আলোর উৎসবে ভাসছে বারাসাত

বারাসাতের কালীপুজো শুরু হয় আজ থেকে ৬২ বছর আগে। দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস…

কলকাতার দুর্গাপুজোয় আপনি যে মণ্ডপগুলি প্রচণ্ড ভিড়ে দেখতে পাননি, তার জন্য নিশ্চয় আপনার খুব মনখারাপ হয়! সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেগুলো দেখে নেওয়ার একটা উপায় আছে। এই কালীপুজোয় চলে যান উত্তর চব্বিশ পরগণার সদর শহর বারাসাতে। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত বারাসাতের কালীপুজো। মণ্ডপ এবং প্রতিমা দেখতে ভিড় জমান সারা রাজ্যবাসী। এখানকার আলোর উৎসবে কলকাতা থেকে আসে মণ্ডপ, চন্দননগর থেকে আসে আলোকসজ্জা। 

বারাসাতের কালীপুজো শুরু হয় আজ থেকে ৬২ বছর আগে। রেললাইনের একদিক ঘটিদের, আরেকদিক অর্থাৎ পশ্চিমদিক হল বাঙালদের। এই বাঙালরাই বারাসাতে প্রথম কালীপুজো শুরু করেন। কয়েকজন তরুণ ছেলে এখানে প্রথম কালীপুজো করে হেলাবটতলা মোড়ে ৬২ বছর আগে। কালো রঙের কালী একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে এনে শুরু হয় পুজো। হাইওয়েতে যেসব ড্রাইভাররা লড়ি নিয়ে যেত, তারাই কালীপুজো উপলক্ষে টাকা দিত। এছাড়াও বারাসাতে প্রচুর ইটভাটা ছিল, তাঁরাও সাহায্য করতেন। 

পাঁচের দশকের শুরুতে ক্লাব বলে আলাদাভাবে কিছু ছিল না। শ্যামাপুজো কমিটি করে কতগুলো পুজো হত। পুজো শেষ হয়ে গেলে কমিটিগুলোরও কোনো অস্তিত্ব থাকত না। নকশাল আন্দোলনের পরবর্তীকালে রাজনীতি যখন উত্তাল, শাসকদলের প্রধানরা যুক্ত হয়ে পড়লেন এক একটি ক্লাবে। ক্লাবের ধারণা সেই তখন থেকেই জন্মালো। শুরু হল প্রতিযোগিতা। একটাসময় যে পুজোর সঙ্গে ছিল ভক্তি বা ধর্মের যোগ, তাই-ই পরবর্তীকালে উৎসবের আকার ধারণ করল। 

ধীরে ধীরে বারাসাতের কালীপুজো সাবেকিয়ানা থেকে থিমের আকার ধারণ করল। কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হল শিল্পী। এমনকি কলকাতার দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় থিমগুলিকে বারাসাতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন ক্লাবের সদস্যরা। বারাসাতের সবচেয়ে প্রাচীন ক্লাব রেজিমেন্টের সহ সভাপতি মলয় ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, “আমাদের রেজিমেন্ট ক্লাব বারাসাতের সবচেয়ে পুরোনো পুজো। এবছর ৬২তম বর্ষে পা দিচ্ছে। একদম শুরুতে নর্দমার উপর পুজো হত। এখন লালী সিনেমার উল্টোদিকে হয়। রেজিমেন্টের পর নবপল্লী ব্যায়াম সমিতি পুজো শুরু করে। যাদের বৈশিষ্ট্য দশহাত কালী। পরবর্তীতে বারাসাত থানার মোড়ে একটি বড় পুজো শুরু হয়। থানার পুলিশরাই এই পুজোয় অংশগ্রহণ করতেন। পরে এই পুজো কেএনসি রেজিমেন্টে পরিণত হয় সর্বজনীন আকার নিয়ে। বর্তমানে ছায়াবাণী সিনেমার পাশে এই পুজো দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়ে। এটিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি বাজেটের পুজো। এরপর আসে শতদল। এই মুহূর্তে বারাসাতে সাত-আটটি বড় পুজো হয়।”

কালীপুজোর চারটে দিন হাইওয়ে সমেত প্রায় সমস্ত রাস্তা নো এন্ট্রি করা থাকে বিকেল চারটের পর থেকে। এছাড়া প্রত্যেকটি বড় পুজোর সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ক্লাবের সামনে থাকে সিসিটিভি। রাস্তার প্রতিটা মোড়ে থাকে ওয়াচ টাওয়ার। একটা সময় বারাসাতের কোনো কোনো ক্লাব ২১ দিনের পুজো করেছে। সত্তরের দশকে একটা প্রতিযোগিতা ছিল, কে কতদিন পুজো রাখতে পারে। বামফ্রন্ট সরকারের জমানায় চব্বিশ পরগণা যখন দুই জেলায় ভাগ হয়ে গেল, তখন উত্তর চব্বিশ পরগণার ডিএম ঘোষণা করলেন পাঁচদিনের বেশি কোনো ঠাকুর রাখা যাবে না। এখন তা সাড়ে তিনদিন বা চারদিনে এসে ঠেকেছে। শোভাযাত্রাতেও ফতোয়া জারি হয়েছে। আশেপাশের পুকুরেই নিরঞ্জন করতে হবে প্রতিমা। শোভাযাত্রার ফলে কোনো বড় রাস্তা আটকে রাখা যাবে না। বর্তমান সরকারের জমানায় ট্রাফিক ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। পুজোর দিন কমে যাওয়াতে সাধারণ মানুষদের বিপাকে পড়তে হয় কম। 

ধর্মীয় অনুষঙ্গ বাদ দিলে দুর্গাপুজো বা কালীপুজো আন্তর্জাতিক উৎসবের আকার নিয়েছে। যার ফলে শিল্পীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। ইন্সটলেশনের মাধ্যমে আমরা শিল্পকে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছি। এই শিল্পই আবার বিশ্বের দরবারে পৌঁছে যাচ্ছে।

ছবিসূত্র- অলিভ সরকার এবং ফেসবুক

Developed by DXDasia