কান চলচ্চিত্র উৎসব, ১৯৮৩। জা ক দ্যুত্রঁক ‘খারিজ’-এর জন্য জুরি পুরস্কার তুলে দিয়েছেন মৃণাল সেনের হাতে। সাদা কালোয় পাতাজোড়া ছবি, কাইয়ে দ্যু সিনেমা-র মোটাসোটা ঝলমলে বই— কান সিনেমা/ আ ভিশুয়াল হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (১৯৩৯-২০১০), তার পাতা ওলটালেই বেরিয়ে পড়বে ছবিটা, তলায় মৃণাল সেনের পরিচিতি: বেঙ্গলি ইন্ডিয়ান ডিরেক্টর। এই বইয়ে আর কোনও ভারতীয় পরিচালকের ছবি নেই। কান-এর এমন কত স্মৃতি মৃণালের। 

২৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে চ্যাপলিন-কন্যা জেরাল্ডিন, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও অন্যান্য পরিচালকদের সঙ্গে মৃণাল সেন

কান চলচ্চিত্র উৎসবের মধ্যে দিয়েই সত্যজিৎ রায় হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বনন্দিত। তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’ (Pather Panchali) ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনীত হয় এবং সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পায়। গোটা বিশ্ব তারপর থেকে সত্যজিৎ রায়কে মাথায় করে রেখেছে। এরপর একাধিকবার কানে মনোনীত হয়েছে সত্যজিতের ছবি। ১৯৫৮ সালে ‘পরশ পাথর’ (Parash Pathar), ১৯৬২ সালে ‘দেবী’ (Devi), ১৯৮৪ সালে ‘ঘরে বাইরে’ (Ghare Baire), ১৯৮৯ সালে ‘গণশত্রু’ (Ganashatru) মনোনীত হয় প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ প্রদর্শনী বিভাগে। সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণের পর ১৯৯২ সালে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কানে দ্বিতীয়বার প্রদর্শিত হয় ‘পথের পাঁচালি’। কানের ক্লাসিক বিভাগে এরপর ২০০৫ সালে তৃতীয়বারের জন্য দেখানো হয় ‘পথের পাঁচালি’, এছাড়াও ২০১৩ সালে ‘চারুলতা’ (Charulata) দেখানো হয় ওই একই বিভাগে। ২০২২ সালে ৭৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ক্লাসিক বিভাগে। সেই সঙ্গে ভারতকে দেওয়া হয় ‘কান্ট্রি অফ অনার’ সম্মান।

১৯৮২-র কান চলচ্চিত্র উৎসবে জন বুর্ম্যান, বিলি ওয়াইল্ডার ও মাইকেলাঞ্জেলো আন্তোনিয়নি-র সঙ্গে সত্যজিৎ রায়

হিসেব অনুযায়ী বিগত ২৫ বছরে, ভারতে হাজার হাজার সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে এ পর্যন্ত কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত ছবির সংখ্যা হাতে গোনা। এর মধ্যে পুরস্কার জিতেছে ৭টি ছবি। মুরলি নায়ার (Marana Simhasanam, 1998), মনীশ ঝা (A Very Very Silent Film, 2002), রিতেশ বাত্রা (The Lunchbox, 2013), নীরজ ঘেওয়ান (Masaan, 2015), অস্মিতা গুহ নিয়োগী (Catdog, 2020), পায়েল কাপাডিয়া (A Night of Knowing Nothing, 2021) এবং শৌনক সেন (All That Breathes, 2022) -এঁরাই হলেন সেই ৭ বিজয়ী পরিচালক। এছাড়া সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ২০১৯ সালে কান-এর একটি বিশেষ কারিগরি পুরস্কার পেয়েছিলেন মধুরা পালিত। আর এই বছরই ৭৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের (76th Cannes Film Festival) প্রতিযোগিতা বিভাগে (লা সিনেফ) একমাত্র ভারতীয় ছবি হিসেবে মনোনীত হয় কলকাতার পরিচালক যুধাজিতের ‘নেহেমিচ’ (স্বল্প দৈর্ঘের ছবি)। ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয় কান-এর বুনুয়েল থিয়েটারে।

ফ্রান্সে নব্যতরঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে ছিলেন, বাংলা ভাষায় এদের কারো কারো সম্পর্কে বইও বেরিয়েছিল মূলত কলকাতার বাণীশিল্প প্রকাশন থেকে। এছাড়াও চিত্রবীক্ষণ, চিত্রভাষ, এফ ইত্যাদি বিভিন্ন চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা থেকেও অনেক আলোচনা পাওয়া যেত। অনেক সময় পাওয়া যেত কোনো চিত্রনাট্যের অনুবাদ। তার মাঝে ১৯৮২ সালে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে জাঁ লুক গোদারের রেট্রোস্পেকটিভ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল বলে জানা যায়। এসব নিয়েই ফরাসি নিউ ওয়েভ আর তার বাইরে রেনোয়াঁ, ব্রেসো, অ্যালা রেনে, অ্যাগনেস ভার্দা নামগুলি আমাদের পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। মৃণাল সেনের কিছু রাজনৈতিক ছবিতে তথাকথিত গোদার রীতির কিছু প্রয়োগও আমরা দেখেছিলাম (পরে অশোক বিশ্বনাথনের শূণ্য থেকে শুরু ছবিতেও এরকম প্রয়োগ অনেক ছিল)। তারপর একসময় চলচ্চিত্র দেখার সু্যোগ বাড়ল ইনটারনেটের কল্যাণে, কিন্তু চলচ্চিত্র সংক্রান্ত আলোচনার পরিসর ও প্রভাব গেল কমে। ফলে সাম্প্রতিক ফরাসি চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমরা খুব একটা কিছু জানি না। অথচ ‘টাইটান’, ‘অ্যানেট’, ‘মনোপলি অফ ভায়োলেন্স’ এগুলোর মতো সাম্প্রতিক ফরাসি চলচ্চিত্র সারা বিশ্বে চর্চিত হয়েছে। শুধু ইনটারনেট নয়, এখন বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও সেসব সুযোগ কিছুটা তৈরি হয়েছে। বিশেষত Mubi নামক প্ল্যাটফর্মটিতে। কলকাতায় শুরু হওয়া ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসব ভবিষ্যতে ভারত-ফরাসি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল-কে আরও প্রসারিত কিনা সেটাই এখন দ্রষ্টব্য।

Developed by DXDasia