একান্ত সাক্ষাৎকারে অকপট কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির সভাপতি রাজ চক্রবর্তী

জানালেন নতুন ভূমিকায় নিজের অনুভূতির কথা

শুরু হল ২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ৭৬টি দেশের ৩৬৬টি ছবি দেখানো হবে এবারের উৎসবে। এবছর উৎসব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি আড্ডা মারলেন সহেলি মিত্রের সঙ্গে। তাঁর চিন্তাভাবনার কথা উজার করে দিলেন। 

•    এই বছর কলকাতা আপনাকে সম্পূর্ণ নতুন ভূমিকায় দেখছে। আপনি এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির সভাপতি। আপনার নিজের অনুভূতি কেমন?

এক কথায় বললে আমি দারুণ খুশি। একটা সময় ছিল, যখন আমি এই ফেস্টিভ্যালের বিশ্বসেরা ছবিগুলো দেখব বলে পাসের আশায় ঘুরে বেড়াতাম। এতগুলো সিনেমা আর সেমিনার একসঙ্গে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম সারা বছর। ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সব সময়েই আমার প্রাণের উৎসব। এখন সেই উৎসবের অংশ হয়ে ওঠার, কাজ করার যে সুযোগ আমি পেতেছি, তা আমার জীবনের সেরা মর্যাদাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

•    চলচ্চিত্র উৎসব কীভাবে আপনাকে পাল্টে যেতে সাহায্য করেছে?

এতদিন মানুষ আমাকে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী বলেই চিনত। এখন আমি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির সভাপতি। একটা নতুন রোল। প্রবীণ পরিচালক, অভিনেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথাবার্তা বলতে হয়েছে, কোন কোন সিনেমা দেখানো হবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শ’খানেক সিনেমা দেখতে হয়েছে। ৭-৮ দিন আমি বিশ্ব সিনেমার সমুদ্রে পুরোপুরি ডুবে ছিলাম। বলা যেতে পারে আলোকিত হওয়ার মতো একটা কাজ। এই কাজের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি এবং এরকম অভিজ্ঞতা জীবনে একবারই আসে।

•    বিভিন্ন মহাদেশের এতগুলো বিশ্বমানের ছবি আপনি দেখলেন, তার প্রভাব আপনার ওপর কীভাবে পড়েছে?

একবার কল্পনা করে দেখুন। ৭৬টি দেশের ২১৩টা সিনেমা, ১৫২টা শর্ট ডকুমেন্টারি দেখানো হবে এবার। বিশ্ব সিনেমার প্রেক্ষিতে এই সংখ্যাটা প্রচুরই। আপনাকে যখন দিনের পর দিন ধরে এগুলো দেখতে হবে, প্রদর্শনের জন্য সিলেক্ট করতে হবে, তখন বিশ্ব সিনেমার একটা প্রভাব তো আপনার ওপর পড়বেই। ছবিগুলো যে যে দেশে নির্মিত হয়েছে, সেখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও উঠে এসেছে ছবিগুলোতে। এগুলো শুধুমাত্র সিনেমা নয়, বাণিজ্যিক রুপোলি পর্দার থেকে এগুলোর গভীরতা অনেক বেশি। চলচ্চিত্র উৎসবে কাজ করতে গিয়ে এগুলোর গভীরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছি আমি। একজন পরিচালক হিসেবেও এই গোটা প্রক্রিয়া থেকে অনেক কিছুই শিখতে পেরেছি।

•    গোটা টিমের সঙ্গে এই কাজ আপনি কতটা উপভোগ করলেন?

টিমের নিষ্ঠা এবং উদ্যম আমাকে খুব অবাক করেছে। সবাই এটাই ভাবে যে সরকারি সংস্থাগুলো খুব আস্তে আস্তে কাজ করে, তাদের আঠেরো মাসে বছর হয়। কিন্তু এই কথাটার কোনো বাস্তব ভিত্তিই নেই। তথ্য এবং সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী এবং আধিকারিকরা কীভাবে দিনের পর দিন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করেছেন তা নিজের চোখেই দেখেছি। গৌতম ঘোষ, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, অতনু ঘোষ, নির্মল ধর, রঞ্জিত মল্লিকের মতো সিনেমা জগতের মহীরূহদের সঙ্গে কাজ করেছি এখানে। অন্যন্য জগতের প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্বরাও উৎসবের সঙ্গে যুক্ত আছেন। প্রায় ২৯০০টির মতো ছবি আমাদের দেখতে হয়েছে। টিম মেম্বাররা শুধু শিল্পীই নন, তাঁরা যথেষ্ট সংবেদনশীল, কঠোর পরিশ্রমী এবং অভিজ্ঞ।

•    সভাপতি হিসেবে কতটা গবেষণা মধ্য দিয়ে আপনাকে যেতে হয়েছে?

বলা যেতে পারে, অনেকখানিই গবেষণা করতে হয়েছে। বিশ্বসেরা পরিচালকের নিয়ে লেখাপত্তর, তাঁদের প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা, এবং আরো অনেক গবেষণাধর্মী কাগজ এখনো আমার টেবিলে পড়ে আছে। আমার মনে হয়, শেখার অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্যই সবার উচিত এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আসা।

•    এবছরের থিম দেশ জার্মানি। সেই বিষয়ে আপনার অনুভূতি কী?

থিম দেশ জার্মানিকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একটা আশ্চর্য বিষয় আমি জানলাম। বাংলা সিনেমার সঙ্গে জার্মানির সংযোগ খুব নিবিড়। ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগে কলকাতা এবং জার্মানির যৌথ উদ্যোগে বেশ কিছু সিনেমা নির্মিত হয়েছিল। এরকম তথ্য খুঁজে পাওয়া এক দারুণ আবিষ্কার তো বটেই।

•    বিদেশ থেকে বহু প্রতিনিধি এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের কাছে বাংলা এবং কলকাতাকে তুলে ধরার জন্য কোনো বিশেষ পরিকল্পনা কি রয়েছে?

মাস্টার ক্লাস এবং সেমিনারের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে শহরের সিনেমা বিশেষজ্ঞ এবং দর্শকদের সরাসরি মত বিনিময়ের ব্যবস্থা আমরা রেখেছি। এছাড়া কলকাতা ও তার বাইরে হেরিটেজ  ট্যুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রতিনিধিদের। এভাবে তাঁরা সিনেমার শুটিং-এর জায়গাও খুঁজে নিতে পারবেন। আমরা এবং তাঁরা – দু’পক্ষই এভাবে বাংলাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পাব।
 

Developed by DXDasia