আজ বিশ্ব হাতি দিবস
আজ ১২ অগাস্ট, ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে। বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে এখনও এ দেশের যে কোনও প্রকৃতিবিদকে ভাবিয়ে তোলে যে বিষয়টি, তা হল- মানুষ এবং বন্যপ্রাণীর দ্বন্দ্ব। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই দ্বন্দই হাজার হাজার হাতি-হত্যার কারণ এবং যার ফলে হস্তিকূলও আজ বিপন্ন। আফ্রিকান হাতিদের মতোই বছরের পর বছর ধরে এশিয়ান হাতির সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। বাচ্চা হাতিরা হয় মানুষের তাড়া খেয়ে গর্তে পড়ে অথবা রেললাইন পেরোতে গিয়ে মারা যায়। তবে, ভারতে হাতির চোরা শিকারের সমস্যা নেই বললেই চলে, অন্তত উত্তরবঙ্গে এই ধরনের চোরা শিকারের সংখ্যা প্রায় শূন্য।
মানুষ এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তার একটি ইতিহাস রয়েছে। ঝাড়খণ্ড এবং ময়ূরভঞ্টাঅরণ্য সাফ করে ফেলার জন্য দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গে এই দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। এভাবে বিগত কয়েক দশক ধরে খনন কার্য এবং অন্যান্য কাজের জন্য যথেচ্ছ ভাবে অরণ্য নিধন হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহাসিক নথি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯০০ সালের আগে পর্যন্ত এইসব অঞ্চলে ঘন শাল বন ও হাতির পালের বসবাস ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দির একেবারে শুরু দিক থেকে দ্রুত বন উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে বনভূমির মানচিত্রটাই বদলে যায়। রেকর্ড অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে – ১৯৮০ পর্যন্ত হাতিগুলি প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৭ সাল থেকে ঝাড়খণ্ডের দলমা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থেকে হাতির পাল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে। এর আগে, ১৯৭৬ সালে হাতি দেখতে পাওয়ার একটি মাত্র রেকর্ড আছে –যখন ৪২টি হাতির একটি পাল পুরুলিয়ার দলমা থেকে সিন্দ্রিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের বন বিভাগ হাতিদের লোকালয় থেকে দূরে রাখার জন্য গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে বেশ কিছু উদ্ভাবনী পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। কেরালার মতো (কেরালায় প্রায় প্রতি সপ্তাহে একটি করে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটে) হাতিদের উপর বিষক্রিয়ার পরিবর্তে বাংলার মানুষ এই বিশালাকৃতির প্রাণীদের রক্ষা করার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব পাকা ফসল রক্ষার চেষ্টা করে।
বন বিভাগের অনুমান, বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গে প্রায় ১৪০-১৫০ হাতি রয়েছে। এর মধ্যে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড়ে তাদের নিজেদের বাসস্থানে ফিরে আসে, কিন্তু খাদ্য ও জলের সহজলভ্যতা থাকায় অধিকাংশই ফিরে যায়। দক্ষিণবঙ্গ হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল নয়, তাই ক্ষতিকারক বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গ্রামবাসী এবং বন কর্মকর্তাদের জন্য মাঝেমধ্যেই বিপদ ডেকে আনে। তবুও তারা এই বিশালাকৃতি প্রাণীগুলিকে হত্যা না করে উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, ভয়ঙ্কর কৌশলে হাতিদের তাড়া করলে তাতে ক্ষতিই হয়, কারণ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায়, তারা ফসল ভর্তি মাঠের দিকে ধাবিত হয়। তবে, এই বিপদের মোকাবিলায় একটি Elephant Movement Coordination Committee (ইএমসিসি) বা আধুনিক হাতি আন্দোলন সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটিই সবচেয়ে ভালো আধুনিক কৌশল। ইএমসিসি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং ইমেল এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাদের একত্রিত করে, হাতির পালের গতিবিধির যাবতীয় আপডেট রাখে। একটি বিশেষ সেল গঠিত হয়েছে যা গ্রামবাসীদের হাতির পালের গতিবিধি বিষয়ে সতর্ক করে একযোগে এসএমএস-এ সতর্কবার্তা পাঠায়। এভাবেই মানুষের হতাহত রোধে প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
