অস্কারজয়ী সিনেমা থেকে বাংলার জঙ্গল : মানুষ-পশুর সংঘাত রুখছেন গজমিত্র

পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগের উদ্যোগে শুরু হল ‘গজমিত্র’ প্রকল্প

মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাতের কাহিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিরাজ করেছে ভারত তথা বাংলাতে। কখনও সেই সংঘাতে মানুষ বলি হয়েছে, কখনও প্রাণ হারিয়েছে হাতি। এই সংঘাত রুখতে বহু সময়ে অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগ। আর এবার এই তালিকাতেই জুড়ে গেল ‘গজমিত্র’র নাম। প্রত্যেক গজমিত্র হয়ে উঠবেন হাতিদের বন্ধু; এই বিশালাকায় বন্য প্রাণীটাকে ভালোবেসে, আদর করে সরিয়ে নিয়ে যাবেন লোকালয় থেকে। একই সঙ্গে আবার অসাধু মানুষদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবেন ভয়ার্ত হাতিটিকে।

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা; মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে হাতির হামলায় ভয়াবহ মৃত্যু হয় এক পরীক্ষার্থীর। তবে উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গল সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বসবাসকারী মানুষদের কাছে এ ঘটনা নতুন নয়। হাতির বেমক্কা হামলায় অগুনতি ফসলের ক্ষতি হয়েছে আজ অবধি। কখনও আবার নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে হাতিদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে গ্রামবাসীরা। পরিবেশগত জীববিজ্ঞানী ডাঃ পুলক লাহিড়ী বলেন, “আমরা ওদের বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছি। রিজার্ভ ফরেস্টগুলোর গা ঘেঁষে মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়াচ্ছে লোকালয়। আর তারপর আমরা আশা করছি, হাতি আমাদের বাড়িঘর আর চাষের জমি থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে!”

এই সংঘাত উপেক্ষা করবার উপায় একটাই – এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাতে দুই দলই স্বেচ্ছায় নিজ নিজ বৃত্তে বিরাজ করতে পারে। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই জন্ম হয় ‘গজমিত্র’-এর। হাতির দল কখন একটা বিশেষ গ্রামকে টার্গেট করে সেদিকে এগোতে শুরু করেছে, সে বিষয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই গ্রামের আবাসিকদের ধারণা থাকে না – বিভিন্ন সময়ের সমীক্ষা থেকে এই ধারণা পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল বনদপ্তরের কাছে। আর সে জন্যই গৃহীত পদেক্ষেপগুলি ফলপ্রসূ হয় না। নতুন উদ্যোগটির দরুন, গ্রামবাসীদের মধ্যে যারা হাতির সম্পর্কে অত্যন্ত ওয়াকিবহাল, তাঁদের ‘গজমিত্র’ পদে নিয়োগ করা হবে।

নতুন উদ্যোগটির দরুন, গ্রামবাসীদের মধ্যে যারা হাতির সম্পর্কে অত্যন্ত ওয়াকিবহাল, তাঁদের ‘গজমিত্র’ পদে নিয়োগ করা হবে।

স্থানীয় বনবিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন গজমিত্রেরা, জানবেন হাতিদের গতিবিধির হালহদিশ। কোনো গ্রামের দিকে হাতির দল এগিয়ে আসবার খবর পেলেই, সেই গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে সতর্কবার্তা। গ্রামবাসীদের শেখানো হবে নানাবিধ উপায়, যা অবলম্বন করে হাতির কোনোরূপ ক্ষতিসাধন না করেই নিজেদের ফসল রক্ষা করতে পারবে তারা।

চিফ কনজারভেটিভ অফ ফরেস্ট অ্যান্ড ফিল্ড ডিরেক্টর শুভঙ্কর সেনগুপ্ত বলেন, “কোনো গ্রামের উপর হাতির দল আচমকা হামলা করলে কী কী করনীয়, সে বিষয়ে ২০২০ সালেই বনদপ্তর গ্রামবাসীদের জন্য কর্মশালার আয়োজন করেছিল। গ্রামের চারপাশে হাই-ভোল্টেজ অথচ লো অ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারিযুক্ত বৈদ্যুতিন তার লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সৌরশক্তি চালিত এই তার কেবলমাত্র দূরে রাখবে হাতিদের, তাদের মেরে ফেলবে না। পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের পক্ষ থেকে গ্রাম প্রধান এবং অন্যান্য গ্রামবাসীদের পাঠানো হয়েছিল এসএমএস, যেখানে বলা হয়েছিল, লোকালয়ের আশেপাশে কোথাও হাতি থাকবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখা গেলেই যেন তারা খবর দেয় বনদপ্তরকে। খনন করা হয়েছিল জলভর্তি গর্ত, রোপণ করা হয়েছিল হাতিদের পছন্দসই ঘাসের বীজ এবং ফলের গাছ; যাতে নাগালের মধ্যেই প্রয়োজনীয় খাবার পেয়ে গ্রামের দিকে আর হানা না দেয় হাতির দল।”

গজমিত্র প্রকল্পের অধীনে আনা হয়েছে ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম এবং পূর্ব বর্ধমান ডিভিশনকে। যেসব এলাকায় হাতির আক্রমণ বেশি ঘটে, সেসব জায়গায় ১০ জন অবধি গজমিত্র নিয়োগ করা যেতে পারে। নির্বাচিত গজমিত্রদের নির্দিষ্ট পোশাক দেওয়া হবে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে। দেওয়া হবে টেলিফোনের খরচও, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য বনদপ্তরের সঙ্গে আদান প্রদান করতে পারে তারা।

তবে মানুষ-হাতির এই সংঘাত যে কোনো একদিন থেকে হঠাৎই শুরু হয়েছে, এমনটা নয়। এর পিছনে রয়েছে এক প্রাচীন ইতিহাস। খনিজ শিল্পের অগ্রগতির জন্য ঝাড়খণ্ড ও ময়ূরভঞ্জের জঙ্গল যখন নির্বিচারে কেটে দেওয়া হচ্ছিল, সেই সময়েই দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গে শুরু হয় হাতিদের প্রকোপ। ঐতিহাসিক রেকর্ড জানায়, ১৯০০ সালের আগে ঘন শালবনে ছেয়ে ছিল দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গল। হাতিদের রাজত্ব ছিল সেখানে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এই চেহারা ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। ১৯৮০ সাল নাগাদ এখানকার হাতিদের সংখ্যা এসে ঠেকল তলানিতে। আর এই সময়েই, ঝাড়খণ্ডের দলমা ওয়াইল্ডলাইফ স্যানচুয়ারি থেকে হাতির দল যাত্রা করল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে। 

গজমিত্র প্রকল্পের অধীনে আনা হয়েছে ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম এবং পূর্ব বর্ধমান ডিভিশনকে। যেসব এলাকায় হাতির আক্রমণ বেশি ঘটে, সেসব জায়গায় ১০ জন অবধি গজমিত্র নিয়োগ করা যেতে পারে।

এ সময়ে জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্টের গৃহীত একটি বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের কারণে দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার জঙ্গল ভরে উঠেছিল অসংখ্য গাছগাছালিতে। সেখানেই এসে বাসা বাঁধল হাতিরা। তাদের আগমন প্রকল্পটিকে আরও বেশি সফল করে তুলল, যার ফলস্বরূপ আরও বেশ কয়েকটি মৃতপ্রায় জমিকে ভরিয়ে দেওয়া হল নতুন গাছ দিয়ে। কিন্তু সেক্ষেত্রে দেখা গেল এক নতুন সমস্যা। দক্ষিণবঙ্গ হাতিদের স্বাভাবিক বাসস্থান না হওয়ার ফলে তাদের এখানে বসবাস সাধারণ মানুষ ও বনকর্মীদের নাজেহাল করে তুলল। এক বনকর্মী বলেন, “হাতিদের আচমকা তাড়া দেওয়া বা ভয় দেখানো অত্যন্ত অন্যায়। এতে তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে যায় এবং নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বরং সম্পত্তি ও জমিজমা ধ্বংসের সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়।”

বনবিভাগের সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণবঙ্গে প্রায় ১৫০টি হাতি বাস করে এই মুহূর্তে। এর এক-তৃতীয়াংশ দলমা পাহাড়ে নিজেদের জন্মস্থানে ফিরে গেলেও, বাকিরা পর্যাপ্ত খাবার ও জল পেয়ে এখানেই থেকে যায়। বর্তমানে এলিফ্যান্ট মুভমেন্ট কোঅরডিনেশন কমিটি (EMCC) স্থাপনের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার ও বিভিন্ন স্তরের বনকর্মীরা একত্রিত হতে পারবেন হোয়াটস্যাপ গ্রুপ ও ইমেল মারফত। আশা করা যায়, এ সকল প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রাচীনকাল থেকে হয়ে চলা মানুষ ও হাতির সংঘাতে খানিকটা রাশ টানা সম্ভব হবে।

Developed by DXDasia