
আজ থেকে ৭৫ বছর আগে জাতীয় পতাকার মর্যাদা পায় তেরঙ্গা
যেভাবে তড়িঘড়ি ভারত ছাড়ে ব্রিটিশ শাসকদল, দেশভাগ এবং স্বাধীনতা ঘোষণার যে অসম্ভব সময়সীমা বেঁধে দেন বিদায়ী বড়োলাট লুই মাউন্টব্যাটেন, তাতে করে আদৌ যে সেই সময়ের মধ্যে আমাদের জাতীয় পতাকার কথা ভাবতে পেরেছিলেন তৎকালীন নেতৃত্ব, সেটাই আশ্চর্যের। তবে আজ থেকে ঠিক ৭৫ বছর আগে আজকের দিনেই তাড়াহুড়োয় গঠিত সংবিধান সভায় জাতীয় পতাকা হিসেবে ভারতের তেরঙ্গা পেশ করেন জওহরলাল নেহরু, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অতএব খোদ সরকারের তরফে সেই জাতীয় পতাকার অবমাননার প্রসঙ্গ আলোচনা করার পক্ষে আজকের চেয়ে ভালো দিন আর কী হতে পারে? তবে সেই বিষয়ে একটু পরে আসছি।
নবনির্মিত পতাকা কমিটির তরফে ১৯৪৭ সালের ১৪ জুলাই সুপারিশ করা হয়, কংগ্রেসের পতাকাই একটু এদিক-ওদিক করে জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করা হোক। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বলতে পতাকার মাঝখানে চরকার বদলে অশোকচক্রের উপস্থিতি, ধর্ম এবং আইনের প্রতীক স্বরূপ। এই পরিবর্তনে সম্ভবত সবচেয়ে অখুশি হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধি স্বয়ং, তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।
বিষয়বস্তুতে ফেরা যাক। এ বছর ভারতের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার হীরক জয়ন্তী। পাশাপাশি ভারতের তথা বাংলার অন্যতম শ্রদ্ধেয় স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীও বটে। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি ধুমধাম করে নেতাজির জন্মদিনকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। এবং সেই উপলক্ষ্যেই কলকাতার ‘ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট মিন্ট’ অর্থাৎ সরকারি টাঁকশাল থেকে বেরোয় ১২৫ টাকার একটি বিশেষ স্মারক মুদ্রা।
তাহলে গোলমালটা কোথায়? গোলমাল এই যে ওই স্মারক মুদ্রার সঙ্গে যে পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে নেতাজির ছবির পাশাপাশি রয়েছে আরও একটি ছবি, যা দেখলে মনে হবে ভারতের পতাকা উত্তোলন করছেন একদল সৈনিক। নেতাজি এবং ভারতীয় পতাকাকে অপমান করার অপরাধে যে ছবি অবিলম্বে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। সোজা কথায়, ছবিটা জাল। এবং বড্ড বেশিদিন ধরে আসল বলে চালানো হয়ে আসছে।
‘রেইজিং দ্য ফ্ল্যাগ অন ইয়ো জিমা’, ১৯৪৫ সালে জো রোজেনথাল-এর তোলা ছবি
এই লেখার শুরুতে যে ছবিটি দেখছেন, তা স্পষ্টতই ফোটোশপের সৃষ্টি, যেখানে ভারতের পতাকাকে জোর করে ঢোকানো হয়েছে। মূল ছবিটি ১৯৪৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তুলেছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর চিত্রগ্রাহক জো রোজেনথাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকা ও জাপানের মধ্যে ইয়ো জিমার যুদ্ধের শেষের দিকে। ছবিতে দেখা যায়, সুরিবাচি পাহাড়ের চূড়ায় আমেরিকার পতাকা উত্তোলন করছেন ছয়জন আমেরিকান মেরিন। সেদিনের পর থেকে হাজার হাজার বার প্রকাশিত হয়েছে পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী এই ছবি, বিশ্বযুদ্ধের স্মরণীয় মুহূর্তগুলির একটি হিসেবে লাভ করেছে অমরত্ব।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস-এর আমন্ত্রণপত্র, ২০২১
ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট মিন্ট-এর পুস্তিকায় যে ছবি, তাতে দেখাই যাচ্ছে যে মার্কিন পতাকার বদলে সৈনিকদের হাতে রয়েছে ভারতীয় পতাকা, যদিও ছবিতে আর কোনও পরিবর্তন নেই। কলকাতার বিশিষ্ট পতাকা বিশেষজ্ঞ (vexillologist) শেখর চক্রবর্তী যোগ করেন, “ছবির আর সব সাদাকালো, কিন্তু ভারতীয় পতাকাটি রঙিন, যা বেশ অদ্ভুত দেখতে লাগে।”
ইন্ডিয়া পোস্ট-এর পুস্তিকা, ২০১৮
এই ‘মর্ফ’ করা ছবি যে ঠিক কে কবে বাজারে ছেড়েছিল জানা নেই, তবে সম্ভবত ২০১১-য় এটি প্রথম সর্বসমক্ষে আসে। হয়তো তামাশা করেই এটি বানিয়েছিলেন কোনও অনামি নেট নাগরিক, কিন্তু অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে তা আজ নানা সরকারি প্রকাশনা এবং ভারত সরকারের নিজস্ব বিজ্ঞাপন সংস্থার তৈরি বিজ্ঞাপনেও স্থান পেয়েছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, এই চুরি করা ছবি ব্যবহৃত হয়েছে নানা জায়গায়, যেমন ২০১৮ সালে আয়কর বিভাগের একটি বিজ্ঞাপনে, অথবা চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কলকাতার ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR)-এর নেতাজি বিষয়ক প্রদর্শনীর আমন্ত্রণপত্রে, অথবা ডালিয়া রায় রচিত বাংলার বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা ২০১৬ সালের একটি বইয়ের মলাটে, অথবা ২০১৫ সালে কলকাতার এক প্রখ্যাত ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে, অথবা আন্দামানে নেতাজির জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ৭৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের চিফ পোস্টমাস্টার জেনারেল দ্বারা প্রকাশিত একটি পুস্তিকায়।
গোয়ার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে হেরাল্ড পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, ২০১১
আগেই বলেছি, ২০১১ সালে সম্ভবত প্রথম দেখা দেয় এই ছবি, ১৯৬১ সালে ভারত দ্বারা পর্তুগিজদের কাছ থেকে গোয়া অধিগ্রহণের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘হেরাল্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক বিজ্ঞাপনে। গত দশ বছরে যে এই ছবিতে সরকারি সীলমোহর পড়ে গেছে, তা যেমন হাস্যকর, তেমনই দুঃখজনক। ভারতে কি জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানানোর উপায়ের এতই অভাব যে অন্য দেশের বিখ্যাত ছবি আমাদের ‘ধার’ করতে হবে? সরকারে কি এমন কেউই নেই, যিনি ইয়ো জিমার যুদ্ধের এই স্মরণীয় ছবিটি আগে দেখেছেন? আসল নকলের প্রভেদ বুঝে এবার কি এই ছবিটিকে চিরদিনের মতো বর্জন করার সময় আসেনি?
