টিভি স্টুডিওয় মিথ্যে যুদ্ধ না করে করোনাজয়ীদের দেখান, ভালো থাকতে সাহায্য করুন

অতিমারিতে সংবাদমাধ্যমগুলির অবস্থান কেমন হওয়া উচিত?

একটি বৃহত্তর সমাজব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গণমাধ্যম (Media)। যেকোনো ক্রাইসিসে সমাজ বা মানুষ গণমাধ্যমকে পাশে পেয়েছে। অন্তত ইতিহাস তাই বলছে। কারণ সঠিক গণমাধ্যমই পারে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে। যেহেতু দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খবরাখবর সংবাদমাধ্যম সংগ্রহ করে এবং দেশের সব অংশের জনগণ এবং শাসকদের কাছে পৌঁছে দেয়। দেশের পরিস্থিতি, শাসনব্যবস্থা ও শাসক সম্বন্ধে দেশের মানুষকে অবহিত করে। তাই সংবাদমাধ্যমকে আমরা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ (Fourth Pillar) নামে আখ্যায়িত করেছি।

বিশ্ব এখন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে। গতবছর কার্যত দিশেহারা অবস্থা ছিল প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতেও। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তারা কেউ কেউ সামলে নিয়েছে। কিন্তু আমরা, ভারতবাসীরা পারিনি। দূর থেকে সাহায্য আর মানসিকভাবে পাশে থাকা ছাড়া মানুষের কিচ্ছু করার নেই৷ হ্যাঁ, করোনা আমাদের মধ্যে দূরত্ব ঢুকিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মধ্যেও যে একটা প্রকৃতি বাস করে– তার খোঁজও কিন্তু দিয়েছে। যেকোনো অতিমারিকেই আমরা এড়াতে পারব না। কিন্তু কী পারব? এই পারা আর না পারার মধ্যে বিস্তৃত জলরাশি। যার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে সংবাদমাধ্যম। সাধারণ মানুষকেও ডুবিয়ে ছাড়ছে। ভয় দেখাচ্ছে। চারদিকে হতাশার ছবি। করোনাজয়ীদের না দেখিয়ে শুধুমাত্র শ্মশান চাতালের চিত্র। স্টুডিওতে ডাক্তারদের বসিয়ে ভয়ের কিছু কথা। জনতা জনার্দন (বলা হয়, জনার্দন হলেন জন নামক এক অসুরের বিনাশকর্তা। যিনি আবার বিষ্ণুও বটে)। হ্যাঁ, জনতাই পারে ভয়াল পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে। কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছেন। কারণ সংবাদমাধ্যম। সবসময় তিনি চিন্তায় মগ্ন। কারণ তিনি টেলিভিশনে প্রাইম টাইম দেখছেন। তিনি সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখছেন – পাড়া, প্রতিবেশী এমনকি বাড়ির লোককেও। কারণ সংবাদপত্র বলেছে অনেকেই রোগ চেপে রাখছে, তাই খুব সাবধান!

(সবার উদ্দেশ্যে এই মন্তব্য নয়, কারোর কারোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ‘কারোর কারোর’টাই গুরুত্বপূর্ণ।)

হ্যাঁ, চারদিকের অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের তো বিশেষ ভূমিকা থাকবে তাতে। ইতিবাচক দৃষ্টান্তমূলক ঘটনাও দেখানো উচিত। সাধারণ মানুষ তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয়। সেই কারণেই ফেক নিউজের আধিপত্য। আর আইটি সেল হয়ে উঠছে দেশের বৃহত্তম চাকরিস্থল। সংবাদমাধ্যমকে অনুরোধ খারাপটার পাশাপাশি ভালোটাও দেখান প্লিজ।

ডাক্তারদের ভয় দেখানো সাক্ষাৎকার না দেখিয়ে কোন অঞ্চলে কোন ডাক্তারদের সময়মতো পাওয়া যাবে, তার সঠিক তথ্য দিন। প্রয়োজনে সুস্থ হয়ে ওঠা বিভিন্ন বয়সী রোগীদের সাক্ষাৎকার দেখান।

অক্সিজেন সিলিন্ডার কোথায় ও কীভাবে পাওয়া যায়, তার সন্ধান দিন।

প্লাজমা দাতাদের একটা ডেটাবেস তৈরি করুন। প্রাইম টাইমে বা সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তা নিয়ে খবর করুন।

কোন হাসপাতালে কতগুলি বেড ফাঁকা আছে, বারবার বলুন। অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার বিশদ তথ্য দিন।

স্থানীয় পরিষেবা কেন্দ্রগুলির যোগাযোগ নম্বর প্রতিদিন প্রচার করুন।

জনগণের প্রতিনিধিদের স্টুডিওতে বসিয়ে “সব শেষ হয়ে গেল গো” মার্কা কথা না বলতে দিয়ে তাঁদের সমাজসেবার কাজে নিযুক্ত করুন।

সমস্তরকম পরিষেবা দিতে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে আহ্বান জানান এবং উদ্বুদ্ধ করুন।

আশা করি, আমরা মানুষ হিসেবে এটুকু চাহিদা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কাছ থেকে আশা করতে পারি। আপনারাই তো পারেন, এ সমাজকে সঠিক দিশা দেখাতে। যাঁদের জন্য আপনারা কাজ করেন, তাঁরা একদিন আপনাদের পরিত্যাগ করলে কোথায় যাবেন? কী করবেন? ভেবে দেখেছেন তো?

কভার ইমেজঃ অভিজিৎ চক্রবর্তী

 

Developed by DXDasia