নব্যতরঙ্গ, পরম্পরা ও চলমান শিল্পধারা : কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র

KIFF 2024-এ দেখানো হচ্ছে ফ্রান্সের ২১টি সিনেমা

লা অতলান্তে (১৯৩৪)

রাসি চলচ্চিত্র নিয়ে ভারত তথা বঙ্গ-সিনেপ্রেমীদের উন্মাদনার কথা নতুন করে না বললেও হয়। লুই দেলুক থেকে লুই বুনুয়েল, জঁ ককতো থেকে জঁ রেনোয়া, আল্যাঁ রেনে, ফ্রঁসোয়া ত্রুফো, অ্যাগনেস ভার্দা, রোবের ব্রেঁস… গোদার তো আছেনই; ফরাসি সিনেমা মানে প্রথম মহাবিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আভাঁ গার্দ (avant-garde movement) আন্দোলন, পঞ্চাশের দশকের সিনেমা ভেরিতে, নব্যতরঙ্গ বা নিউ ওয়েভ। যেসব আন্দোলনের ঢেউ এদেশেও ধাক্কা খেয়েছিল, বিশেষত কলকাতায়। আন্দোলিত হয়েছিলেন সত্যজিৎ, মৃণাল – আবিশ্বের কিংবদন্তি পরিচালকদের তালিকায় তাঁরাও অধিষ্ঠিত। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতেই আলিয়ঁস ফ্রসেঁ দ্যু বেঙ্গল ও ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম সেন্টার-এর উদ্যোগে কলকাতায় আয়োজিত হয়েছিল প্রথম ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসব। ফ্রান্স ও ভারতের এহেন মেলবন্ধনের দৃষ্টান্ত হিসেবে, এবারের ৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ফোকাস কান্ট্রি হিসেবেও আলোকিত হচ্ছে ফরাসি দেশ।

আইস উইদাউট আ ফেস (১৯৬০)

ফরাসি সিনেমা মানে প্রথম মহাবিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আভাঁ গার্দ (avant-garde movement) আন্দোলন, পঞ্চাশের দশকের সিনেমা ভেরিতে, নব্যতরঙ্গ বা নিউ ওয়েভ। যেসব আন্দোলনের ঢেউ এদেশেও ধাক্কা খেয়েছিল, বিশেষত কলকাতায়।

ফরাসি সিনেমা-র বিচিত্র জীবনীশক্তি তাকে যুগ যুগ ধরে বিশ্বের পুরোধা বলে চিহ্নিত করে এসেছে। ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় মিলে যেদিন নিজেদের তৈরি প্রজেক্টরে তাঁদেরই তোলা দুটি তথ্যচিত্র দেখিয়ে প্যারিসের দর্শকদের চমকে দিয়েছলেন, সেদিন শুধু ফ্রান্সের নয় সারা বিশ্বের চলচ্চিত্রে ছিল একটা ঐতিহাসিক দিন। ধারাবাহিকভাবে সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মর্যাদাপূর্ণ ও অর্থবহ করে রেখেছেন ফরাসি পরিচালক, অভিনেতা, কলাকুশলীরা। পুরোনো ও নতুন মিলিয়ে বেশ কয়েকজন ফরাসি পরিচালকের ছবি এবারের কিফ (KIFF)-এ দেখতে পাবেন দর্শক। উদযাপিত হবেন মহিলা ফরাসি পরিচালকরা। চলচ্চিত্র উৎসবে ফ্রান্স ফোকাস কান্ট্রি হওয়ায় গর্বিত ও উৎসাহিত এ রাজ্যের ফরাসি কনসাল জেনারেল নিকোলাস ফ্যাসিনো।

কল অফ ওয়াটার (২০২৪)

এবারে মোট ২১টি ফরাসি ছবি থাকছে চলচ্চিত্র উৎসবে। ক্লাসিক বিভাগে যে ছবিগুলো দেখা যাবে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রোবের ব্রেঁস’র ‘ল্যানশট অফ দা লেক’, কোস্তা গ্রাভাসের ছবি ‘দা স্লিপিং কার মার্ডার’, জঁ ভিগোর ছবি ‘লা অতলান্তে’। এলিস গাই-ব্লাচে, ক্লেয়ার ডেনিস, অ্যাগনেস ভার্দা, ক্যাথরিন ব্রেইলাট, স্যান্ডরিন ভেসেট, মিয়া হ্যানসেন-লাভ – প্রায় শুরুর সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে মহিলা ফরাসি পরিচালকরা দৃষ্টান্ত রেখেছেন/রেখে চলেছেন ফরাসি সিনেমায়। এবারে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শকরা দেখতে পাবেন পাঁচজন মহিলা ফরাসি পরিচালকের ছবি। থাকছে এলিস ওজেনবার্গারের ‘কল অফ ওয়াটার’, ডেলফিন কুলিন ও ম্যুরিয়েল কুলিন পরিচালকদ্বয়ের ‘দ্য কোয়ায়েট সন’, ক্যারোলিন ভিগনালের ‘ইট’স রেইনিং ম্যান’, সেলিন রুজোর ‘ফর নাইট উইল কাম’ এবং লেটিসা ডোসের ‘ডগ অন ট্রায়াল’।

ডগ অন ট্রায়াল (২০২৪)

এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি শর্ট ফিল্ম ও তথ্যচিত্র থাকছে ফরাসি ছবির তালিকায়। উল্লেখ্য, তথ্যচিত্রে বঙ্গ-ফরাসি যোগ পুরোনো। ১৯৬৮ সালে মাস দুয়েকের জন্য ভারতে এসেছিলেন ফরাসি পরিচালক লুই মাল। তার মধ্যেই চেষ্টা করেছিলেন কলকাতাকে রেকর্ড করতে। তখন তিনি ৩৫-এর তরুণ। ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত। ২৩ বছর বয়সেই কানের পাম ডি’ওর পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। একজন ক্যামেরাম্যান আর সাউন্ড রেকর্ডিস্ট চুটিয়ে নেমে পড়েছিলেন কাজে। বানিয়ে ফেলেছিলেন ৯৯ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘ক্যালকাটা ৬৯’ (তথ্যচিত্রটি ইউটিউবে পাওয়া যায়)। লুই দেখিয়েছিলেন কলকাতার আর একটি জগৎ। চরম হতাশা, দুর্দশার ভিতরেও এই শহরে ভালোবাসা ছিল, চা-সিগারেট-শিল্প-আন্দোলন-আড্ডা ছিল। তথ্যচিত্রের একটি বড়ো অংশে তিনি ধরেছিলেন কুমোরটুলিতে কীভাবে সরস্বতী প্রতিমা গড়া হচ্ছে এবং কীভাবে বহু যত্নে বানানো একটি শিল্পকর্মকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিল্পকর্ম এভাবে জলে ভাসিয়ে দেওয়া তাঁকে ব্যথিত করেছিল। ‘ক্যালকাটা ৬৯’, মৃণাল সেন-এর ওপর একটি তথ্যচিত্র ছাড়াও লুই বেশ কিছু তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন এদেশে।

Developed by DXDasia