হিম্মৎরামের পথ চলা আর পথ খোঁজার টানটান গল্প

এই গল্পের পটভূমির ইতিহাস খুব একটা জনশ্রুত নয়

ইতিহাসকে পাশে রেখে নদীর মতো তার চলন। যেন সমুদ্রেরই খোঁজে। বা বলা যায় মুক্তির খোঁজে। চিনের প্রাচীরের মতো দূর দেশের অনেক কথা হয়তো জানা হয়ে যায় ছোটোবেলাতেই, হয় না ইংরেজদের অনেক নীরব অত্যাচার। কিন্তু ইংরেজরা যে অতি সাধারণ লবণ থেকে শুরু করে ভারতীয়দের সব কিছুকেই নিজেদের আয়ত্তাধীন করে, দৈনন্দিন জীবন-যাপনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল, সেই খবর কীভাবে জানল ‘হিম্মৎরাম’? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অনিরুদ্ধ দেবের ‘হিম্মৎরাম’-কে চিনে নিতে হবে। আসলে এই উপন্যাস হল দেশ চেনার গল্প।  

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই হিম্মৎরাম ঝোপড়ি থেকে যখন বেরিয়ে এল, তখনও সূর্য ওঠেনি। হিম্মৎরাম দেখল, একটু দূরে ওর বাবা খেলাওৎরাম  দাঁতন করছেন। এরপর আমরা জানলাম হিম্মৎকে বাবার সঙ্গে যেতে হবে সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। খেলাওৎরামের মনের গোপন ইচ্ছে, যদি সাহেব খুশি হয়ে ছেলেটাকেও ‘কোম্পানির নোকরি’ দিয়ে দেয়। আর সাহেব তো যে সে সাহেব নয়। অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। লেখক বলে দেননি, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, ইনি সম্ভবত সেই হিউম, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। হিউমের নাম করে লেখক এখানে আমাদের বুঝিয়েও দিয়েছেন, ঘটনার সময়কাল উনিশ শতকের প্রায় শেষ দিক। সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসে হিম্মৎ দেখল ‘লালমুখো গোরা’ সৈন্যদের, দেখল পারমিট লাইনের ঝোপ। যে ঝোপ এই লেখায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে কথায় পরে আসা যাবে। বাবার কাছে হিম্মৎ শুনল, এই ঝোপ হল পাক্কা দু-মানুষ উঁচু, আর চার গজেরও বেশি চওড়া। শুনল আরও কত কী।

কিশোর হিম্মৎরামের কথায় আসা যাক। সে অতি সাধারণ পরিবারের ছেলে। মা মরে গেছে। বাবা খেলাওৎরাম আরেকজনকে বিয়ে করেছে হিম্মৎ-এর মা মরে যাওয়ার পর। খেলাওৎরাম ইংরেজ সাহেবের কর্মচারী। ইটাওয়াতে হিম্মৎ-এর বাবা গাছ লাগিয়ে বেড়া দেন। সে অনেক উঁচু প্রাচীর। হিম্মৎ সাহস করে বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘বাবা এত বড়ো ঝোপ কেন বানানো হল’? গাছের ঝোপ দেখে খুব অবাক হত সে। বাবা কিন্তু তাকে কারণ বলেননি। শুধু ঝোপ কত উঁচু সে কথাই বলেছিল। এই ঝোপের কথা লেখক অনিরুদ্ধ দেব এই উপন্যাসের পরে ফ্ল্যাশব্যাক নাম দিয়ে লিখেছেন, যা বড়োই মূল্যবান তথ্য। সংক্ষেপে হল ১৮০৩ সাল থেকে ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ভারতকে ভাগ করেছিল এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে। এক বিশাল উঁচু ঝোপ তারা তৈরি করে যাতে পশ্চিম থেকে পুবে নুন চলাচলে বাধা দেওয়া যায়।

আবার হিম্মৎ-এর কথায় আসি। হিম্মৎ অনেক পরে বুঝেছে এই বেড়া হল সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে লবণকে আটকে রাখার বেড়া। যখন বাড়িতে খেতে বসত তখন নানা কথায় জানত কেন এই বেড়া, কীভাবে এই বেড়া দেওয়া হয়, কারা নুন চুরি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কখনই স্পষ্ট করে জানা ছিল না সাহেবদের এই এত সাবধানে নুন আগলে রাখার কারণ। হিম্মৎ বাবাকে প্রশ্ন করেও এর উত্তর পায়নি, তবে বারংবারই শুনত সাহেব খুব ভালো। বেড়ার কাজে বাবার সঙ্গে গিয়েছিল হিম্মৎ। সে রাত ছিল বেশ ভয়ানক। বাবাকে হারাল সে। বর্গীর আক্রমণ বা সাধারণ মানুষের রোষে সব হারাল হিম্মৎ। পরিবার থেকে দূরে সরে গেল। মা-কে আগেই পাঠানো হয়েছে অন্য জায়গায়। হিম্মৎ বাবার মুখে শুনত অ্যালান অকটেভিয়ান হিউম সাহেবের কথা। যিনি নাকি খুব দিলদার মানুষ। হ্যাঁ, তার জন্যয়ই হিম্মৎ স্কুলে পড়তে পারল, মিশ্রজির বাড়িতে খেতে পেল, দীপার সঙ্গে দেখা হল।

শুরু হল হিম্মৎ-এর জীবনের পথ চলা। বলে রাখা দরকার লবণ আন্দোলন, যা ১৯৩০ সালে গান্ধীজির নেতৃত্বে হয়েছিল, সে কথা অনেকেরই অনেকবারই শোনা হলেও হিম্মৎরামের চলার পথ ধরে প্রথম জানা গেল ইণ্ডিয়ান ‘হেজ’ (ঝোপ)-এর কথা। অনেকের নিশ্চয়ই জানা ইতিহাসের এই কথা, তবে মনে হয় ইতিহাসের এই কাহিনি বহুশ্রুত নয়। অনেকেরই অজানা। লেখকও সে কথা বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস কোনো শিক্ষক হয়েতো ক্লাসে বলেছেন, তবু্‌ও এই বিষয়টি পাঠ্যে বিশেষভাবে শোনা যায়নি’। এই উপন্যাসটিতে লেখক সেই কথা সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। এই কাহিনি আমাদের নিয়ে চলল ইতিহাসকে পাশে রেখে অজানা একপথে। চলতে চলতে হিম্মৎ যেমন খুঁজে পেল অনেক কিছু, পাঠকও নতুন করে জানাল অনেক তথ্য। মনে হয়, আজকের কিশোরদের এই খবর, এই ইতিহাস জানা প্রয়োজন।

এই বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, হিম্মৎরাম নামে এক কিশোরের পথ চলা, পথ খোঁজার গল্প। টানটান গল্প। এক আসনে বসে শেষ করা যায়, এমনই।

সাধারণভাবে এই গল্পের পটভূমির ইতিহাস খুব জনশ্রুত নয় এই কথা বলা হয়েছে আগেই। তবে অতি সাধারণ মানুষের জীবনে কত ধরনের  অবহেলা, অসম্মান জুটত তা আরও স্পষ্ট হল পড়তে পড়তে। হিম্মৎ-এর চলার পথ ধরে গেলে পাঠক কখনও ভারতবর্ষের সমাজের সংকীর্ণতা, কখনও অভাব, কখনও ইংরেজদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ের কিছু মুহূর্তকে চিনে নিল। আর হিম্মৎরাম! সে তো চলল এই ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়েই।তাই হিম্মৎএর চলার পথে লেখক বর্গী, ইংরেজ শাসন, নুন সংগ্রহের সমস্যা, ইংরেজ শাসনের ভালো-মন্দের সঙ্গে কল্পনাকে মিশিয়ে সেই সময়ের অতি সাধারণ মানুষের দিন যাপনের কথা বলে গেলেন। যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই।

হিম্মৎরামেরও নাম নেই ইতিহাসে, কারণ সে কোনো স্বদেশি আন্দোলন করেনি, করেনি কোনো সংগ্রাম। সে একজন ‘আম আদমি’। এই গল্পের স্রোতে মৃত্যু আছে কিন্তু বীভৎসতা নেই, লড়াই আছে নৃশংসতা নেই, জাতপাত নিয়ে ভেদাভেদ আছে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা নেই। এই উপন্যাসটি তিন খণ্ডে বিভক্ত  ইতিহাসের প্রেক্ষাপটকে রেখেই এগিয়েছে। ভালোসাহেব-মন্দসাহেব কথা এসেছে। এসেছে মোসাহেবদের কথা, এসেছে ইংরেজদের স্কুল গড়ে তোলার কথা– এ যেন সময়ের দলিল। তিনটি খণ্ডে ভাগ করা, কিন্তু খণ্ড না বলে হিম্মৎরামের পথ চলার পর্বও বলা যেতে পারে।

প্রথম খণ্ড কিশোর হিম্মৎতের কষ্টের পর্ব। এরপর শুরু হল হিম্মৎরামে অন্য যাত্রাপথ। নিজেকে জানা, নিজেকে চেনার যাত্রা। প্রথম খণ্ডে দীপার সঙ্গে সখ্যতা হয় হিম্মৎরামের মিশ্রজির বাড়িতে। এইবাড়িতে দীপা ছাড়া কেউ তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। তাই হয়েতো দীপাকে পাঠকেরও ভালোলাগে। দীপার বিয়ে হয়ে যায়। কিশোর হিম্মৎ-এর মনখারাপ হয়, কিন্তু দীপা ছাড়াই গল্প এগিয়ে চলে। হিম্মৎ কিন্তু কাউকে নিয়ে বেশি ভাবে না, একবার দীপার কথা মনে করলেও সে এগিয়ে চলে। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তার চলা নয়, সময় যেন তাকে নিয়ে চলছে।

হিম্মৎকে ভালো লাগছে, ভালোবাসছে পাঠক। দ্বিতীয়পর্বে হিম্মৎ যেন পৃথিবীকে চিনছে, জানছে। এই খণ্ডে তার দেখা হচ্ছে কিঙ্করদা, দুলালদার সঙ্গে। এদের সঙ্গে থেকে হিম্মৎ অন্য জগতকে চিনছে। মহাপৃথিবীর পথে এসে পৌঁছাচ্ছে সে। ভক্ত মানুষ, সাধু মানুষের দেখা মিলছে। এইখানে এসে অজান্তেই হিম্মৎ জানল ‘যে মানব আমি সেই মানব তুমি’ এই সত্য। 

লেখক সব কিছুই সহজ ভাষায় নিয়ে এলেন গল্পে।যদিও লেখক অনিরুদ্ধ দেব পেশায় মনের ডাক্তার, তবে এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে কিশোরদের ভালোবাসার আবেগ। মনে হয় লেখক কিশোর মনের কথা ভেবে শব্দের প্রতি বেশি যত্নশীল।

হিম্মৎ কিন্তু কোনো বীরের প্রতীক হয়ে পাঠকের সামনে আসছে না, একজন অতি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি ছাড়া সে কিছুই নয়। তবু এই বইটি পড়তে হবে কিশোরদের। এই গল্প যেন ঢোঁড়াই চরিতে পৌঁছানোর পথ দেখাল। তৃতীয় খণ্ড শুরু হল হিমৎ-এর আরও এক অন্য মাত্রা নিয়ে। কী হল ? জানতে হলে পড়তে হবে।

হিম্মৎরামঃ অনিরুদ্ধ দেব। প্রকাশক – অনুষা। 
দাম—১৫০/-।
 
 

Developed by DXDasia