কোন্নগরের মল্লিক সুইটস এখনও তিলকূট বানায়
বাংলার মিষ্টি মানচিত্রে অন্যতম উজ্জ্বল জেলা হল গঙ্গাতীরের হুগলি। এ জেলা যেমন ভীম নাগ, ভোলা ময়রা, নকুড়, ফেলু মোদক, সূর্য মোদক, নলীনচন্দ্র দাসের মতো খ্যাতনামা মিষ্টি স্রষ্টাদের জন্মভূমি; তেমনই এ জেলার মাটিতেই জন্মেছে মনোহরা, গুটকে সন্দেশ, গুপো, জলভরার মতো জগৎজয়ী মিষ্টি। তবে এই জেলার একটি মিষ্টি অধুনা অবলুপ্তির পথে – তিলকূট। অনেকে বলেন, তিলকূটো। এই মিষ্টির জন্মস্থান হুগলি জেলার কোন্নগর।
এককালে কোন্নগরের তিলকুট কলকাতাবাসীদের মন জয় করেছিল। উনিশ ও বিশ শতকে শহরের একাধিক ভোজসভায় অতিথিদের পাতে পড়ত তিলকূট। স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখাতেও তিলকূটের উল্লেখ রয়েছে। এখন গোটা কোন্নগরের একটি বা দুটি দোকানে তিলকুট পাওয়া যায়। ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়ে বোঝা গিয়েছে, মিষ্টির বয়স কোনও মতেই দেড়শো বছরের বেশি হবে না। মহেন্দ্রনাথ দত্তের ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা’ বই অনুযায়ী, আনুমানিক ১৮৭৩-৭৪ সালের মধ্যে কোন্নগরে তিলকুটের জন্ম। অর্থাৎ শ-দেড়েক বছরের পুরোনো মিষ্টি তিলকূট।

কোন্নগর পুরসভা কিন্তু একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে তিলকূটকে বাঁচিয়ে রাখতে। কোন্নগর বইমেলায় পুরসভার তরফে স্টল দিয়ে তিলকূট বিক্রি করা হয়।
কোন্নগরের মল্লিক সুইটস এখনও তিলকূট বানায়। ১৯৫৩ সালে দোকানটি শুরু হয়েছিল জনৈক মদনদার হাত ধরে। দোকানটি মদনদার দোকান নামেও খ্যাত। কোন্নগর ফেরিঘাট থেকে সোজা যে রাস্তা চলে গিয়েছে, সেই রাস্তা বরাবর মিনিট পাঁচেক হাঁটলে দেখা মিলবে মদনদার দোকানের। সেখানে গেলে মনে হয় সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। কাঠের শোকেসে মিষ্টি সাজানো। ঝুড়িতে সিঙারা, শালপাতায় ঢাকা দেওয়া। মিষ্টি প্রায় সবই সাবেকি… ছানার মিষ্টি, কড়া পাক ও নরম পাকের সন্দেশ, গজা ইত্যাদি।
এখন দোকানটি সামলান মদনদার কন্যা ও তাঁর স্বামী হিন্দোল বিশ্বাস। হিন্দোলবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “এখন শনি ও রবিবার তিলকূট বানানো হয়। বর্ষা বাদ দিয়ে মোটামুটি সারা বছরই তিলকুট পাওয়া যায়।” তাঁর কাছেই শোনা, তিল, ক্ষীর আর চিনির রসের মিশ্রণে তৈরি হয় এই মিষ্টি। গোলাকার চাকতির মতো তার গড়ন, গোত্রে সন্দেশ। অনুমান করা যায়, তিল বেটে বা কুটে ক্ষীরের সঙ্গে মেলানো হয় বলেই নাম তিলকূট।
তিনিই বললেন, “এলাকার পুরোনো মানুষেরা এখনও তিলকূট খোঁজেন। নানা জায়গা থেকে অর্ডার আসে। কলকাতা থেকেও অর্ডার আসে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তিলকূট নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই। এই প্রজন্মের কারিগরদের অনেকে জানেন না কীভাবে তিলকুট বানাতে হয়।” প্রতি পিস তিলকূটের দাম সাত টাকা। তবে অর্ডারে দশ টাকা দামের তিলকূটও বানান হিন্দোলবাবুরা। বলছিলেন, “আকারে বেশি বড়ো তিলকূট বানানো যায় না। বেশি বড়ো করলেই ফেটে যাবে মাঝখানটা।” প্রথম থেকেই মদনদার দোকানে (মল্লিক সুইটস) তিলকূট তৈরি হচ্ছে। প্রায় সত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও তা বন্ধ হয়নি।

এককালে কোন্নগরের তিলকূট কলকাতাবাসীদের মন জয় করেছিল। উনিশ ও বিশ শতকে শহরের একাধিক ভোজসভায় অতিথিদের পাতে পড়ত তিলকুট। স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখাতেও তিলকূটের উল্লেখ রয়েছে।
হিন্দোলবাবু ভানুপ্রসাদ নন্দীর কথা জানালেন। তাঁর মতে, ভানু নন্দীর হাতেই নাকি তিলকূটের জন্ম। ভানু নন্দী আর বেঁচে নেই। ঠিকানা জেনে তাঁর দৌহিত্রের ইলেকট্রিকের দোকানে যাওয়া হল। সৌনক দে-র সঙ্গে কথা হল। বললেন, “দাদুর হাতের বানানো বেলের মোরব্বা আমি খেয়েছি কিন্তু তিলকুট খাওয়া হয়নি।” ভানু নন্দী ছিলেন নেশায় ময়রা। ভালোবাসা থেকেই তিনি তিলকূট বানিয়ে বিক্রি করতেন। বাড়ির সামনে যেখানে তিনি বিক্রি করতেন, সে জায়গাটাও দেখালেন সৌনক। সৌনকের বাবা কৃষ্ণপ্রসাদ দে বলেন, ভানু নন্দী ট্রাম কোম্পানিতে চাকরি করতেন আর কর্মস্থল থেকে ফিরে মিষ্টি বানাতে বসতেন। বড়োবাজার থেকে কালো তিল কিনে এনে তা শুকিয়ে, খোসা ছাড়িয়ে বাটতেন তারপর ক্ষীরের সঙ্গে পাক দিয়ে তিলকূট বানাতেন। মাঝখানে একটি কিশমিশ বসিয়ে দিতেন। (কোন্নগরে এখন অবশ্য সাদা তিল থেকেই তিলকূট তৈরি হচ্ছে।) বেলের মোরব্বা, খইয়ের মুড়কি আর তিলকুট, তাঁর হাতে এই তিন জিনিস ছিল বিখ্যাত। (কৃষ্ণপ্রসাদ দে-র কথায় তিলকূটো) এমনকি বাড়িতে বাড়িতে ভিয়েনে গিয়েও তিনি মিষ্টি বানিয়েছেন। তাঁর উত্তরসূরিরা কিছু দিন ব্যবসা করলেও, সে ব্যবসা স্থায়ী হয়নি। ভানু নন্দীর দোকানের আজ আর অস্তিত্ব নেই। তবে মল্লিক সুইটস আজও বাঁচিয়ে রেখেছে তিলকূটকে।
আরও পড়ুন: শীতে মন ভোলানো জয়নগরের মোয়া
এক সময় তিলকূটের বেশ নামডাক ছিল। আজ তা অনেকটাই ম্লান। অনেকে জানেনও না। তবে কোন্নগর পুরসভা কিন্তু একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে তিলকূটকে বাঁচিয়ে রাখতে। কোন্নগর বইমেলায় পুরসভার তরফে স্টল দিয়ে তিলকূট বিক্রি করা হয়। কোন্নগর বইমেলায় প্রচুর মানুষ আসেন। তাঁরা তিলকূট কিনে নিয়ে যান, এতে তিলকূটের প্রচার ও প্রসার দুই-ই হচ্ছে। বহু মানুষ প্রাচীন বাংলার এই নিজস্ব মিষ্টির কথা জানতে পারছেন। সেই স্বাদ চেখে দেখতে পারছেন। এলাকার প্রবীণদের চাহিদার জেরে সপ্তাহান্তে একবার হলেও তিলকূট তৈরি হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে তিলকূটের জনপ্রিয়তা না তৈরি হলে; এ মিষ্টি অবলুপ্তির পথেই এগিয়ে যাবে।