
রবীন্দ্রনাথ ‘কাবুলিওয়ালা’ রহমতকে বাংলা থেকে স্বদেশ কাবুলে ফেরত যাওয়ার মওকা দিয়েছিলেন
বাড়ির পাশের পার্কে খেলতে গিয়েছিল ছোট্ট মিনি। তারপর হঠাৎই ছুটতে ছুটতে ঘরে ফিরে এসে মা-কে জানায়, রাস্তায় কেমন এক মস্ত কাবুলিওয়ালা সে দেখেছে। এসব কথায় অবশ্য তেমন পাত্তা না দিয়ে, রাজ্যের ধুলো ঘেঁটে বাড়ি ফেরা মিনিকে তার মা সবসময়ের মতো তখনও বলে, হাত পা পরিষ্কার করে ধুয়ে ফেলতে। এই একই কথা শুনতে শুনতে মিনিও ক্লান্ত। বিরক্ত হয়ে বলেই বসে, ‘উফ খালি হাত ধোও আর হাত ধোও!’ শুধু কি তাই! পরিচারিকা রামের মা ফিনাইল দিয়ে ঘর না মোছার জন্য বকা খায় গৃহকর্ত্রী মিনির মায়ের কাছে। চারদিকের অসুখ-বিসুখ এড়াতে ছোট্ট মিনির মা সবসময়ই তটস্থ।
চোদ্দবার হাত ধোওয়ার এই অতিমারীর কালে কয়েক দশক আগে, চিত্র পরিচালক তপন সিংহ নির্মিত, ‘কাবুলিওয়ালা’র (১৯৫৭) এই দৃশ্যগুলোর কী আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া গেল। এর পাশাপাশি, আবাল্য পরিচিত এই সিনেমা সম্প্রতি ফের আরেকবার দেখতে বসে একইসঙ্গে কিছু অপ্রিয় মনখারাপি কথাও কোনোমতেই এড়ানো গেল না। ধুলোবালি ঝেড়ে মায়ের কথামতো বছর পাঁচেকের মিনি পর্দায় যখন, হাত ধোয়, আমরাও ভেজা হাত মুছি গামছায়। চোখ তখনও ভিজে থাকে, কারণ তার কিছুক্ষণ আগেই খবরে প্রকাশ হয় বাঁচার জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাওয়া আফগানি মানুষের, যাত্রীবাহী প্লেন থেকে ঝুলন্ত দেহের ভাইরাল হওয়া ছবি। পঁচিশ বছর পর জীবন-জীবিকা সর্বত্র প্রাচীন সেই তালিবান মানসিকতা জাঁকিয়ে বসেছে একুশ শতকের আজকের আফগানিস্তানে। স্বজাতির এমন করুণ পরিণতি দেখে কয়েকশো মাইল দূরে বসে চোখ মোছেন কলকাতার কাবুলিওয়ালারা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পের ‘কাবুলিওয়ালা’ রহমতকে বহুকাল পরে হলেও বাংলা মুলুক থেকে তার স্বদেশ কাবুলে ফেরত যাওয়ার মওকা দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের তালিবান শাসনে রক্তাক্ত আফগানিস্তানে ফের আরেকবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ আসবে কি আর কলকাতায় সওদা করতে আসা এ যুগের কাবুলিদের!
উত্তর জানা নেই। আপাতত, তাই মিনির হাত ধরে আরও একবার রহমতের ঝুলিতে হাত পুরে দিই আমরা। কী ছিল সেই বিশাল-দেহী কাবুলিওয়ালা রহমতের ঝুলিতে! বিক্রি করার পেস্তা, বাদাম, আখরোট, কিসমিসের পাশাপাশি রহমত তার ঝুলিতে নিয়ে ঘুরত ফেলা আসা সুলেমান পর্বত কিংবা চিনার বনের মায়া আর বিরাট এক মরমি পিতৃস্নেহ। মিনির প্রশ্নের উত্তরে রহমতবেশি ছবি বিশ্বাস অবশ্য তাঁর দক্ষ উচ্চারণে বলতেন সে ঝুলিতে মস্ত এক ‘হাঁত্তিই’ আছে। শত পরিশ্রমেও রুক্ষ মাটিতে সোনা ফলাতে পারেনি রহমত তার নিজের দেশ কাবুলে। যে কোনো স্নেহময় পিতার মতো নিজের ছোট্ট মেয়েটার ভাবীকাল সুরক্ষিত করতে আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজন ছিল তার। তাই তো সব ছেড়ে, নিজের কলিজাসম কন্যাকে ছেড়ে এই বাংলা মুলুকে তার আসা। সঙ্গে ছিল নিজের ছোট্ট মেয়ের হাতের ছাপ। সেই ছাপ যে এক বাঙালি লেখকের ফুটফুটে কন্যা মিনির সঙ্গে মিলে যাবে, তার স্থির উৎস ছিল রহমতের স্নেহার্দ্র হৃদয়। একটা একটা করে দিন যায়, কাজু কিসমিসের ফাঁকফোকর দিয়ে দুটো অসম-বয়সের মানুষের সম্পর্ক বন্ধন তত দৃঢ় হয়। সে সম্পর্ক স্নেহের, বন্ধুত্বের। মিনি রহমতকে গান শোনায় ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা…’।
রহমত, জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে স্বদেশে মিনির সমবয়সী তার ছোট্ট মেয়েকে একপ্রকার একা ফেলে এসেছে। রহমত তাই জানে, হারিয়ে ফেলার, ছেড়ে থাকার যন্ত্রণা। তাই হারিয়ে যাওয়ার কোথাও মানা না থাকলেও মিনিকে রহমত বেশ করে শুনিয়ে রাখে বারবার ‘খোঁকি তুমি হামাকে ছেড়ে সোসুরবাড়ি কখুনো যাবে না!’ অবুঝ মিনি শ্বশুরবাড়ির বিন্দুমাত্র অর্থ না বুঝে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ভাঙা বাংলা বলা কাবুলিওয়ালার এহেন উচ্চারণে। অথচ মেয়ের অসুখের খবর শুনে কাবুলে ফিরে যেতে চাওয়া রহমত, ভাগ্যের পরিহাসে ঠগ এক লোককে ছুরি মারার অপরাধে ৮ বছরের কারাবাসের শাস্তি পায় এবং জেলমুক্তির পরেই মিনিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে আঙুর, আখরোট নিয়ে দেখা করতে যায় যেদিন, সেদিনই ছিল মিনির সত্যিসত্যি ‘সোসুরবাড়ি’ চলে যাওয়ার দিন। হঠাৎই আটবছর আগে ছেড়ে যাওয়া সেই খেলা ভাঙার বাঁশি বেজে ওঠে। দীর্ঘ কারাবাসের অমানুষিক পরিশ্রমে বিশাল দেহী রহমতের স্বাস্থ্য তখন ভেঙে গেছে, শিশু বয়স পেরিয়ে তখন মিনিও বয়ঃসন্ধির চৌকাঠে পা রেখেছে। চোদ্দ বছর বয়সী এখনকার মিনি তখন জানে, বোঝে শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার অর্থ। তাই তো কাবুলিওয়ালার চিরপরিচিত ‘খোঁকী তুই সোসুরবাড়ি যাবিস!’-এর উত্তরে সলজ্জ্ব সেই মিনি মুখ নীচু করে ঘরে চলে যায়। আর রহমত ভাবে, মিনি তাকে চিনতে পারল না। স্বদেশ কাবুলে তার নিজের মেয়েও কি এতদিনের অদর্শনে তার বাবা রহমতকে চিনতে পারবে!
পণ্ডিত রবিশঙ্করের সংগীত পরিচালনায় অদ্ভুত একটা তবলা সঙ্গতে বাঁশির সুরে, সমান্তরাল রেলপথ পেরিয়ে ঊষর মরূতে মুখটি তুলে চলা উটের গতিতে শেষ হয় রবীন্দ্রনাথের তিনপাতার গল্প অবলম্বনে তৈরি ১১৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছায়াছবি। মিনির নিজের বাবা আর কাবুলিওয়ালা রহমতের পিতৃস্নেহে কোনো ছোটো-বড়ো ভেদ থাকার কথা নয়। থাকেওনি তা, মূল গল্পে কিংবা সিনেমায়। তাই মিনির বাবা মিনির বিয়ে উপলক্ষ্যে ঝলমলে আলো আর গড়ের বাদ্যির আয়োজনের জন্য বরাদ্দ টাকাটা, রহমতের হাতে কাবুলে তার নিজের মেয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য তুলে দিতে পেরে যেমন মিনির ভাবী জীবনটা মঙ্গলধ্বনিতে ভরিয়ে দিতে পেরেছিল, সিনেমা শেষের ওই অদ্ভুত বাঁশির আওয়াজটাও ছিল তেমনই প্রত্যয়ী, তেমনই ইতিবাচক। যা বলার অপেক্ষা রাখেনি, যতই জীবন পেরিয়ে যাক শত শতদিনের পার, মেয়ে ঠিক চিনে নেবে তার পিতাকে।
‘ফিরে আসবই’ — জীবনের প্রয়োজনে পরিযায়ী মানুষ তার আত্মীয়, বন্ধু, ভালোবাসাকে ছেড়ে আসে এই চরম আশা নিয়ে। তবু, সময় ও পরিস্থিতির অমোঘ ছলচাতুরীতেই সেই ফেরার সুযোগ সকলে পায় না। কারোর ভাগ্যে অবশ্য নানা বিপর্যয়ের পরে সেই সুযোগ কখনও আসে। যেমন রহমত। মেয়ের সঙ্গে তার কেমন দেখা হয়েছিল তা জানতে না পারলেও, বাড়ির পথে এই ফেরার যাত্রাটুকু সে করতে পেরেছিল এটুকু নিশ্চিন্তি নিয়ে শেষ হয় ‘কাবুলিওয়ালা’। আর এইটুকু নিশ্চিন্তিই, এই সময়ে এ গল্প পাঠ বা সিনেমা দেখা শেষে মনটাকে ভারাক্রান্ত করে তুলছে আরও বেশি করে। মন জুড়ে বসে, আজও কলকাতার অলিতে গলিতে জোব্বা -জ্যাকেট, মাথায় পাগড়ি পরা, ফল বা সুগন্ধি বা আরও অন্যকিছু সওদা করে চলা এসময়ের কাবুলিওয়ালারা। পাঁচ, দশ, পনেরো বা আরও আরও বেশি বছর আগে যারা কাবুল থেকে পশ্চিমবাংলায় এসেছিল, কোনো একদিন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে নিজেদের প্রিয়জনদের কাছে ফিরবেন বলে। ভবিষ্যৎ সময়ের ওপরেই নির্ভর করছে এখন যাদের ‘ফিরে যাওয়ার’ আখ্যান।
