কেমন আছেন রূপান্তরকামীরা? এই প্রশ্ন নিয়েই আমেরিকা পাড়ি দিলেন সুমি দাস

তথ্যচিত্র ‘অল্প জানা গল্পগুলো’ দেখানো হবে আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে

কোচবিহার নিবাসী অরিন্দম দাস, সুমি হিসেবেই পরিচিত। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে প্রান্তিক লিঙ্গ এবং দলিত রূপান্তরকামী মানুষের অধিকার এবং জীবিকা নিয়ে কাজ করছেন। এই মুহূর্তে মৈত্রী সংযোগ সোসাইটি নামক একটি এনজিও’র প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন। স্টেশনে রাত কাটানো, যৌন পেশায় যুক্ত হওয়া থেকে এনজিও তৈরি করা- তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথের কথা কমবেশি অনেকেই জানেন।

৩৭৭ বিল পাস হবার পরেও সমাজের একপ্রকার অন্ধকারেই রয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা। সোচ্চার হলেও সমাজব্যবস্থা যেকোনোরকমভাবে তাঁদের কণ্ঠরোধ করতে মরিয়া হয়ে আছেন। রূপান্তরকামীদের নিজেদের কথা, তাঁদের জীবনদর্শন-বেঁচে থাকার কথা বাংলার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। ঠিক এই অবস্থায় রূপান্তরকামী সুমি দাস (অরিন্দম) পৌঁছে গেছেন সুদূর আমেরিকা। জার্মানি হয়ে তাঁর আমেরিকা যাত্রা এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। সেখানে তিনি তাঁর নিজের কথা বলবেন, বলবেন বিশ্বে তৃতীয় লিঙ্গ মানুষের অবস্থানের কথা। কেন এখনও তাঁদের ‘প্রান্তিক’ বলে চিহ্নিত করতে হয়, সেই কথা। যে কথা গলায় বিষের কাঁটার মতো বিঁধে আছে, সেই কথা আজ আর বাংলা বা ভারতে সীমাবদ্ধ না রেখে দুনিয়ার দরবারে উপস্থাপিত করবার সময় এসেছে। 

এই প্রসঙ্গে সুমি দাস আমাদের জানাচ্ছেন, “সকল বাঙালি মানুষের আমেরিকা যাওয়া এবং একজন বাঙালি ট্রান্সজেন্ডার যৌনকর্মীর আমেরিকা যাওয়া সমান নয়। আমি একটা সময় জলপাইগুড়ি স্টেশনে রাত কাটিয়ে ৫০ টাকায় দেহ-ব্যবসা করেছি। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ সে আর পাঁচটা মানুষের মতো নয়। ছেলে হয়েও আমার আচরণ মেয়েদের মতো শুধুমাত্র সেই অপরাধে। আজ সেই অপরাধী মানুষটি দ্বিতীয়বার আমেরিকা যাচ্ছি আমার কথা বলতে, আমার মতো আরও অনেক মানুষের কথা বলতে।”


এবার সুমির আমেরিকা যাওয়ার কারণ, কোচবিহার তথা উত্তরবঙ্গের ট্রান্স, কোতি কমিউনিটির জীবনযাত্রা, তাঁদের গ্রামে বেড়ে ওঠা, আর্থিক অবস্থা সবকিছু নিয়েই আলোচনা হবে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। কীভাবে এখনও সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করছেন, সে নিয়ে বিশদে আলোচনা হবে। এমনকি এই জার্নি নিয়েই নির্মিত মৈত্রীসংযোগ সোসাইটির  গবেষণাধর্মী তথ্যচিত্র ‘অল্প জানা গল্পগুলো’ দেখানো হবে আমেরিকার শিকাগো শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তথ্যচিত্র প্রদর্শনের পর সুমি দাস বলবেন, কেমন আছেন তাঁরা! সত্যিই কতটা ভালো আছেন আজকের ফ্যাসিস্ট সময়ে দাঁড়িয়ে। সুমি আরও বলছেন, “এই পুরো ছবির কাজ আমাদের টিমের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি করা। সুদর্শনা, নীলাঞ্জন এবং বাকি সবাই এই কাজের সঙ্গে জড়িত আমরা রাত-দিন না ঘুমিয়ে এই ছবির জন্য কাজ করেছি। ভারতের নানা জায়গায় দেখানোর পর আমরা মার্কিন মুলুকে এই কাজ নিয়ে যেতে পারছি বলে ভালো লাগছে। আমি চাই এই কাজ সবাই দেখুক। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে যাক।”

কিছু মাস আগে বঙ্গদর্শনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে কেন ‘তৃতীয়’ লিঙ্গ এবং তৃতীয় লিঙ্গ মানেই কেন প্রান্তিক প্রশ্নের উত্তরে সুমি জানিয়েছিলেন, “আমি লিঙ্গ বিভাজনে বিশ্বাসী নই। মানুষকে মানুষ হিসাবে বোঝার চেষ্টা করাই ভালো। একটা মেয়ের হাতে যখন ক্ষমতা এসে যায়, তখন সে ওই পুরুষতন্ত্রেরই প্রতিনিধিত্ব করে। যারা টম বয়, তারা কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সেভাবে অত্যাচারিত হয় না। কিন্তু একটা ছেলে যখন নিজেকে মেয়ে ভাবছে, তাকে কোথাও কাজে নেওয়া হচ্ছে না। সমাজে তো মেয়েদের এখনও নিচু চোখে দেখা হয়। আর ‘মেয়েদের মতো’ হলে আরও নিচু। আমি তাই লিঙ্গ বিভাজনে বিশ্বাস করি না। আমার মতে মানুষ দুইরকম- ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষ।

তৃতীয় লিঙ্গ মানেই প্রান্তিক নয়। অনেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এবার দেখতে হবে তাঁরা কোন শ্রেণি থেকে উঠে আসছেন। প্রত্যন্ত গ্রামের দলিত পরিবারের কোনো রূপান্তরকামী এখন সাংঘাতিক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এমন উদাহরণ খুব কমই আছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল সবাই। এখানেও কিন্তু শ্রেণি বিভাজন, জাত-পাত এ সবকিছুই এসে যায়। যারা লুঙ্গি পরে থাকেন, তাঁরাও তো এলজিবিটি আন্দোলনের অংশ। কিন্তু তাঁদের কথা তেমন শুনতে পাওয়া যায় না। এখানেও সেই পুঁথিগত শিক্ষাটাই বড়ো হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজের প্রতিটা স্তরে যেমন শ্রেণি বিভাজন আছে, কমিউনিটির মধ্যেও তাই। যাঁরা ক্ষমতা পাচ্ছেন, তাঁরা আর বাকিদের ফিরে দেখছেন না। তৃতীয় লিঙ্গ প্রান্তিক, কিন্তু প্রত্যেকে নয়।”

Developed by DXDasia