
তথ্যচিত্রে ’৬৯-এর কলকাতাকে দেখিয়েছিলেন ফরাসি পরিচালক
“আমি কলকাতার মানুষ। আমি কলকাতার মিছিলে শামিল হয়েছি বারবার। মিছিলে আওয়াজ তুলেছি। হাজার লক্ষ গলার সঙ্গে গলা মিলিয়েছি। প্রতিবাদ করেছি। লড়াকু কলকাতার আগুনে আমিও উত্তপ্ত হয়েছি। প্রেসিডেন্সি, আলিপুর আর দমদম সেন্ট্রাল জেল গিজগিজ করছে প্রতিবাদী মানুষের ভিড়ে। বেহিসেবি গুলি আর লাঠি চলছে ভেতরে, বাইরে। এলোপাথাড়ি গুলি, বেপরোয়া লাঠি। আর ওই অসহ্য পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসছে কলকাতার মানুষ, গ্রামের কৃষক, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক। এগিয়ে আসছে মেয়ে, পুরুষ, ছেলে, বুড়ো—সবাই। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর সন্ত্রাসের সংঘর্ষ। …আমরা কয়েকজন বন্ধু ও আমি তখন ছবির রাজ্যে ঢোকবার আপ্রাণ চেষ্টা করছি।” ‘চলচ্চিত্রের ভূত-বর্তমান-ভবিষৎ’ বইতে লিখেছেন মৃণাল সেন।
এখানে মৃণালের উদ্ধৃতি জুড়ে বসার কারণ, কলকাতাকে তিনি যে দৃষ্টিকোন থেকে দেখেছিলেন, ১৯৬৮ সালে ফরাসি পরিচালক লুই মাল কলকাতা-কে নিয়ে ঠিক সেভাবেই ভাষা বুনেছিলেন তাঁর তথ্যচিত্রে। সেই তথ্যচিত্রের একটি বড়ো অংশে তিনি ধরেছিলেন একটা শহরের ভাঙা-গড়ার খেলা। দেখিয়েছিলেন, কুমোরটুলিতে কীভাবে সরস্বতী প্রতিমা গড়া হচ্ছে এবং কীভাবে বহু যত্নে বানানো একটি শিল্পকর্মকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মাস দুয়েকের জন্য ভারতে এসেছিলেন লুই। তার মধ্যেই চেষ্টা করেছিলেন কলকাতাকে রেকর্ড করতে। তখন তিনি ৩৫-এর তরুণ। ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত। ২৩ বছর বয়সেই কানের পাম ডি’ওর পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। একজন ক্যামেরাম্যান আর সাউন্ড রেকর্ডিস্ট জুটিয়ে নেমে পড়েছিলেন কাজে। বানিয়ে ফেলেন ৯৯ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘ক্যালকাটা ৬৯’।
হাওড়া-শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে গড়ে উঠছে তাঁবু, বসতি। এই শহরকে কেন্দ্র করেই জন্ম নিচ্ছিল অভুক্ত, ঠাঁইহীন মানুষের বাঁচার স্বপ্ন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে এত আয়োজন শুধুমাত্র জলে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য, অবাক হলেন ফরাসি পরিচালক।
যে সময় তিনি শহরের বুকে দাঁড়িয়ে এহেন একটি ধর্মীয় রীতি পরিদর্শন করছিলেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতটাই বিচলিত করে তুলেছিল এই ফরাসি পরিচালককে। তিনি আশেপাশে যা যা দেখছিলেন, সবটাই ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। তিনি দেখছিলেন কলকাতায় কীভাবে মানুষ দারিদ্রতার সঙ্গে, দুর্দশার সঙ্গে যুঝঝে। সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, ভাষাভাষীর মানুষ সেখানে ভিড় জমিয়েছে খাদ্য-অন্ন-বাসস্থানের জন্য। মাদার টেরেসার ‘নির্মল হৃদয়’, ‘শিশু ভবন’, ‘প্রেমদান’, ‘দয়াদান’, কুষ্ঠরোগীর আশ্রমে থিক থিক করছে আর্ত মুখ। বিন্যাস-বৈভবের ভেতর সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীর লোককে দেখা যায়।

নকশাল আন্দোলন তখন সক্রিয়। কলকাতায় তখন এমন সব মানুষের ভিড়, যারা কঠিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে পারে, ক্ষিদে ছাড়া আর কিছুতে তাদের ভয় নেই। চালের চোরাচালানকারীর জীবিকার মধ্য দিয়েই যেন তারা সামাজিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে, চ্যালেঞ্জ জানায়। কলকাতার শরীরে তখনও বঙ্গভঙ্গের ক্ষত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত, স্বাধীনতা পাওয়ার ক্ষত। যে ক্ষত কয়েক বছরের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়বে কন্ট্রোল রেশনিং, কালোবাজার দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত বীভৎস হত্যাকাণ্ড, বঙ্গবিভাগজনিত লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু, স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রকল্পজনিত বিপুল মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবদলের সামগ্রিক প্রতিক্রিয়ায় মাধ্যমে। কলকাতার নাগরিক জীবন ধীরে ধীতে গতি পাচ্ছে। কীভাবে কারখানা, বাজার-ব্যবসা, সংবাদপত্রের অফিস, রেসকোর্স, মানবিক-সামাজিক অবনমন আরও নানাকিছু গতিশীল হয়ে উঠছে। সেই কলকাতা হল ‘কাগজ’ ও ‘ফাইলের’ শহর, অফিসার ও কেরানীর শহর, সাংবাদিক ও উকিল-মোক্তারের শহর, বিদ্যাবুদ্ধিজীবীর শহর—যাঁরা নিজেরা উৎপাদন করেন না শুধু, চাষী-মজুরের উৎপাদন সুনির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে গলাধঃকরণ করে জীবন্ধারণ করেন। কাগজের কারখানা থেকে উৎপন্ন হাজার হাজার টন কাগজ ‘কনজিউম’ করে সমাজে ‘সার্ভিস’ দেন। হাওড়া-শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে গড়ে উঠছে তাঁবু, বসতি। এই শহরকে কেন্দ্র করেই জন্ম নিচ্ছিল অভুক্ত, ঠাঁইহীন মানুষের বাঁচার স্বপ্ন। কমিউনস্ট পার্টির উত্থান।


কলকাতার মিছিলে ক্যামেরা হাতে লুই ম্যালে
এসবের মধ্যেই লুই দেখিয়েছিলেন কলকাতার আর একটি জগৎ। এই চরম হতাশা, দুর্দশার ভিতরেও এই শহরের আকাশ নীল ছিল, ভালোবাসা ছিল, চা-সিগারেট-শিল্প-আন্দোলন-আড্ডা ছিল। লুই দেখালেন ৬৯-এর কলকাতার কুমোরটুলি ও সরস্বতী পুজো। মৃৎশিল্পীরা কী অসীম মমতায় একের পর এক ছোটো-বড়ো প্রতিমা গড়ে চলেছেন। কলকাতায় অনন্য এক শিল্পভাষা খুঁজে পেলেন তিনি। কিন্তু, ভালোলাগার এই ঘোর তাঁর কাটলো যখন তিনি দেখলেন, এতদিন ধরে তিল তিল করে বানানো একটি শিল্পকর্ম ঘিরে উদ্দাম আনন্দ-মোচ্ছবের পর তা মহানন্দে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হল। মন ভেঙে গেল ফরাসি পরিচালকের। তথ্যচিত্রে তিনি বললেন, এত খরচ করে মূর্তি বানানো থেকে শুরু করে ধুমধাম করে পুজো, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অগুন্তি মানুষের কায়িক শ্রম, শিল্প বোধ। তা এত সহজে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় কীভাবে? এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে এত অপচয় কেন?


লুই তাঁর তথ্যচিত্রে যা বলেছেন বা দেখিয়েছেন তা আসলে কবিতা, ট্র্যাজেডি। উপভোগ্য অধরা মাধুরী। আসলে, কিছুই সেভাবে পালটায় না। ধর্মীয় পুজো-অর্চনা আগেও সবকিছু ভুলে থাকার উৎসব ছিল এখনও তাই আছে। এর ভালো-খারাপ দুটো দিকই রয়েছে। তাছাড়া এ-দেশের যে শহরটা শুনে থাকি, বারুদে ঠাসা—তার নাম তো কলকাতা। কলকাতা বেপরোয়া, কলকাতা মারমুখী। সেই কবে থেকে অশান্তির ভিতর সংরক্ষিত বুদ্ধের সাময়িক শান্তি এখনও খুঁজে নিতে হয় এই শহরে।
বাংলায় সরস্বতী একটি নদীর নাম। এবং নদীই সভ্যতা ও জ্ঞানের জলরেখা! নদীই জৈব অনুভূতি! সরস্বতী বাগদেবী। তিনি কন্ঠের ধ্বনি। তিনি উচ্চারণ। শব্দ-বাক্য-বিরামচিহ্ন শেষে তিনিই সঙ্গীত, বাক্যের প্রয়োজন ফুরায় যেখানে। কিম্বা কবিতা যেমন, বস্তুত শিল্পের, ভাষার সর্বোচ্চ প্রকাশ, সেই কাব্যের দেবী সরস্বতী। কবিতার বহতা। চলন। নন্দন। এখানে সরস্বতী লৌকিক! কেননা নদীর নাম ছিল সরস্বতী! যা গড়ে তুলেছিল লোকসভ্যতা! বাণিজ্যের বিনিময় বহতা ছিল সেই পানিপথে! ছিল বজরা, ছিল গান, ছিল চাঁদ ও সূর্যের নীচে উদ্ভিদের ছায়ায় সংসার, ভালোবাসাবাসি, প্রেম ও মাতৃভাষা! যে ভাষা আজো আছে, আছে প্রেম ও প্রকৃতির মহাজ্ঞান অধ্যয়ণের লৌকিক আকুতি!
