শীতে মন ভোলানো জয়নগরের মোয়া

বাংলার গৌরবময় অতীতের সঙ্গে জুড়ে আছে জয়নগর

“Let us save what remains: not by vaults and locks which fence them from the public eye and use in consigning them to the waste of time, but by such a multiplication of copies, as shall place them beyond the reach of accident.”
― Thomas Jefferson

শীত এসে গিয়েছে দক্ষিণবঙ্গে। জয়নগরের মোয়া ছাড়া বাঙালির শীত অসম্পূর্ণ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক ছোট্ট শহর তার মোয়ার জন্য বিশ্বখ্যাত। অবশ্য জয়নগরের নাম করে অনেক জায়গাতেই নকল মোয়া বিক্রি হয়। আজকাল প্রায় সব মিষ্টির দোকানে ‘জয়নগরের মোয়া’ পাওয়া যায়, বেশিরভাগই স্থানীয় উদ্যোগে বানানো। কলকাতা থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে জয়নগরের বহরু আসল মোয়া তৈরির জন্য সম্প্রতি পেয়েছে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) স্বীকৃতি। খাবারটির মৌলিকতা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার পুর এলাকা জয়নগর মজিলপুর বেশ প্রাচীন জনপদ। স্থানীয় লোকজনের পূজিতা দেবী জয়চণ্ডীর থেকে জায়গার নামটি এসেছে। প্রথমে জয়চণ্ডীনগর, তারপর কালক্রমে জয়নগর। শোনা যায়, প্রথম এখানে বসতি গড়ে তোলেন বাগবাজারের প্রখ্যাত মতিলাল বংশের পূর্বপুরুষ গুণানন্দ মতিলাল। ১৭ শতকে নদীপথে যাওয়ার সময়ে বহড়ুর এক গাছতলায় রাত্রিবেলা তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। স্বপ্নে দেবী জয়চণ্ডী দেখা দিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠার আদেশ দেন। মতিলাল পরিবার বসবাস শুরু করে সেখানেই। এরপর সেন পরিবার এবং বড়িশার মিত্র পরিবারও বসতি করে। মিত্রদের প্রতিষ্ঠা করা রাধাবল্লভ মন্দিরে পুজো হয় আজও।

প্রাচীন যুগ থেকে ১৬ শতকের মধ্যে ভাগীরথীর পুরোনো গতিপথের ধারে জয়নগরে সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে উঠেছিল। ১৪৯৫ সাল নাগাদ ‘মনসাবিজয়’ কাব্য রচনা করেন বিপ্রদাস পিপলাই। তাঁর লেখায় এই জায়গার উল্লেখ রয়েছে। কাব্যের বণিক চরিত্র চাঁদ সদাগর ভাগীরথী নদী দিয়ে কালীঘাট হয়ে বারুইপুর পৌঁছন। নৌকো করে পুরী যাওয়ার সময় চৈতন্যদেবও (১৪৮৬-১৫৩৪) এই পথ দিয়ে গিয়েছেন। 

বাংলার গৌরবময় অতীতের সঙ্গে জুড়ে আছে জয়নগর। যশোরের স্বাধীন রাজা প্রতাপাধিত্য মুঘলদের হাতে পরাজিত হলে তাঁর দেওয়ান এবং পুরোহিত পরিবার পালিয়ে জয়নগর চলে আসেন। এখানে দত্তদের ভূসম্পত্তি গড়ে ওঠে। ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রীকৃষ্ণ উদগাতা যেখানে বসতি স্থাপন করেন, সেই জায়গায় এখন ভট্টাচার্য পাড়া। জয়নগরের ভট্টাচার্যরা তাঁরই বংশধর। 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান নন্দকুমার বসু ছিলেন বহরু গ্রামের জমিদার। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শ্যামসুন্দর মন্দিরের নাম ছড়িয়ে পড়েছে অপরূপ স্থাপত্য এবং দেওয়ালের নকশার জন্য। মহাদেব শিব এবং ধর্মরাজের মন্দিরও রয়েছে। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের আদি বাসস্থান জয়নগর।

ব্রিটিশ আমলে বিপ্লবী আন্দোলন এখানেও দানা বেঁধেছিল। ঐতিহাসিক এই শহরে বেড়ে উঠেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামী কানাইলাল ভট্টাচার্য। এছাড়া পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, ডাঃ নীলরতন সরকার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, ডঃ বিমলকৃষ্ণ মতিলাল, সংগীতশিল্পী নির্মলা মিশ্র প্রভৃতি বরেণ্য মানুষেরা এখানকারই সন্তান। 

মোয়ার জন্য জয়নগর এখন ব্র্যান্ড নেম। সারা পৃথিবীর বাঙালিদের প্রিয় খাবার। মোয়া তৈরি করতে নলেন গুড় আর কনকচুর ধানের খইয়ের সঙ্গে খোয়া ক্ষীর, এলাচ, পেস্তা, কাজু, কিশমিশ ও গাওয়া ঘি মেশাতে হয় সঠিক মাপে। মুখে দিলে গলে যায় মোয়া – সে এক জাদু। 

শীতকালে বাংলায় মিষ্টি খাওয়ার ধূম পড়ে। বাতাসে নলেন গুড়ের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। ফেরিওয়ালারা জেলায় জেলায় এমনকি বাংলার বাইরেও ‘আসল জয়নগরের মোয়া’ নিয়ে হাজির হন। পাড়ার মিষ্টির দোকান, রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাস – নানা জায়গায় বিক্রি হয় ‘জয়নগরের মোয়া’। এত নামডাক কীসের জন্য?

জয়নগরের মোয়া তৈরি সহজ নয়। কাজ শুরু হয় খেজুরের রস সংগ্রহ থেকে। শীতের আগে খেজুর গাছের ডালপালা খানিক ছেঁটে কাণ্ডের একটা অংশ ছেঁচে রাখেন শিউলিরা। কিছুদিন পর ওখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় রস বেরোনোর নল। নতুন হাঁড়ি চুন-জলে ধুয়ে সূর্য ডোবার আগে নলের তলায় রেখে আসতে হয়। সারা রাত ধরে খেজুরের রস জমা হয় হাঁড়িতে। ভোরে হাঁড়ি নামিয়ে আনা হয়। রস ভালো করে ফুটিয়ে তৈরি হয় নলেন গুড়। 

সুগন্ধি ধান কনকচুর চাষ করেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার কৃষকরা। জয়নগরের আশেপাশে কয়েকটি মাত্র জায়গায় সেটির উৎপাদন হয়। তার থেকে বানানো খইয়ের স্বাদ অন্য খইয়ের সঙ্গে মিলবে না। নলেন গুড় আর কনকচুর খইয়ের মিশ্রণে তৈরি জয়নগরের মোয়া তাই হয়ে ওঠে অনন্য। 
 

Developed by DXDasia