‘শুধু একজন, যে কোনো কিছুতেই ভয় করে না, সে হলো ব্রেসঁ’, জঁ-লুক গোদার
"জার্মান সঙ্গীতে মোৎসার্ট যা, বা রুশ উপন্যাসে দস্তোয়েভস্কি, ফরাসি চলচ্চিত্রে ব্রেসঁ হলেন তাই।"
জঁ-লুক গোদার
শুধু গোদার নন, রোহমের, স্করসীজ, ফাসবিণ্ডার, তারকোভস্কির মতো প্রতিভারা তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তারকোভস্কি তো বলেই ফেলেছিলেন, ‘কোথায় রোজেলিনি, ককতো, রেনোয়া, ভিগো? কোথায় হারিয়ে গেল কবিতা? শুধু টাকা, টাকা আর ভয়—ফেলিনি ভীত, আন্তনিওনি ভীত। শুধু একজন, যে কোনো কিছুতেই ভয় করে না, সে হলো ব্রেসঁ!’।
রোবের ব্রেসঁ: বিশ্ব চলচ্চিত্রের মহীরুহ, ফরাসি সিনেমার নিঃসঙ্গ নক্ষত্র, প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রনির্মাতা। ১৯৪৩ সালে সিনেমা পরিচালনা শুরু করলেও সারা জীবনে ছবি করেছেন মাত্র তেরোটি। ব্রেসঁর কাছে চলচ্চিত্র বাস্তবতার পুনর্নির্মান নয়, বাস্তবকে সৃষ্টি করাও নয়, বরং চলমান ছবি ও শব্দের মধ্যে বিশেষ সাহায্যে ভাব-ব্যক্ত করার বাস্তব মাধ্যম, যে বাস্তবতা সিনেমাজগতে বিরল। সিনেমাটোগ্রাফি ও সিনেমার মধ্যে তিনি স্পষ্ট সীমারেখা টানেন। জে এফ ম্যর বলেছেন, 'সিনেমাটোগ্রাফি যদি ছবি ও শব্দের মধ্যে বিশেষ সম্পর্কই হয়, তাহলে ব্রেসঁ যে নিজেকে setter of scence (যেহেতু সেটা মঞ্চধর্মী), না বলে setter into order বলবেন সেটাই স্বাভাবিক।' তিনি বাস্তবতার বিশেষ কিছু অংশ বা দিক, বেছে নিয়ে তাদের একটা বিশেষ ক্রমে সাজিয়ে দেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফির সৌন্দর্য নির্ভর করে সুন্দর ছবির ওপর ততটা নয়, যতটা প্রতিটি ছবির সঙ্গে অন্য ছবিগুলোর প্রাসঙ্গিকতার ওপর।
আরও পড়ুন: হিম্মৎরামের পথ চলা আর পথ খোঁজার টানটান গল্প
এ ছাড়া যে প্রচলিত ধারণাকে ব্রেসঁ অস্বীকার করেছেন, তা হলো পেশাদারী অভিনেতার ব্যবহার। যে চরিত্রই হোক না কেন, ব্রেসঁ তাকে একধরনের একাত্মতা ও উত্তরাধিকার দেন। মানুষের অন্তর্জগৎ ও তার আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন ব্রেসঁ, কেননা ওই স্তরেই মানুষের বন্দি সত্তার যাবতীয় নাটক সংঘটিত হয়। আর রং? অধিকাংশ রংকেই ব্রেসঁ-র মনে হয়েছে, বড্ড বেশি বর্ণবহুল, খুব বেশি রূপসচেতন। ‘আ জেন্টেল ওম্যান’ ছবিতে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন দোমিনিক সোনদা-র ত্বকের রং থেকে। ছবিতে ব্যবহৃত অন্য রংগুলোকে তিনি ওঁর ত্বকের রং-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে চেয়েছিলেন। চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর ধারনা, প্রত্যেকের এমন ছবি আঁকা উচিত যা সুন্দর ছবি না হোক কিন্তু অবশ্যই যেন হয় অপরিহার্য ছবি। রং, শব্দ ও কাহিনির ওপর যদি বেশি জোর পড়ে তাহলে আসল জিনিসটাই তো হারিয়ে যাবে—বিষয়বস্তু আর চরিত্রগুলির ভেতরটা। ‘ছবিতে অভিনয়ের গুরুত্ব বিষয়ে ব্রেঁসর অভিমত ও অভিনেতাদের সম্পর্কে তাঁর মনোভাব অনেকটা বর্ণবিদ্বেষীর মতো’, একথাটিও বলেছেন গোদার।
ব্রেসঁ-কে নিয়ে,তাঁর ছবি নিয়ে অনেকে অনেক কথাই বলেছেন, কিন্তু ব্রেসঁ নিজের ব্যাপারে কি বলেছেন?
১৯৭০-এর শেষাশেষি, প্যারিসের এক বিকেলে, তরুণ আমেরিকান অধ্যাপক চার্লস থমাস স্যামুয়েলস কর্তৃক গৃহীত একটি সাক্ষাৎকারে ধরা পড়ে ব্রেসঁ-র চলচ্চিত্র-দর্শন, ছবির আঙ্গিক, নির্মাণকৌশল, চিত্রকলা , সাহিত্যবিষয়ক মতামত এবং ব্রেসঁ-র অভিযানপ্রিয়তা। স্যামুয়েল-এর নেওয়া সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ‘Samuels Encountering Directors’ বইতে। পরে এটি পুনঃপ্রকাশিত হয় ‘The Films of Robert Bresson: A Casebook’ বইতে। স্যামুয়েল এবং ব্রেসঁ-র কথকোপথন গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, বিরলও। এবার সেই দীর্ঘতম সাক্ষাৎকারটি অনূদিত হল বাংলা ভাষায়। অনূদিত বইটির নাম ‘সিনেমা প্রসঙ্গে’। অনুবাদ করেছেন কবি অরূপরতন ঘোষ। অরূপরতন মূলত কবিতা লেখেন। পাশাপাশি বেশ কিছু গল্প ও একটি উপন্যাসও লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন লুইস বুনুয়েল-এর আত্মজীবনী ‘শেষ দীর্ঘশ্বাস’ ও পল গগ্যাঁ-র তাহিতির জার্নাল ‘নোয়া নোয়া’। কবিতা ও চলচ্চিত্র মাধ্যমে বিশেষ অনুরক্ত তিনি। অরূপরতনের হাত ধরে ইতিমধ্যেই রোবের ব্রেসঁ ঢুকে পড়েছেন কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায়। লিটিল ম্যাগাজিন মেলা হয়ে তিনি পৌঁছে যাবেন আগামী কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলায় এবং থেকে যাবেন এই শহরে আর বাংলা ভাষায়।
সিনেমা প্রসঙ্গে | অরূপরতন ঘোষ | প্রকাশকঃ ভাষালিপি | প্রথম প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২০২০ | মুদ্রিত মূল্যঃ ১২৫ টাকা