জাহাজ ভর্তি বরফ এল মার্কিন দেশ থেকে, সাহেবরা জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে ছুটলেন গঙ্গার পারে

বরফের খোঁজে শহর কলকাতা

আইস হাউস, কোলস্ওয়ার্দি গ্র্যান্ট 

শীত চলে গিয়ে বসন্তের ফাঁকেই গ্রীষ্ম কলকাতায় সমাগত। বরাবরই বিদঘুটে এক গরমে ভোগে এই শহর। দরদর করে ঘাম। হাওয়া নেই, বৃষ্টি নেই। গুমোট। হাঁসফাঁসানি লেগেই আছে। অথচ বেছে বেছে এই গরম শহরেই কিনা আস্তানা বাঁধল ইংরেজ! তাদের দেশ যে ঠিক বিপরীত। শীত সেদেশের পিছু ছাড়ে না। তুষারে ঢেকে যাওয়া সেখানকার নিয়ম। সেসব ছেড়েছুড়ে কিনা কলকাতায় হাজির। গরম তো বটেই, জীবনযাপনও বিলকুল পৃথক। কত-কী যে মেলে না, তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি ওয়াইন খাওয়ার বরফটুকু পর্যন্ত মেলে না এই শহরে। তবে সাহেবরাও দমবার পাত্র নয়। অনেক হুজ্জতি করে শেষে তারা পেরেছিলেন কলকাতাকে বরফ উপহার দিতে। একেবারে সাধনার মতো করে ভিনদেশে বরফ-ফলন – কম কথা নয়।

উনিশ শতকের গোড়ার দিক। বরফের জন্য শহরে হাহাকার। মাঝেমধ্যে বরফ আসত অবশ্য। কাশ্মীর থেকে নিয়ে আসা হত। নবাব বাড়ির নিমন্ত্রণে সেই বরফের নাগাল পাওয়া যেত। সে বরফ বাড়িতে এলে, এদেশের ভৃত্যরা অবশ্য পরেরদিন তাকে ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। কারণ, বরফের বাসি হয়ে যাওয়া। 

যাই হোক, কোনোভাবে বরফবিহীন জীবন কেটে যাচ্ছিল সাহেবদের। ১৮৩৩ সালে হঠাৎই একদিন সাহেবদের কপালে শিকে ছিঁড়ল। সুদূর মার্কিন দেশ থেকে ভিড়ল একটি জাহাজ – যার পেটভরা তুষার। মার্কিন দেশের সঙ্গে বন্ধুতার সম্পর্কে সেদিন বাঁধা পড়েছিল ইংরেজ। বিপদের দিনের বন্ধুতা। তার ঐতিহাসিক গুরুত্বটিও কম নয়। শহরে সেদিন একেবারে ফেস্টিভ মুড। শত শত মাইল সাঁতরে এসেছে পরমপ্রিয় বরফ। এক জাহাজ বরফ। জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে সাহেবরা দৌড়োয় গঙ্গার পারে। বরফ ঘরে ঢোকার আগেই ওয়াইনের নিমন্ত্রণ পৌঁছে যেতে লাগল দোরগোড়ায়। কিন্তু সেই অফুরান বরফকে তীরে আনাও কষ্টকর। মার্কিনি বরফের জন্য কলকাতায় তৈরি হল আইস হাউজ। কোলসওয়ার্দি গ্রান্টের আঁকায় সে প্রাচীন আইস হাউজের ছবি ধরা আছে। বেন্টিংক সাহেবের তত্ত্বাবধানে জনগণের টাকায় প্রথম কোল্ড স্টোরেজ তৈরি হল। লকারের ব্যবস্থাও ছিল সেখানে। লোকে চাইলে নিজস্ব লকারে মদ-মাংসও রাখতে পারবে। কোল্ড স্টোরেজ সংলগ্ন জায়গাকে এদেশের মানুষ বলত বরফতলা। তারা অবশ্য তখনো বাসি জিনিস পাতে তোলে না। যারা হাফ-ইংরেজ, তারা বাসি বরফ গ্লাসে তোলার সাধনায় রত। 

যাইহোক, কলকাতায় বরফ এল। মার্কিন বন্ধু জাহাজের ক্যাপ্টেন রোজার্সকে সম্বর্ধনা দেওয়া হল। উপহারে রুপোর কাপ। আর সাহেব এবার তার ব্যবসায় যোগ করল আরেকটি পসরা – বরফ। দু-আনা সেরে সরকার বাহাদুর রাস্তায় রাস্তায় বরফ ফেরি করেন।   

পরে অবশ্য বরফের বাজার আরো বাড়ে। সেকথা শুনতে পাই রবি ঠাকুরের ‘ছেলেবেলা’য়-
 
“চৈৎ-বৈশাখ মাসে রাস্তায় ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত ‘বরীফ’ । হাঁড়িতে বরফ-দেওয়া নোনতা জলে ছোটো ছোটো টিনের চোঙে থাকত যাকে বলা হত কুলফির বরফ, এখন যাকে বলে অইস কিংবা আইসক্রিম। রাস্তার দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই ডাকে মন কী রকম করত তা মনই জানে”। 

গরম শহরকে বরফের উপহার দিয়ে সেসময় সত্যিই আনন্দ দিয়েছিল সাহেবরা। সেই সূত্র ধরে আজও কত গ্রীষ্মদুপুর বরফের অনির্বচনীয় স্বাদে মোহিত হয়ে আছে।  

(ছবিসূত্র – কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত) 
 

Post Tags
Developed by DXDasia