ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও আফগান ফেরিওয়ালাদের দেখা যেত কলকাতা রাস্তায়
আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও আফগান ফেরিওয়ালাদের দেখা যেত কলকাতা রাস্তায়। সে সময়ে মধ্যবিত্ত বাড়ির কিশোর-কিশোরীরা প্রায় সবাই রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ পড়ত, রাস্তা দিয়ে হেঁকে যাওয়া আফগান দেশের মানুষের প্রতি সদ্য কৈশোরপ্রাপ্তদের পাশাপাশি বয়স্কদেরও ছিল কেমন যেন করুণ মমতা। পোশাক-আশাক প্রায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা মতোই, ‘ময়লা ঢিলা কাপড় পরা, পাগড়ি মাথায়, ঝুলি ঘাড়ে, হাতে গোটা দুই-চার আঙুরের বাক্স, এক লম্বা কাবুলিওয়ালা মৃদুমন্দ গমনে পথ যাইতেছিল…’
এই আফগানের প্রাণের গভীরে ছিল তাঁর শিশুকন্যার প্রতি এক অতলান্ত অপত্য স্নেহ, কিন্তু পাওনা আদায় করতে গিয়ে সে এমন দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে, যে তাঁর কয়েক বছরের কারাবাসের দণ্ড হয়। জেল থেকে ফিরে সেই কাবুলিওয়ালা রহমত ছোট্ট কন্যা মিনি-কে আবার দেখতে এসে আবিষ্কার করে, সেই মেয়ে আর তত ছোটো নেই, পরন্তু তার বিয়ে হবে সেই দিনেই। আফগান রহমত-এর চোখে আশা-আশঙ্কার আলো-ছায়া —
‘বাবু, তোমার যেমন একটি লড়কী আছে, তেমনি দেশে আমারও একটি লড়কী আছে। আমি তাহারই মুখখানি স্মরণ করিয়া তোমার খোঁখীর জন্য কিছু কিছু মেওয়া হাতে লইয়া আসি, আমি তো সওদা করিতে আসি না।’
তপন সিনহার কাবুলিওয়ালা চলচ্চিত্র
কোন সুদূরে কেমন পাহাড়ি জায়গায় রহমত-এর কন্যাটিও ইতিমধ্যে বড়ো হয়ে উঠেছে হয়তো, কী জানি, তার হয়তো বিয়েও হয়ে গেছে, রহমত দেশে ফিরে সেই শিশুকে আর কোনোদিনই ফিরে পাবে না, কেননা সময় গড়িয়ে গেছে বছর-বছর।
১৮৯৯ সালের অগ্রহায়ণ মাসে লেখা এই ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পেই রবীন্দ্রনাথ সময়ের সাক্ষ্য রেখে একটি লাইন লিখেছিলেন, ‘আবদর রহমান, রুস, ইংরেজ প্রভৃতিকে লইয়া সীমান্তরক্ষানীতি সম্বন্ধে গল্প চলিতে লাগিল।’ এই আবদর রহমান ছিলেন আফগানিস্তানের শাসক। ১৮৮০ থেকে ১৯০১ সালে মৃত্যু পর্যন্ত আবদর বা আবদুর ছিলেন সেই পাহাড়ি দেশের আমির। সেসব কতকাল আগের কথা। ব্রিটিশরা বারবার দখলে নেওয়া চেষ্টা করেছে আফগানিস্তান, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি।
ভারত স্বাধীন হবার তিন দশক আগেই আফগানিস্তান ব্রিটিশ কবলমুক্ত হয়েছিল। ১৯১৯ সালের ৩ মে শুরু হয়েছিল তৃতীয় ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে এই যুদ্ধে কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী সুবিধা করতে পারেনি। কয়েক মাস যুদ্ধের পরে একটা চুক্তি হয়েছিল। এরপরে আফগান এলাকায় ব্রিটিশ কর্তৃত্ব ক্রমশই কমতে থাকে, ১৯২১ সাল নাগাদ সে দেশ পুরোপুরি স্বাধীন বলেই গণ্য হতে থাকে। তবে একটানা শান্তি আফগান জনতা পায়নি। পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, খাদ, ভয়ংকর সুন্দর উচ্ছল নদী আর হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাসে লাগাতার চলেছে ভাঙা-গড়া। গত শতকের মাঝামাঝি সেই ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়াতেই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়েছিল। সে সময়ে ঠান্ডা যুদ্ধের পরিবেশে সোভিয়েতকে কোণঠাসা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দেশগুলি মদত দিয়েছিল মুসলিম মৌলবাদী শক্তি মুজাহিদিনকে। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন আফগান শাসক দাউদ খানকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা হয়, সে দেশের দখল নেয় কর্নেল আব্দুল কাদিরের নেতৃত্বাধীন আর্মড ফোর্সেস রেভলিউশনারি কাউন্সিল। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নুর মহম্মদ তারাকি। এই তারাকি সে সময়ের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আফগানিস্তানের মৈত্রী দৃঢ় করেছিলেন। তারাকিকে ক্ষমতা থেকে হটাতে মার্কিন-ব্রিটিশ মদতপুষ্ট মুজাহিদিনরা বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহ ঠেকাতে সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগান সরকারকে মদত দিয়েছিল।
কলকাতায় আফগান সম্প্রদায়
১৯৭৯ সালে তারাকি খুন হয়ে যান, তাঁরই সরকারের বিদেশমন্ত্রী হাফিজুল্লা আমিন ক্ষমতা দখল করেন। হাফিজুল্লাকেও অল্পদিনের মধ্যে খুন করা হয় এবং বাবরাক কামাল ক্ষমতায় বসেন। ওই সময় থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-সহ পশ্চিমি শক্তি মুজাহিদিনকে সবরকম সমর্থন, টাকা-পয়সা জোগানো, অস্ত্র সরবরাহ করা শুরু করে। পাকিস্তান, ইরান প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশগুলিতে মুজাহিদিনরা ঘাঁটি গেড়ে সোভিয়েতপন্থী সরকারের তথা সোভিয়েত সেনাদের উপর হামলা চালাতে থাকে। এহেন অবস্থা চলে প্রায় এক দশক জুড়ে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে চলে যায়। পাঠকের হয়তো মনে পড়বে, ওই ১৯৮৯ সালেই খোদ রাশিয়ার অভ্যন্তরে চলছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ভেঙে পড়ছে কমিউনিস্ট শাসন। তৎকালীন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গোর্বাচভের হাত ধরে সে দেশে বইছিল উদারবাদী মুক্তির তাজা বাতাস।
কলকাতায় আফগান সম্প্রদায়
আফগান মাটি থেকে সোভিয়েত বাহিনী চলে যাবার পর শেষ সোভিয়েতপন্থী আফগান রাষ্ট্রনেতা নাজিবুল্লাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে মুজাহিদিনরা। তীব্র লড়াই চলে প্রায় দু’বছর। অবশেষে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে নাজিবুল্লা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন, কয়েক বছর পরে তাঁকে প্রকাশ্যে হত্যাও করা হয়। এভাবেই আফগান মাটিকে সোভিয়েত প্রভাব-মুক্ত করার মার্কিন প্রকল্পটি সাফল্যের মুখ দেখেছিল। কিন্তু মূল্য হিসেবে দিতে হয়েছিল মৌলবাদীদের অবাধ বাড়বাড়ন্তকে মেনে নেবার লাইসেন্স।
মুজাহিদিনরা সোভিয়েত পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের তালিবান হিসেবে পুনঃসংগঠিত করে। তালিবানরা অবশ্য মার্কিন খবরদারি বেশিদিন সহ্য করেনি। নিজেদের মতো করে মধ্যযুগীয় বর্বরতার শৃঙ্খলে তারা বেঁধেছিল আফগান জনতাকে, যেমন, মহিলাদের শিক্ষা, বাড়ির বাইরে কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, পুরুষ সঙ্গী ছাড়া মহিলাদের বাড়ির বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ করা, এক বিশেষ ধরনের অত্যন্ত গোঁড়ামিপূর্ণ ইসলামি মত ছাড়া অন্য ধর্মমতকে গ্রাহ্য না করা, মূর্তি গড়া তথা শিল্পকর্ম ও আধুনিক শিল্পের তীব্র বিরোধিতা করা ইত্যাদি। এমনকী হাজার বছরের পুরোনো ভাস্কর্য কামান দেগে উড়িয়ে দেওয়া, যেমন বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি। পশ্চিমি সভ্যতার গণতন্ত্রকামী আধুনিকতাবাদী মনোভাব তালিবানিরা সহ্য করতে পারেনি। এরই পরিণতিতে আফগান মাটিতে গেড়ে বসা তালিবানিদের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৫-৯৬ সাল নাগাদ এক সুদর্শন, শ্মশ্রু-গুম্ফ-ধারী দীর্ঘদেহী যুবক আফগান-তালিবানদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই মানুষটির নাম ওসামা বিন লাদেন।
কলকাতায় আফগান সম্প্রদায়
বছর পাঁচেক পরে ২০০১ সালে লাদেনের অনুগামীরা মার্কিন দেশের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটাই ছিল মার্কিন মাটিতে বৃহত্তম হামলার ঘটনা। এই সময় থেকে আফগান রাজনীতি এক নয়া পর্বে প্রবেশ করে। সেটা ছিল আফগান মাটিতে সরাসরি মার্কিন-ব্রিটিশ সেনাদের ঘাঁটি গাড়া, এবং সে দেশ জুড়ে তালিবান বনাম মার্কিন সেনার তথা মার্কিন মদতপুষ্ট আফগান সরকারের সেনাদের সংঘর্ষ। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে মার্কিনিরা। এই সংঘর্ষে প্রায় ১৫ বছর তালিবানিরা তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। কিন্তু ২০১৪-১৫ সাল থেকে পরিস্থিতির মধ্যে ধীর পরিবর্তন দেখা যায়। কাকতালীয় হলেও এই সময়টাতেই ভারতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি। তালিবানদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায় প্রতিদিন নিহত মার্কিন সেনাদের কফিন উড়ে যেত নানা মার্কিন শহর ও গ্রামে। জলের মতো খরচা হচ্ছিল ডলার। একটানা এই মৃত্যু আর করের টাকা খরচ মার্কিন নাগরিকদের আফগান যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাব তৈরি করে। মার্কিন-ব্রিটিশ সেনা আফগান মাটি ছাড়লে যে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা বুঝতে বড়ো বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন হয় না। প্রশ্নটা ভারতের পক্ষেও যথেষ্ট অস্বস্তির হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মোদি সরকার সে বিষয়ে কিছুই করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হলো, ভারতে ক্ষমতাসীন এই হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির নৈতিক প্রভাব ছিল না আফগান জনগণের উপর। অনেকেই মনে করেন, এই পর্বে যদি কংগ্রেস ভারত সরকারের নেতৃত্বে থাকত, তাহলে ভারতের এহেন করুণ অবস্থা না-ও হতে পারত। সেক্ষেত্রে আফগান রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব অনেক বেশি হতে পারত।
আফগান দেশে একটানা শান্তি কমই চলেছে। মাঝেমধ্যে কিছুদিন স্থায়ী শাসনের তাল-লয় ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে। অপার্থিব সুন্দর আফগান পাহাড়ে ঝরনায় নদীতে লেগেছে রক্তের ছোপ। সেই অনিশ্চয়তা ধরা পড়েছে বাংলা সাহিত্যে। সৈয়দ মুজতবা আলী-র লেখা অনুপম ভ্রমণকাহিনি ‘দেশে বিদেশে’ তেমনই কথা জানা যায় কোনো রাখঢাক ছাড়াই। ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত বইটিতে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন —
‘পৃথিবীর আর সব দেশে যেতে হলে একখানা পাসপোর্ট যোগাড় করে যে কোনো বন্দরে গিয়ে হাজির হলেই হল। আফগানিস্থান যেতে হলে সেটি হবার যো নেই। পেশওয়ার পৌঁছে আবার নূতন স্ট্যাম্পের প্রয়োজন। সে-ও আবার তিন দিন পরে নাকচ হয়ে যায়। খাইবারপাসের আশেপাশে কখন যে দাঙ্গাহাঙ্গামা লেগে যায় তার স্থিরতা নেই বলেই এই বন্দোবস্ত। আবার এই তিন দিনের মিয়াদি স্ট্যাম্প সত্ত্বেও হয়ত খাইবারের মুখ থেকে মোটর ফিরিয়ে দিতে পারে — যদি ইতিমধ্যে কোনো বখেড়া লেগে গিয়ে থাকে।’