
হালিশহর সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের শহর। রাজা কুমার পালের শহর।
সময়টা ষোড়শ শতকের প্রথমভাগ। শের শাহ সুরির রাজত্ব। দিল্লির এই আফগান সম্রাটের হাতে প্রতিষ্ঠা পেল ‘হাভেলি শহর’। হাভেলি শহর অর্থাৎ অট্টালিকা বহুল নগরী, কথাটির অপভ্রংশে এসেছে হালিশহর নাম। ‘আইন-ই-আকবরী’তে সরকার-সাতগাঁর অন্তর্গত পরগণার মধ্যে হাভেলি শহরের নাম পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি পাওয়া যায় আরও একটি তথ্য। অনেকের মতে এই শহরের প্রাচীন নাম কুমারহট্ট। একসময় এখানে কুমোরদের বিশাল হাট বসত। গঙ্গার ঘাট থেকে চালান হত মাটির তৈরি হাঁড়ি, কলসি। সেই কুমারহাট থেকেই নাম হল কুমারহট্ট। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখায় প্রথম পাওয়া গেল হালিশহর নামটি- “বামদিকে হালিশহর দক্ষিণে ত্রিবেণী/ যাত্রীদের কোলাহলে কিছুই না শুনি”। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের পুঁথিচর্চার ফলে এখানকার পণ্ডিত সমাজ একসময় নবদ্বীপের সমতুল্য খ্যাতি অর্জন করেছিল।
পাল রাজাদের তৈরি নৌ-বন্দরের ইতিহাস ধারণ করে রেখেছে এই শহর। তখনও হাভেলি শহরের জন্ম হয়নি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা তখন তাম্রলিপ্ত থেকে সরে এসেছেন গঙ্গার ওপারে। আর এপারে অধুনা হালিশহরের নৌ-বন্দরে নিয়মিত আসতেন রাজা কুমার পাল। তৈরি হচ্ছিল জনবসতি। রাজা কুমার পালের নামেই কি তবে ‘কুমারহট্ট’?
হালিশহর সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের শহর। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালদের পরে গোঁড়া শৈব মতাবলম্বী সেনরা রাজত্ব চালান। তাই হালিশহরে শিব মন্দিরের ভগ্ন স্তূপের শেষ নেই। শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র শিব মন্দির। প্রবল কৌলিন্য প্রথার মধ্যে দিয়ে চলা হালিশহরের সংস্কৃতিতে ধর্মান্ধতার গ্লানি যখন চেপে বসেছে, তখন বৈষ্ণব ধর্মের পথিকৃৎ চৈতন্যদেবের দীক্ষা গুরু শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরীর উত্থান হয়। এই শহরেই তাঁর জন্মভিটেতে এখন রাজ্যের অন্যতম বড় বৈষ্ণব পাঠাগার। চৈতন্যদেবের পদধূলি হালিশহরের বুক জুড়ে। গুরুর ভিটে থেকে চৈতন্যদেব এক মুঠো মাটি তুলে নেওয়ার পরে তাঁর ভক্তেরাও ওই পুণ্য মাটি মুঠো ভরে নিতে থাকেন। সেই থেকেই তৈরি হয় ‘চৈতন্য ডোবা’। হালিশহরে সাধক রামপ্রসাদের ভিটে। কবি রামপ্রসাদ সেন ১৭২০ সালে এই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রামপ্রসাদের ভিটেতে কালীবাড়ির জন্যই হালিশহর একটি সিদ্ধপীঠ। এমনকি রানি রাসমণির জন্মস্থান এই হালিশহর। তাঁর পৈতৃক বাড়ি, বাঁধানো ঘাট এখনও আছে।

হিন্দু-মুসলিম একসাথে পাশাপাশি নিজেদের মতো আছে। এখনও এই ছবি মূর্তমান। হিন্দু রাজাদের সময় যেমন অসংখ্য মন্দির তৈরি হয়, মুসলমান শাসনের সময় তেমন বেশকিছু মসজিদ ও দরগাও তৈরি হয়। বলিদাগাটার সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরটি গঙ্গাপাড়ে গড়ে উঠেছে। গঙ্গা থেকে পাওয়া কষ্টিপাথর দিয়ে তৈরি এখানকার বিগ্রহ। তারপর থেকেই ‘কালীকাতলা’ নামটি চালু হয়।
ইতিহাস কথা বলে। হ্যাঁ, বলে। হাভেলির দ্বারে আমরা ঠাঁই বসে আছি। নিবিড় সহাবস্থান আমাদের। ইতিহাসের খুব কাছে চলে এলে সবকিছু কেমন শান্ত মনে হয়। সেই যে কবিকঙ্কন লিখে গেলেন, “যাত্রীদের কোলাহলে কিছুই না শুনি”। এসব শোনার নয়, উপলব্ধির।
