শহরজোড়া নানা পোস্টার, তাতে থিমের হদিশ। অপেক্ষা উস্কে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট…
অনিতেশ চক্রবর্তী এবং সুমন সাধু
আগে পুজোর অপেক্ষা শুরু হত শেষ বর্ষায় মেঘের পর্দার পিছন থেকে উঁকি দেওয়া নীল আকাশ দেখে। তারপর সেই অপেক্ষাকে বানভাসি করে তুলত পেঁজা-তুলো মেঘ। গ্রামে, মফঃস্বলে তো বটেই এমনকি শহরের দু’পা বাইরেও ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটত কাশফুল। এসব এখনও বেঁচে, তবে পুজো আসার ইঙ্গিতগুলো বদলেছে খানিক। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ বর্ষার মর্জি বদলেছে যেমন। ধোঁয়া-হর্ন-যানজটের শহরে পুজো-পুজো গন্ধ, কাশফুলের ঝাঁক খুঁজে পাওয়ার মতো রোমান্টিকতা খুব বেশিজনের নেই। শহরের মানুষের দৌড় বেড়েছে, হাঁপিয়ে ওঠা বেড়েছে, সময় পিছলে যাওয়া আরও দ্রুত হয়েছে। আগের পুজোরও অনেককিছুই বদলেছে। তবু, এখনও শহর জুড়ে পুজো চলে আসে পুজো শুরু হওয়ার ঢের আগে থেকেই। আর, পুজোর সেই নতুন আবাহনী হল পুজোর পোস্টার।
এটুকু পড়েই পাঠকরা স্মৃতি হাতড়ে খোঁজা শুরু করতেই পারে, ‘কই দেওয়ালে তো পোস্টার দেখলাম না তেমন!’ ঠিক, পোস্টারও নিজেকে বদলেছে এই সময়পর্বে। পোস্টার বলতে এখন নিছক দেওয়ালে সাঁটানো কাগুজে বার্তা বোঝায় না। পোস্টার থাকতেই পারে রাস্তার রেলিং-এর গায়ে, ক্রসিং-এর মুখে সিগনাল-বাতির পোস্টে তার দিয়ে বাঁধা। হালে যাকে আমরা ফ্লেক্স বলি, তাও বৃহত্তর চরিত্রে পোস্টার নয় কেন? তাছাড়া, পোস্টার তো এখন ভার্চুয়ালও। ফেসবুক পেজে, ইন্সটাগ্রামেও দিব্য ঘোরে, আপলোড হয় পোস্টারের ‘সফট কপি’। পোস্টারের প্রতি রাজনৈতিক বাঙালি এমনিতেই সফট। সেই সফট কর্নার অন্যভাবে বাড়ছে পুজোকে ঘিরেও।
শহরের বড়ো-মেজো-সেজো সব পুজোই মেতে এই পোস্টারের ট্রেন্ডে। পোস্টারেই শুরু হয় পুজোর কাউন্টডাউন। সঙ্গে, পুজোকমিটির বিজ্ঞাপন। নিজেদের এলাকার পুজোটা নিয়ে খানিক অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি করা। এর হাজারো ধাঁচা। কখনও দক্ষ পেশাদারি কায়দায় ‘ক্রমশ প্রকাশ্য’ ভঙ্গিতে ধারাবাহিক পোস্টার লঞ্চ চলতেই থাকে। কখনও, প্রথমে টিজার, পরে মূল পোস্টার। কেউ কেউ পোস্টার নিয়েও সাবেকি। আগস্ট থেকেই কলকাতার বড়ো রাস্তা, অলি-গলি ভরে ওঠে এই পোস্টারে। পোস্টারে-পোস্টারেও পুজোর টক্কর চলতে থাকে উত্তর থেকে দক্ষিণ। এক পুজোর পোস্টার সীমানা ডিঙিয়ে চলে আসে অন্য এলাকার পুজো-মণ্ডপের সামনে। সে এক মজার ব্যাপার।
তা, পোস্টারে কী এমন আহামরি থাকে যে এই নিয়েও এত ঢাল-উপুড়? বছর পনেরো আগেও পোস্টারে খুব বেশি হলে থাকত ত্রিনয়নের মোটিফ বা প্রতিমার মুখের ছবি, পুজো কমিটির নাম ও পুজো কত বছরে পড়ল তার সংখ্যা আর শিল্পীর নাম। সঙ্গে কেউ কেউ জুড়ে দিতেন ‘এবারের আকর্ষণ: পাতালগঙ্গা’ গোছের থিমের উল্লেখ। পোস্টারের নিচে বা ওপরের কোণে অবধারিত থাকত হয় ঢাক কাঁধে ঢাকির আঁকা-ছবি বা কাশফুলের ভিতর দিয়ে দুই কিশোর-কিশোরীর দৌড়ে যাওয়ার ছবি (রেফারেন্স ফ্রেম অবশ্যই ‘পথের পাঁচালী’-র সেই দৃশ্য)। এসবেরই পার্মুটেশন-কম্বিনেশনে তৈরি হত পুজোর পোস্টার। তখন সদ্য সদ্য ঘটে যাওয়া ডিটিপি-গ্রাফিক্স-কম্পিউটার সেটিং-এর বিপ্লবের পাওনা বলতে ছিল এটুকুই। এখন সে যুগ আর নেই। পুজোর পোস্টার প্রায় যেন একটা ভিজুয়াল আর্ট ফর্মে পরিণত হয়েছে। অবশ্যই বিজ্ঞাপন, কিন্তু সেখানেও শিল্পবোধের, চাহিদার অসামান্য প্রদর্শনী। থিমপুজো যেমন ক্রমে পরিণত হয়েছে শহরজোড়া ইন্সটলেশনের প্রদর্শনীশালায়। তারই সম্প্রসারণ যেন পোস্টারেও। সমস্ত বড়ো পুজোই তাই পুজোর পোস্টার নিয়ে খুব সচেতন।

যেমন ধরা যাক, ‘নাকতলা উদয়ন সংঘের’ পোস্টার। পোস্টারে জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর মুখ। কপালে তৃতীয় নয়ন, মূদ্রায় ঋতুপর্ণার দেবীবেশ পোস্টারে। এবারের থিম ‘সময়’ বা ‘কাল’। সময় তো একটা প্রহেলিকা, ইলিউশন। আমরা তাকে বাস্তব-সংযুক্তি দিয়ে বিচার করি। একটা সূর্যোদয় থেকে একটা সূর্যাস্ত পর্যন্ত যদি একটা সময়কে দেখি, তাহলে সেটাকে আমরা একটা দিন বলি। আবার সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়, এটা একটা রাত। কিন্তু একজন মানুষকে যদি কোনও শূন্য-পরিসরে অন্ধকার ঘরের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কত সময় সেখানে বসে আছে সে বুঝতেই পারবে না। আজকের কলকাতা আর দশ বছর আগের কলকাতার মধ্যেও যেমন একটা বিশাল পার্থক্য আছে। শিল্পী সুশান্ত পালের ভাবনায় এভাবেই ধরা পড়ছে ‘কাল’। আর, সেই কাল-ই উঠে এসেছে পোস্টারে। অতিকথনের কণামাত্র নেই। দেবীরূপে ঋতুপর্ণা, পশ্চাদপটে শরতের নীল আকাশ, থিমের উল্লেখ, শিল্পীর নাম আর পুজো কমিটির নাম। ব্যাস। পাঠকের মনে অপেক্ষা বুনে দেওয়ার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট। পোস্টারের এই তো কাজ।

কলকাতার সবচাইতে পুরোনো বারোয়ারি পুজো ‘শ্যামপুকুর আদি সার্বজনীন’-এর পুজোর পোস্টার অবশ্য তুলনায় অনেক সাবেকি। পোস্টারের বাঁদিকে হাতে আঁকা দুর্গাপ্রতিমা। খানিক অ্যবস্ট্রাক্ট ধাঁচার। সবুজের সমারোহ পোস্টার জুড়ে। সেখানেই রয়েছে থিমের উল্লেখও। ছড়ায়, অন্ত্যমিলে। “শারদ স্বপ্ন মেলবে আঁখি/ শুভ ষষ্ঠীর সকাল।/ শিল্পী ছোঁয়ায় ঘটবে মিলন/ একাল থেকে সেকাল।” এখানেও ‘কাল’-এর কথা। পোস্টারে হয়তো সেই থিমের উল্লেখটুকু বাদে মণ্ডপসজ্জার আর কোনো হদিশ এখনই দর্শকদের দিতে নারাজ উদ্যোক্তারা।

ঠাকুরপুকুরের ‘এসবি পার্ক’-এর পুজোর পোস্টারও নজর কেড়েছে অনেকের। এবারের থিম ‘অগ্নিশুদ্ধি’। পোস্টারের আগুনে রঙের আবহে প্রতিমার মাটির মুখের ছাঁদ। রঙের প্রলেপ পড়েনি তাতে। আগুনে-রঙকে যোগ্য সঙ্গত করেছে বাকি পোস্টারের ঘন কালো আবহ। সেখানে ক্যালিগ্রাফিতে লেখা থিম। লেখা আরও অনেককিছুই, কিন্তু সামান্যতেও স্পেসের ব্যবহার যে কী অসামান্য হয়ে উঠতে পারে, তার প্রমাণ এই পোস্টার। এবছরের এই পুজোয় প্রধান মাধ্যম হিসাবে সেরামিক্স বা টেরাকোটাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। মাটি পুড়িয়ে কীভাবেই বা টেরাকোটা করা হয় কিংবা সেরামিক্স করা হয় সেটা এবছরের কাজ। মেটেরিয়াল প্রক্সি নয়, সত্যিকারের উপাদানের ব্যবহার। এই পোস্টার যে থিমকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে, বলাই বাহুল্য।

বেলেঘাটা ৩৩ পল্লীর এবারের থিম “ঈশান কোণে ঈশানী”। কোনও উপকরণকে কেন্দ্র করে স্থাপত্য নির্মাণে তার প্রাধান্য – এই ধরনটা থেকে বেরিয়ে ভাবনার মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে ইন্সটলেশন বা বিন্যাস করতে চাইছেন শিল্পী। যেখানে প্রাধান্য পাবে কৌণিক দূরত্ব, কৌণিক স্ট্রাকচার, জ্যামিতিক পরিমাপ আর দেবী ঈশানী। পোস্টারে সেই ইঙ্গিতটিই ফুটে উঠেছে। এই পোস্টার যেন আসল মণ্ডপ্সজ্জার প্রচ্ছদ। রসিকের জন্য ইশারাই পর্যাপ্ত।

আবার, টালাপার্ক প্রত্যয়ের এবারের থিম ‘অতল অনন্ত’ বেশ স্পষ্ট করেই ধরা আছে পোস্টারে। অনেকটা এসবি পার্ক পোস্টারের ঘরানাতেই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পোস্টারের বাঁদিক। সেখানে আলোকচিত্রে ধরা একটা সুড়ঙ্গ বা সেই ধাঁচারই কিছু। অতলের আবহ-নির্মাণে যা সফল। নিচে উজ্জ্বল আলোর দিশা। এখানেও পোস্টারের বাকি অংশের ‘ডার্ক’ চরিত্রই আসলে নির্মাণ করেছে পোস্টারটিকে।

পথচলতি মানুষদের চোখ টানছে ‘যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লী’র পোস্টারও। এবারের থিম ‘বাঁধন’। শিল্পী ভবতোষ সুতার। পোস্টারটিতে প্রায় কিছুই লেখা নেই। স্পেসের খেলা যে কত অমোঘ হয়ে উঠতে পারে, এই পোস্টার সেটাই বলছে। বাঁদিকের স্পেসটি সাদা, সেখানে নিচে মহিষাসুরের মুখের ছাঁচটি উলটো করে পরে দাঁড়িয়ে একজন। আর, ডানদিকে একজন শিল্পীর হাতের ছবি। তিনি বাঁধনে বুনে তুলছেন দড়ির কারুকাজ। শিল্পীর মুখ নেই। আসলে তো সৃষ্টির কাছে স্রষ্টা অবয়বহীন। পোস্টারের মূল রঙ ধূসর। শুধু লালচে রঙের ‘বাঁধন’ লেখাটি ডানদিক আর বাঁদিকের সীমার ঠিক মাঝে বসেছে। থিম নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল উস্কে দেওয়ার পক্ষে তো বটেই, পোস্টার হিসেবেও যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লীর এই পোস্টার অসাধারণ।

টালিগঞ্জের অজেয় সংহতির পোস্টারে লেখা 'হাওয়া ঘুরবেই'। পশ্চাদপটে টেক্সচারে ফুল-পাতার মোটিফ। অনেকটা নক্সার মতো। অজেয় সংহতির এবারের থিম 'খোলা হাওয়া'। পঞ্চভূতের একটা উপাদান বায়ু, আমাদের আয়ুষ্কালের মাঝেও 'হাওয়া'-গাড়ির চলা। সেই 'হাওয়া' শব্দটিকে নিয়েই খেলা চলছে পোস্টারে। পোস্টার একটা নয়, সিরিজ। বেশ চমকপ্রদ সন্দেহ নেই।

উত্তর কলকাতার সিগনেচার পাড়া। সাদা-কালো ছবির মাঝে ঝুল বারান্দাটা রঙিন। নিচে রাস্তায় প্রতিমা আসছেন। "আলতা রাঙা পায়/ এসো মা এসো মা"। কাশী বোস লেনের পুজোর পোস্টার এমনই। সাদা-কালো ফ্রেমে ইতি-উতি রঙ। অদ্ভুত এক মায়া পোস্টারের অলিন্দ-বাহিরানা জুড়ে। কাশী বোস লেনের এবারের থিমও–অলিন্দ।
অতিকথায় আর কাজ নেই। আরও অসংখ্য ভালো-ভালো পোস্টারের সামনে সামান্য সময়ের জন্য হলেও বিস্ময়াবনত হয়েছি আপনারা অনেকেই। পুজো যত এগিয়ে আসবে, পোস্টারের সংখ্যাও বাড়বে। আর, এইসব পোস্টারের মধ্যে দিয়েই আমরা আপাতত খুঁজে নেব সেইসব পুজোর থিমের অবয়ব। আমাদের অপেক্ষার মাত্রা চড়বে। পুজো আসছে। আরও একবার।