প্লেগদেবী থেকে করোনাদেবী, মৃত্যু ভয়ে আজও দেবতার জন্ম?

১৮৯৮ থেকে ২০২১, চিত্রটা একই থেকে গেছে

১৮৯৮ সালের গোড়ার দিকে বোম্বাইয়ে যখন প্লেগ দেখা দেয়, সেসময়েরই কথা। একদিন সন্ধ্যার বোম্বে মেল থেকে নেমে এলেন ঘোমটায় মুখ ঢাকা এক মহিলা। হাওড়া স্টেশনের বাইরে এসে একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে তিনি রওনা দেন কলকাতার দিকে। হ্যারিসন রোডের কাছে পোঁছে গাড়ির কোচয়ান জিজ্ঞেস করেন, ‘কোথায় যাবেন মা?’ মহিলা গাড়ির ভেতর থেকে মহিলা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি প্লেগদেবী। কোচয়ান আঁতকে উঠে পিছনে ফিরে দেখেন, গাড়িতে কেউ নেই।

ঊনিশ শতকের শেষদিকে কলকাতায় প্লেগ কীভাবে এল, তা নিয়ে এই গল্পটা ছড়িয়ে পড়েছিল চতুর্দিকে। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর ‘মহাস্থবির জাতক’ বইতে লিখেছিলেন সে কথা। ১৮৯৮ সালের শিক্ষা-সচেতনার নিরিখে প্লেগ নিয়ে কলকাতায় এধরনের গল্পগুজব ছড়ানোটা আশ্চর্যের ছিল না। শিক্ষা-সচেতনার অভাব এবং কুসংস্কারের প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বোঝা গিয়েছিল প্লেগের কারণে। কলকাতায় প্লেগ মহামারীর সময় প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর বয়স ছিল আট বছর। পরে, পরিণত বয়সে তিনি লিখেছেন, শহরে প্লেগ রোগ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্পোরেশন থেকে সবাইকে টিকা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু শহরবাসী তাতে সাড়া দেয় না। ১৮৯৮ সালে প্লেগ সম্পর্কে সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় লেখা হয়, ‘প্লেগের কথা শুনিয়া কলিকাতাস্থ লোকের আতঙ্ক ভয়ানক বৃদ্ধি পাইয়াছিল। সকলেই বিভব দূরে ফেলিয়া পুত্রকন্যা লইয়া শহর ত্যাগে প্রস্তুত হইল। সে ভয়, সে ভাবনা সহজে বর্ণনা করা যায় না…।’

এইরকম অবস্থা মাস তিনেক চলার পরে শহরে দাঙ্গাহাঙ্গামা শুরু হয়। সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয়, কর্পোরেশনের লোক বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখবে, কারও প্লেগ হয়েছে কিনা। যদি রোগীর সন্ধান পায়, তাহলে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। একথা শুনে শহরের গরিব মানুষরা সরকারের ওপরে ভীষণ ক্ষেপে যায়। গুজব রটে, প্লেগ হাসপাতালে গেলে কেউ বাঁচে না। ডাক্তাররাই ইঞ্জেকশন দিয়ে রোগীকে মেরে দেয়। প্লেগরোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য যে গাড়ি পাঠায়, তার ভেতরে বিষ মাখানো থাকে। সুস্থ লোকও সেই গাড়িতে উঠলে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যায়। এমনকী, গুজব ছড়াতে থাকে যে, প্লেগের টিকা নেওয়ার ১০ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত। আবার কারো কথায়, পেট থেকে এক পয়সা মাপের মাংসখণ্ড তুলে নিয়ে তার মধ্যে প্লেগের জীবানু পুরে দেয়।

তখন কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান ছিলেন কুক সাহেব। তাঁর ওপর হামলা করার জন্য অনেকেই সুযোগ খুঁজতে থাকে। সাধারণ মানুষ যখন টিকা না নেওয়ার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছে, অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল ব্রাহ্মরা। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী ছিলেন ব্রাহ্ম ঘরের সন্তান। কুক সাহেবের থেকে টিকা নেওয়ার পর প্রবল জ্বরে ২৪ ঘন্টা অচেতন ছিলেন, কিন্তু মারা যাননি বা কোনও শারীরিক ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি তাঁর।   

এবার আসা যাক, করোনা প্রসঙ্গে। ২০২০-২০২১, করোনা অতিমারির প্রথম ঢেউ হয়ে এবার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রকোপে সারা দেশ, শোনা যাচ্ছে তৃতীয় ঢেউও আসন্ন। আমরা সকলেই দেখতে পাচ্ছি চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনার এই ভয়ঙ্কর ঢেউ থেকে মানুষের প্রান বাঁচাতে নিজেদের প্রান বিপন্ন করে লড়ছেন, বিজ্ঞানকর্মী-গবেষকরাও তাঁদের সাধ্যমত দিনরাত এক করে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে চলেছেন। অন্যদিকে, আমরা কী দেখতে পাচ্ছি?‘ভয় থেকে ভগবানের (পড়ুন- করোনাদেবী) জন্ম’-এর মতো বিমূর্ত খবরও আমাদের সামনে উঠে আসছে বারবার। গত বছর জুন থেকে এর উৎপত্তি। কেরলে এরকম করোনাদেবীর পুজো করা হয়। গণমাধ্যমে সর্বপ্রথম সেই খবরটিই প্রকাশ্যে এসেছিল, এরপর পশ্চিমমবঙ্গেও এইধরণের ঘটনা দেখা যায়। উত্তর দিনাজপুরের রাজগঞ্জ বা  শিলিগুড়ি শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রাজন্দ্রনগর এলাকায় এবং  ফাঁসিদেওয়া ব্লকেও ধূমধাম করে ‘করোনামাতা’র পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। এবছর একই চিত্র দেখা গেছে তামিলনাড়ুতে কোয়েম্বাটুরের। সেখানে কামাটচিপুরী আধিনাম মন্দিরে বসানো হয়েছে ‘করোনা দেবী’-র মূর্তি। ঢাকঢোল পিটিয়ে পূজাঅর্চনা করা হয়। প্লেগের সময়েও এখানে নাকি একটি মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল “প্লেগ মারিয়াম্মান মন্দির।”

আবার, সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে আরও একটি খবর। উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকির সিসাউদা গ্রামের ঘটনা। সেই গ্রামের বাসিন্দারা ভ্রান্ত ধারণার ভয় থেকে যা করেছেন, তা যেমন আকস্মিক, তেমনই উদ্বেগজনকও। ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে টিকা নেবেন না বলে গ্রামের সবাই মিলে ঝাঁপ দেন নদীতে! কারণ, তাঁরা মনে করেন, ‘বিষ’ ইঞ্জেকশন নেওয়ার চেয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়াও ভাল। গ্রামবাসীদের করোনা টিকা দিতে গিয়ে এমনই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।

অতএব, বোঝা যাচ্ছে, ১৮৯৮ থেকে ২০২১, চিত্রটা কিন্তু পুরোপুরি বদলে যায়নি। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে দেশ এগিয়ে গেলেও কুসংস্কার, অসচেতনার অন্ধকার থেকে মুক্তি ঘটানো সম্ভব হয়নি। আধ্যাত্মিকতা ভারতের শিকড়ে থাকতেই পারে, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু, করোনাদেবীর পুজো বা টিকার ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার মতো ঘটনাগুলি সরকার, প্রশাসন, চিকিৎসাকর্মীদের উদ্যোগ ও শ্রমকে বিফল করে দেয় না কি? আমাদের ভাবতে হবে, বিজ্ঞানের সঙ্গে এতটা পথ পেরিয়ে এসে অতিমারী ঠেকাতে কেন আজও দেবতার জন্ম হচ্ছে! এইধরনের ঘটনাগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রামাঞ্চলে ঘটতে দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হল, তাঁদের শিক্ষা-সচেতনতায় কোথায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে?

পরিশেষে অনুরোধ, দয়া করে নিজেদের ঈশ্বর বিশ্বাস ব্যক্তিগত স্তরে রাখুন অন্তত যতদিন না করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে আমরা নির্মূল হচ্ছি। অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, কর্মহীন ও করোনা আক্রান্তদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এসব নিয়ে ভাবুন, বিভ্রান্ত হবেন না।

তথ্যসূত্রঃ

ফোর্থপিলার্স, এনডিটিভি, জি নিউজ

Developed by DXDasia