৩৫ বছর ধরে সৎকারের কাজ! ‘মৃতদের রক্ষাকর্ত্রী’ হয়ে উঠেছেন শিলিগুড়ির কাবেরী

শুধু দাহই নয়, মহিলাদের স্বনির্ভরতার জন্য একটি সংগঠনও তৈরি করেছেন

বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন থেকেই শ্মশানে গিয়ে মৃতদেহ দাহ করার কাজ শুরু হয় তাঁর। আজ চল্লিশ বছরে পৌঁছে সেই সৎকার কাজ আরও বেড়েছে। মৃতদেহ দাহ করার নেশা নাকি এমনই, যে দেড় বছর আগে করোনা যখন প্রবেশ করে তখন দাহ কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি ব্যাঙ্ক থেকে সোনাগয়না বন্ধক দিয়ে এক লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা ঋণ নেন। সেই ঋণের টাকায় বিগত এক বছরে তিনি ৪৬৫টি মৃতদেহ দাহ করেছেন। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই রয়েছেন করোনা আক্রান্ত মৃত মানুষ।

উত্তরবঙ্গে করোনা পরিস্থিতিতে মৃতদেহ সৎকারের ব্যতিক্রমী কাজের জন্য এভাবেই সর্বত্র আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছেন শিলিগুড়ি উত্তর ভারতনগরের বাসিন্দা তথা গৃহবধূ কাবেরী চন্দ সরকার। পাঁচ বছর বয়স থেকে চল্লিশ বছর, এই দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরে তাঁর দাবি তিনি এক হাজারেরও বেশি মৃতদেহ সৎকার করেছেন। কিন্তু করোনার এই দেড় বছরেই সবচেয়ে বেশি দাহ কাজ সেরেছেন। দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় একদিনে সবচেয়ে বেশি এগারোটি দেহ দাহ করেছেন। আর এই করোনা পর্বেই তিনি মৃতদেহ সৎকারের জন্য পঁচিশজন গৃহবধূকে নিয়ে তৈরি করেছেন বিশেষ বাহিনী। এক শ্মশান থেকে আরেক শ্মশানে দিনরাত ছুটছেন। এখন করোনায় মৃত্যু গত এপ্রিল-মে মাসের মতো না থাকলেও তাঁর মহিলা বাহিনী সর্বদা তৈরি দাহ কাজের জন্য।

শ্মশানে বসে মা। পুত্র সন্তানের পরীক্ষা প্রস্তুতি ঝালিয়ে নিচ্ছেন অনলাইন কলিংয়ের মাধ্যমে। গত এপ্রিলে করোনার মৃত্যু মিছিলের সময় রাত একটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত কাবেরী তাঁর পুত্র সন্তানের পরীক্ষা প্রস্তুতি ঝালিয়ে নেন শ্মশান থেকেই। কাবেরী জানাচ্ছেন, “তখন চারদিকে মৃত্যু মিছিল। দাহ কাজ করতে করতে আমাদের হিমশিম অবস্থা। ছেলের পরীক্ষা প্রস্তুতি ঝালিয়ে না নেওয়াতে ও বারবার ফোন করছিলো। শেষে রাত একটায় একটু ফুরসত হলে, একটি মৃতদেহ চিতায় তুলে দাহ কাজ চলতে থাকার অবসরে অনলাইনে ছেলের পরীক্ষা প্রস্তুতির ক্লাস নিয়েছি।”

শিলিগুড়ি শ্রমিকনগরে জন্ম কাবেরীর। বাবা দুলাল চন্দ ক্যুরিয়র সার্ভিসে চাকরি করতেন। আর অবসর সময়ে বিড়ি বাঁধতেন। ছোটোবেলা থেকেই সংসারে সামান্য অভাব তো ছিলই। তবে তা কাউকে বুঝতে না দিয়ে মানুষের সেবা, বিশেষ করে গরিব মানুষের সেবাকেই বিশেষ প্রাধান্য দিতেন দুলাল চন্দ। শ্মশানে গিয়ে মৃতদেহ সৎকার করার মতো কাজকে বড়ো সমাজসেবার কাজ হিসাবে দেখতেন প্রয়াত দুলাল চন্দ। আর বাবার সেসব কাজ খুব কাছ থেকে দেখেই তাঁর শ্মশানে যাওয়া এবং মৃতদেহ সৎকার করার সামাজিক কাজ নেশার মতো করে তোলে বলে কাবেরী জানান। সেই নেশা আজও অব্যাহত রয়েছে।

শুধু মৃতদেহ দাহই নয়, মহিলাদের স্বনির্ভরতা এবং মহিলাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সংগঠনও তিনি তৈরি করেছেন। নাম মুক্তধারা ফাউন্ডেশন। সেই সংগঠনে এখন ৬৫ জন মহিলা  সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জন মহিলা সরাসরি তাঁর সঙ্গে দাহ করার কাজে যুক্ত থাকলেও বাকিরা অন্যান্য সামাজিক কাজে যুক্ত। যেমন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়া হয়, অঙ্কন চর্চা শেখানো হয়, নৃত্য ও সংগীত শেখানো, পথ শিশুদের শুকনো খাবার বিলি, মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া – এইসব কাজকর্ম করা হয়।

কাবেরী বলেন, “মরা মানুষে কীসের ভয়? মরা মানুষ তো বলে আমায় তাড়াতাড়ি দাহ করে বাঁচাও! মরা মানুষ কোনও ক্ষতি করে না। ক্ষতি তো করে জ্যান্ত মানুষ। বহু জীবন্ত মানুষ আছে যারা পশুর থেকেও ভয়ঙ্কর। আমরা মরা মানুষ দেখে ভয় পাই না, ভয় পাই জ্যান্ত মানুষ দেখে। শ্মশানে কিছু জ্যান্ত মানুষ আমাদের দেখে পেত্নি বলে টিপ্পনি কেটেছে। আমাদের জোর করে মদ্যপান করতে বলা হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে, মদ্যপান না করলে শ্মশানে এসে দাহ করা যাবে না। আমরা শ্মশানে মদ্যপানের বিরোধিতা করায় আমাদের ওপর হামলাও হয়েছে। একইসঙ্গে আমরা এত দাহ কাজ করলেও সকলকে জানিয়ে দিই, আমরা শ্রাদ্ধ বা মৎস্যমুখিতে যাই না। একজন মানুষ মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে মৎস্যমুখির নামে আনন্দ করে মাছ ভাত খাওয়ার আমরা তীব্র বিরোধী।”  তিনি এ-ও বলেন, “মেয়েরা যাতে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াই চালাতে পারে, তার জন্য আমি এখন গামছা এবং ওড়না ট্রেনিং শুরু করেছি। মেয়েদের ওপর হামলা করতে এলেই বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করবে মেয়েরা।” রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানের ওপর এমএ পাশ করেছেন কাবেরী। তাছাড়া তাঁর নার্সিং ট্রেনিং, প্যারা মেডিক্যাল ট্রেনিং কোর্সও করা রয়েছে।

Developed by DXDasia