কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওর আবিষ্কারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন এই লড়াকু বাঙালি

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি নিজের বক্তব্য প্রচার করে আসছেন

পৃথিবী এক মৃত নক্ষত্র। সূর্য পৃথিবীর গ্রহ, তাই পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। চাঁদও পৃথিবীর গ্রহ। বুধ, শুক্র সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এরা সূর্যের উপগ্রহ। পৃথিবীর আহ্নিক গতি আছে, তাই দিন-রাত হয়, কিন্তু  বার্ষিক গতি নেই। পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ঘুরছে বলেই ঋতু পরিবর্তন হয়ে থাকে।

এই কথাগুলি যিনি প্রচার করেন, সত্য বলে দাবি করেন, তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন, নাসা কিংবা ইসরোর কোনো বিজ্ঞানীও নন, নেহাতই এক সাধারণ মানুষ। নাম কার্তিকচন্দ্র পাল। লোকে কেসি পাল বলেই তাঁকে চেনে। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি অক্লান্তভাবে নিজের তত্ত্ব প্রচার করে চলেছেন। হাওড়া স্টেশনে কিংবা ডালহৌসি স্কোয়ার, কলকাতা বইমেলা –  যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, নিজের হাতে ছবি এঁকেছেন, পোস্টার সাঁটিয়েছেন, লিখে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, সৌরজগৎ নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা ভুল। চলন্ত বাসেও প্রচার চালিয়ে গেছেন। যেন রেনেসাঁস যুগের কোনো বিজ্ঞানী, যিনি রাজা কিংবা পোপের ভয়ে কুঁকড়ে যাননি, নিজের বক্তব্য প্রচার করে গেছেন। তবে, পার্থক্য এই, রেনেসাঁস যুগের বিজ্ঞানীরা যা প্রমাণ করেছেন, তার উল্টো কথাই বলেন কেসি পাল। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওর তত্ত্ব ফুৎকারে উড়িয়ে দেন।

কেসি পাল জন্মেছিলেন হাওড়ার আনুলিয়া গ্রামে। দারিদ্রের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর প্রথাগত শিক্ষা আর চালিয়ে যেতে পারেননি। কলকাতায় এসে ছোটোখাটো কাজ করতেন। তারপর ১৯৬২ সালে যোগ দিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। ডিউটি করতে করতেই তাঁর মনে সৌরজগৎ নিয়ে নানান প্রশ্ন উঁকি দিত। নিজের মতো করে সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন। মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে নানান বই পড়েও ফেলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। নিজের খরচেই তিনি সেই মতবাদ প্রচার করা শুরু করেন। এতে সেনাবাহিনীর থেকে আপত্তি আসে। কাজ হারান তিনি।

তাতে অবশ্য ভ্রুক্ষেপ করেননি কেসি পাল। অনাহারে অর্ধাহারে থেকেই নিজের বক্তব্য প্রচার করেছেন। তারপর ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে আরেকটি কাজ জোটে। কাজে ফাঁকেই চলতে থাকে প্রচার। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা, ইংল্যান্ডের রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে চিঠি পাঠিয়েছেন। ব্যাখ্যা করেছেন, কেন তিনি বিশ্বাস করেন যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি তাঁর বক্তব্যকে খারিজ করে জানিয়েছে, এতদিন বিজ্ঞানীরা যা বলে আসছেন, সেটাই ঠিক। তবুও হার মানেননি কেসি পাল।

এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। প্রৌঢ় মানুষটির শরীরে মনে এখনো যৌবনের উদ্যম। এখনো নিজের খরচাতেই বই ছাপিয়ে বিক্রি করেন, কখনো বা বিলি করেন, ঘুরে বেড়ান মহানগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেই দেখা মিলেছিল তাঁর। নন্দন চত্বরে কথা বলছিলাম তাঁর সঙ্গে। জানালেন, তিনি খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, কেউ তাঁর মতবাদ ভুল প্রমাণ করে দেখাক। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ কেউ গ্রহণ করেনি। বরং তাঁকে বহু লোক অপদস্থ করেছে, হেনস্থা করেছে। বাড়িতে এমনি গঞ্জনার মুখোমুখি হয়েছেন যে বাড়ি ছেড়ে এক সময়ে ফুটপাতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ফুটপাতে ঝুপড়ি বানিয়ে থেকে প্রবল উৎসাহে নিজের তত্ত্ব প্রচার করে গেছেন। এখন অবশ্য হাওড়ায় শীতলাতলায় নিজের বাড়িতেই থাকেন তিনি।

কেসি পালের জীবনকাহিনি নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন অরিজিৎ বিশ্বাস। ছবির নাম ‘সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে’। অভিনয় করেছেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, অঞ্জন দত্ত, পরান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরো অনেকে। শীঘ্রই মুক্তি পাবে ছবিটি। এই সিনেমা নিয়ে কেসি পালকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, “দেখে আসুন ছবিটি। মন্দ লাগবে না”।

Developed by DXDasia