সেই বায়োপিকের পরিচালক ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন এপার বাংলার এক কবি, অন্নদাশঙ্কর রায়। তখন ওপার বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্ব চলছে। আজ সারাদিন বাংলাদেশ জুড়ে আবৃত্তি করা হবে সেই কবিতা – “যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, / ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”। আজ বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের জন্মদিন। তিনি শুধু বাংলাদেশের জাতির জনকই নন, দুই বাংলার আত্মিক এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনেরও প্রতীক। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও উৎসাহ উদ্দীপনার শেষ নেই। অন্নদাশঙ্কর যেমন তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, তেমনি গান লিখেছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, লক্ষ্মীকান্ত রায়ের মতো মানুষেরা, গেয়েছেন এপার বাংলারও একাধিক শিল্পী। সম্প্রতি অঞ্জন দত্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেয়েছেন নতুন গান, “এখনও মুক্তি পায়নি, এখনও মুক্তি পায়নি অনেক মন”।
দুই বাংলার যৌথ প্রয়াসে একমাত্র টিভি-সিরিয়াল নির্মাণ করার সুযোগ হয়েছিল আমার –সুনীলদা, বাঙালির প্রিয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’ অবলম্বনে। বঙ্গদর্শনের পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রতি শনিবার তার গল্প বলছি। আমার ভিতরে থাকা বাঙালপনাই হয়তো এই বিশাল কর্মকাণ্ডে আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছিল। সেই প্রযোজনায় এক প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আমার বিশিষ্ট বন্ধু, বাংলাদেশের স্বনামধন্য অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের বিখ্যাত গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”-র রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে পীযূষ আমার পরিচয় করিয়ে দেন। সেই পরিচয় থেকেই জন্ম নিয়েছিল আরেকটি মহাকাব্যিক প্রযোজনা – ‘পলাশি থেকে ধানমন্ডি’।

‘পলাশি থেকে ধানমন্ডি’ ছবির দৃশ্য
২০০৮ সাল নাগাদ গাফফার ভাই (বন্ধুমহলে তিনি যে নামে পরিচিত) পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর একটি বায়োপিক নির্মাণের। শেখ মুজিবুরের চরিত্রে অমিতাভ বচ্চন এবং বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামালের ভূমিকায় অভিষেক বচ্চনের কথা ভেবেছিলেন তিনি। বিগ বি সেই ঐতিহাসিক প্রযোজনায় অংশ নিতে আগ্রহীও হয়েছিলেন। কিন্তু, পরবর্তীকালে ডেটের সমস্যা এবং আরও নানা কারণে সেই বায়োপিক আর হয়ে ওঠেনি।
২০১০ সাল নাগাদ গাফফার ভাই নতুন করে শেখ মুজিবের বায়োপিক করার ভাবনা শুরু করলেন। ঠিক করেছিলেন, নতুন করে অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন করবেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশি। তখন স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গাফফার ভাই ইংল্যান্ডে ছিলেন। দীর্ঘ ২২ বছর দেশে ফেরেননি, বা দেশে ফেরার মতো রাজনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশে ছিল না। ফোনে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম, কলকাতায় কীভাবে কখন কাদের নিয়ে এই কাজটা করা যায়, তার পুরো দায়িত্বটাই দিয়েছিলেন আমাকে।
সে এক ঐতিহাসিক জার্নি। রোমাঞ্চও কম ছিল না। গাফফার ভাই রেকি করতে এলেন কলকাতায়। প্রি-প্রোডাকশন এবং যোগাযোগের সমস্ত কাজ করতে হত গোপনে। কারণ, তাঁর ওপর ক্রমাগত নজরদারি চালাত ভারত এবং বাংলাদেশ সরকার। তাঁর সঙ্গে কাজ করার ফলে আমরাও সেই নজরদারির বাইরে ছিলাম না, আমাদের সমস্ত গতিবিধির খবর চলে যেত দুই দেশের সরকারের কাছে। এসবের মধ্যেও যাতে আমাদের প্রযোজনা নির্ঝঞ্ঝাটে এগিয়ে যায়, তার জন্য আমি সব রকম বন্দোবস্ত করেছিলাম। দক্ষিণ কলকাতায় এক বন্ধুর গেস্ট হাউজে থাকার ব্যবস্থা হল। সেখানেও দিনে-রাতে সময়ে-অসময়ে গাফফার ভাইয়ের কাছে রহস্যময় অজানা লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকত। পরে অবশ্য জানতে পারতাম, এনারা প্রায় সকলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।

বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
সল্টলেকে এক স্টুডিওতে শুটিং শুরু হয় এবং শেষ করতে ১৭ দিনের কিছু বেশি সময় লেগেছিল। ছবির সমস্ত কলাকুশলীদের নাম তখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি বা আনতে দেওয়া হয়নি। শিডিউল এবং স্ক্রিপ্ট বারবার পাল্টাতে হচ্ছিল। কলাকুশলীদের বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা এবং ফের বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়া ছিল আমাদের রোজকার কাজ। সড়কপথেই তাঁদের আসা-যাওয়া করতে হত। আমাদের প্রোডাকশান টিমের সদস্যরা যশোর সীমান্ত থেকে তাঁদের সেটে নিয়ে আসতেন এবং শুটিং-এর পর লক্ষ রাখতেন, তাঁরা নিরাপদে সীমান্ত পেরিয়ে ফিরতে পারছেন কিনা।
গাফফার ভাইয়ের মতো প্রবাদপ্রতীম কবি এবং অ্যাক্টিভিস্টের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও এক বড়ো প্রাপ্তি। প্রোডাকশান ডিজাইন এবং নিয়ন্ত্রণের সমস্ত দায়িত্ব আমার কাঁধেই ছিল। লজিস্টিকসের ব্যাপারে তিনি বেশি কিছু জানতে চাইতেন না। অভিনেতারা সংলাপ ভুলে যাচ্ছেন কিনা, সেই নিয়েই ছিল তাঁর মাথাব্যথা। বেশ কয়েকজন প্রবীণ কলাকুশলীও এই প্রযোজনায় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক জমে উঠত। গাফফার ভাইও তাতে যোগ দিতেন মাঝেমধ্যে। বঙ্গবন্ধুর জীবনীকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে কিনা, সেই নিয়েই প্রধানত চলত তর্ক।
'পলাশি থেকে ধানমন্ডি' চলচ্চিত্রটি দেখুন সরাসরি
শুটিং-এর কাজ মিটে গেলেও এডিটিং-এর তদারকি করতে গাফফার ভাই আরও সপ্তাহখানেক কলকাতায় থেকে যান। প্রতিদিন রাত ১২টা-সাড়ে ১২টা নাগাদ স্টুডিওয় আসতেন, সকাল পর্যন্ত থেকে এডিটিং-এর দেখাশোনা করতেন, মতামত রাখতেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় গান ছিল রবীন্দ্রনাথের “সমুখে শান্তি পারাবার”। সিনেমার শেষে মুজিবের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য পেরিয়ে গেলে এন্ড ক্রেডিট হিসেবে এই গানটি ব্যবহার করা হয়েছিল। আমরা চাইছিলাম, গানটি এমন কেউ গাইবেন, যাঁর গায়কি এবং প্রকাশভঙ্গি সিনেমার সঙ্গে মানানসই হবে। এই কাজের জন্য আমি শান্তিনিকেতনের স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়কে বেছে নিয়েছিলাম। তিনি আমাদের হতাশ করেননি। এখনও মনে আছে, শেষ শট এডিট করে যখন গানটি বসানো হল, তখন গাফফার ভাই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলেন।

আব্দুল গাফফার চৌধুরি
পৃথিবীর নানা প্রান্তে ডিভিডির মাধ্যমে এই সিনেমা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলাম আমি। প্রায় ৪ হাজারের মতো ডিভিডি বানানো হয়েছিল। প্রতিদিন কয়েকশো ডিভিডি দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টারের শাখাগুলিতে কুরিয়ার করে পাঠানো হত। তারা সেগুলি বিক্রি করে একটি আর্কাইভ গড়ে তোলার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন।
কঠোর নজরদারির মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর প্রথম বায়োপিকের প্রযোজনার দায়িত্ব পালন করে আমি ঠিক যে তৃপ্তি পেয়েছি, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে দিনের পর দিন কাটিয়ে, কাজ করে বিপুল সমৃদ্ধ হয়েছি। বাংলাদেশ এবং তার ইতিহাস নিয়ে তিনি আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলেন।
বেঁচে থাকলে আজ শেখ মুজিবুর রহমান একশো বছরে পা দিতেন। তাঁর জন্মদিন এবং মৃত্যুদিনে বাংলাদেশের নানা জায়গায় গাওয়া হয়, “যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই…”। মুজিবকে আমরা অকালে হারিয়েছি। তাঁর আদর্শ যেমন ওপার বাংলায় চিরকাল থেকে যাবে, এপার বাংলাতেও ধ্বনিত হবে তাঁর সোচ্চার কণ্ঠ। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় কেউ জানল না, বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বিশ্বনেতার প্রথম বায়োপিক এই শহরে শুরু এবং শেষ হল নির্বিঘ্নে। এই দায়িত্বের মাধ্যমে আরও একবার ওপার বাংলার সঙ্গে আত্মিক যোগ আরও সুদৃঢ় হল। ১৭ দিন এবং তার পরবর্তীকালের দিনগুলোতে প্রায় একটা গেরিলা পদ্ধতিতে এই প্রযোজনা শেষ করার পিছনে মনে হয় তাঁর আশীর্বাদ পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষে আজকের দিনে দূর থেকে তাঁকে জানাই নমস্কার।