গঙ্গাসাগর মেলায় হারিয়ে যাওয়া পুণ্যার্থীদের বাড়ি ফিরিয়ে দিচ্ছে হ্যাম রেডিও

এই মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারা যায়

“সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার” — গঙ্গাসাগর মেলা নিয়ে এই প্রবাদ বহু পুরোনো। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির সময় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগরদ্বীপ হয়ে ওঠে ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র সংস্করণ, যেখানে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন। কুম্ভমেলার পর গঙ্গাসাগর মেলাই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় মেলা। তবুও এই মেলাকে কেন্দ্র করে এমন প্রবাদ প্রচলিত কেন? উত্তরটা মেলে একটু খোঁজ করলেই। গঙ্গাসাগর মেলায় এসে ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া, বাড়ি ফিরতে না পেরে পথের ধারে, প্ল্যাটফর্মে আশ্রয় খুঁজে নেওয়া মানুষের খবর মেলে প্রতিবছরই। পুণ্যস্নানের আশায় রাজ্য বা ভিনরাজ্য থেকে আসা মানুষগুলো নিমেষেই হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন, ঘরছাড়া। হয়তো বা তখন তাদের ঠিকানা হয় কেয়ার অব ফুটপাথ।

তবে গত কয়েকবছরে এই চিত্রের বদল ঘটেছে অনেকটা। আজ হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আবার ফিরতে পারছেন নিজের ঘরে প্রিয়জনদের কাছে। তাদের ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। কি এই হ্যাম রেডিও? হ্যাম রেডিও (Ham Radio) বা অ্যামেচার রেডিও হলো শখের বেতার। এই মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। এই সদস্যপদ ভারত সরকারের অনুমতি সাপেক্ষ। ১২ বছরের ঊর্ধ্বে যে কোনো নাগরিক নির্দিষ্ট পরীক্ষা দিয়ে হ্যাম রেডিওর সদস্য হতে পারেন। বেতার তরঙ্গের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই গঙ্গাসাগর মেলায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের বাড়িতে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। শুধু সাগরমেলাই নয়, যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি অন্যান্য কারণেও পরিবার থেকে হারিয়ে যাওয়া বিচ্ছিন্ন মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের আবার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয় হ্যাম রেডিও।

শখের বেতার মাধ্যমকে হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খোঁজার কাজে ব্যবহার করা হয় কেন? এই প্রসঙ্গে ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব (West Bengal Radio Club)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “বিভিন্ন রকম গবেষণামূলক কাজের জন্য ভারত সরকার হ্যাম রেডিওর লাইসেন্স দেয়। তবে এই প্রথা আমরা ভেঙেছিলাম গঙ্গাসাগর মেলাতেই। আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে প্রশাসনিক স্তরের কাজের জন্য গঙ্গাসাগরে গিয়ে মানুষের এই দুর্দশা চোখে দেখেছি। সেখানে নিজের মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষা না জানা, অক্ষর জ্ঞান শূন্য ধর্মপ্রাণ মানুষরা কপিল মুনির পুজো দিতে আসেন। তখন তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে সারাদিন মাইকিং করে হারানো ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করা হতো। কিন্তু সব জায়গায় মাইকের আওয়াজ সমানভাবে পৌঁছত না। ফলে মেলা শেষে হারানো মানুষের সংখ্যা দাঁড়াতো প্রায় দুশো-আড়াইশো। এরপরে আমরা গঙ্গাসাগর মেলার বিভিন্ন পয়েন্টে হ্যাম রেডিওর স্টেশন ইনস্টল করে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বহু মানুষকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হই। যদিও সেবছর সবাইকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি, খুব অল্প সংখ্যক মানুষ রয়ে গেছিলেন, এভাবেই আমাদের এই কাজে যাত্রা শুরু হয়। এই কাজেও আইনি বাধা এসেছে। তবু সেসব শেষ পর্যন্ত আমরাই শেষ হাসি হেসেছি, রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় উভয় সরকারই আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে।”

হ্যাম রেডিওকে কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। এই সদস্যপদ ভারত সরকারের অনুমতি সাপেক্ষ। ১২ বছরের ঊর্ধ্বে যে কোনো নাগরিক নির্দিষ্ট পরীক্ষা দিয়ে হ্যাম রেডিওর সদস্য হতে পারেন। বেতার তরঙ্গের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই গঙ্গাসাগর মেলায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের বাড়িতে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন হ্যাম রেডিওর সদস্যরা।

 

গঙ্গাসাগর মেলায় কীভাবে কাজ করেন তারা? এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নামখানা,কচুবেড়িয়া সহ সাগরদ্বীপের একাধিক জায়গায় আমাদের বিভিন্ন পয়েন্টে অপারেটরা থাকেন, হ্যাম রেডিওর একটা কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থাকে এবং বহু ভাষা জানা কিছু অপারেটর আমাদের সঙ্গে থাকেন। সবাই মিলে আমরা কাজটা করি, মেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা থাকি। দেশ বা বিদেশ থেকে আসা কোনো পুণ্যার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লেও আমরা তার বাড়ি খুঁজে তার পরিবারের লোকেদের খবর দিই। এইভাবে আমরা কাজটা করি।”

প্রয়োজনে হ্যাম রেডিও অপারেটরদের কীভাবে যোগাযোগ করা যাবে? এই প্রসঙ্গে অম্বরীশবাবু জানান, ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় খোঁজ করলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর পাওয়া যাবে। আর নতুন কেউ হ্যাম রেডিও অপারেটর হতে চাইলে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ওয়েবসাইটে গিয়ে পরীক্ষার এবং তার প্রস্তুতির বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে পারেন। অম্বরীশবাবু আরও জানান, এই মুহূর্তে ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের হ্যাম অপারেটরদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫০। সভাপতি সুবীর দত্ত, সহ সভাপতি হীরক সিনহার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জয়ন্ত বৈদ্য, শুভঙ্কর সাহা, সাবর্ণী নাগ বিশ্বাস, সোহম চক্রবর্তী, স্রয়ণ মন্ডল প্রজন্মের হ্যাম অপারেটর দের সঙ্গে বর্ষীয়ান জ্যোতিপ্রকাশ মুখোপাধ্যায়-সহ অনেকে এই দলে আছেন। বিভিন্ন পেশার অনেক মানুষ একসঙ্গে এখানে হ্যাম অপারেটর হিসাবে কাজ করেন।

শুধু গঙ্গাসাগর মেলা নয়, বিভিন্ন ভাবে হারিয়ে যাওয়া পরিবার বিচ্ছিন্ন মানুষদের তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলছে হ্যাম রেডিও। ‘HAM’ নামকরণ নিয়ে মতভেদ আছে তবে কর্তৃপক্ষের কাছে ‘HAM’ কথাটির পুরো অর্থ Help Always Mankind। এই মানবিকতার তাগিদেই কেয়ার অব ফুটপাথ বা কেয়ার অব হোম যাদের ঠিকানা হতো তারা আবার ফিরতে পারছেন নিজেদের ঘরে, নিজেদের ঠিকানায়।

Developed by DXDasia