অভিনয়ের জন্য রেডিও ঘোষকের চাকরি ছাড়লেন অনিল, সেই চাকরিই পেলেন সৌমিত্র

প্রথম ছবিতে তাঁর অভিনয় দেখে চমকে গেছিলেন ছবি বিশ্বাস

“পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘যোগবিয়োগ’ সিনেমার শ্যুটিং চলছে। ছবি বিশ্বাস, সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি দৃশ্যের শ্যুটিং সেদিন। এদিকে একজন অভিনেতা ডুব মেরেছেন। তার বেশি সিন নেই। কিন্তু এই দৃশ্যে তিনি না থাকলে দৃশ্যটাই হবে না। সেদিনের শ্যুটিং লাটে উঠতে বসেছে। তাহলে গুচ্ছের টাকাও নষ্ট। দুশ্চিন্তার মধ্যেই উপায় খুঁজে পেলেন অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়। সহকারী পরিচালকটিকেই নামিয়ে দিলেন। এর আগে কোনোদিনও ক্যামেরার সামনে অভিনয় করেনি সে। কিন্তু, সেদিন প্রথম সুযোগেই সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল ছেলেটা। উল্টোদিকে ছবি বিশ্বাস, তাতেও ঘাবড়ানোর কোনো ব্যাপারই নেই। বরং, তাঁর অভিনয় দেখে চমকে গেলেন ছবি বিশ্বাস স্বয়ং। কোনোরকম তালিম ছাড়াই প্রথম সুযোগে এমন স্বতস্ফূর্ত অভিনয় করা যায়! অবিশ্বাস্য!

সেদিনের সেই আনকোরা অভিনেতাটির নাম অনিল চট্টোপাধ্যায়। পরে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিংহ-সহ বাংলা চলচ্চিত্রের রথী-মহারথীদের অন্যতম প্রিয় অভিনেতা হয়ে উঠবেন যিনি, তাঁর অভিনয়-জীবনের জন্ম এমনই আকস্মিক। নিজের অজান্তেই বাংলা সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি তার একজন মোহর খুঁজে পেয়েছিল সেদিন। যদিও, ‘যোগবিয়োগ’-এর আগেই মুক্তি পেয়েছিল ঋত্বিক ঘটকের ‘নাগরিক’। যথাযোগ্য পরিচালকের হাত ধরেই দর্শকদের কাছে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়।

প্রাণখোলা অদ্ভুত এক মানুষ ছিলেন বটে। বেড়ে ওঠা দিল্লিতে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক। স্বাভাবিক নিয়মে বড়ো চাকরিও মিলেছিল। সেকালে প্রায় আটশো টাকা মাস মাইনে। দুম করে ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সহকারী হয়ে। রোজগার নেমে এল মাসে পঞ্চাশ টাকায়। তাতে অবশ্য কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না তাঁর। আজীবন নিজের ইচ্ছেয় উজাড়ভাবে বেঁচেছেন। সিনেমাকে ভালোবেসে নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন নানা চরিত্রে। টাকাপয়সা-গাড়ি-বাড়ির ধার ধারেননি বিশেষ। অভিনয়ে তখন কতই বা রোজগার! ফলে, রেডিও ঘোষকের পদে চাকরির জন্য পরীক্ষায় বসলেন অনিল। পরীক্ষায় প্রথম হলেন তিনি, দ্বিতীয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এদিকে একজনই চাকরি পাবে। সে-চাকরিও করেননি অনিল। অভিনয়ে সময় দিতে পারবেন না, এই যুক্তিতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া সেই চাকরিই পেয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক। স্বাভাবিক নিয়মে বড়ো চাকরিও মিলেছিল। সেকালে প্রায় আটশো টাকা মাস মাইনে। দুম করে ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সহকারী হয়ে। রোজগার নেমে এল মাসে পঞ্চাশ টাকায়। তাতে অবশ্য কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না তাঁর। আজীবন নিজের ইচ্ছেয় উজাড়ভাবে বেঁচেছেন।

অভিনয়কে এমন নিংড়ে ভালোবাসতেন বলেই হয়তো কিংবদন্তি পরিচালকদের কাছেও অপরিহার্য ছিলেন তিনি। অবশ্য, তাঁর মতো অভিনেতাও তো বিরল। ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র সুরপাগল-আত্মমগ্ন শিল্পী, ‘কোমল গান্ধার’-এর খ্যাপাটে অভিনেতা কিংবা ‘মহানগর’-এ নিজের স্ত্রীকেই সন্দেহ করা, হীনমন্যতায় ভোগা মধ্যবিত্ত—অনিল অনায়াসে ডুবে যেতেন সমস্ত চরিত্রেই। চরিত্র ছোটো হলেও তাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর। সে-কারণেই ‘দীপ জ্বেলে যাই’ সিনেমার ‘পাগল’ অনিল চট্টোপাধ্যায়কে আমরা আজো ভুলতে পারি না। ‘অযান্ত্রিক’, ‘দেবী’, ‘তিনকন্যা’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘নির্জন সৈকতে’, ‘জতুগৃহ’, ‘মহাশ্বেতা’, ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘এক দিন অচানক’-এর মতো সিনেমায় মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয় তাঁকে।

 

হাসি-মজা-হুল্লোড়ে মেতে থাকা একজন মানুষ। স্টারডমের তোয়াক্কা না করে মিশে যেতেন ভিড়ে। সাধারণ মানুষের সঙ্গ থেকে আড়াল রাখতে শেখেননি আজীবন। মানুষ হিসেবে বলা যায় অজাতশত্রু। আর, নিজের অভিনয় নিয়ে খুঁতখুঁতে। দেশবন্ধু চিত্তরজন দাশের চরিত্রে অভিনয়ের অফার ফিরিয়ে দিলেন প্রথমে। অমন মানুষের চরিত্রে অভিনয়ের যোগ্যতাই নাকি তাঁর নেই। অনেক কষ্টে রাজি করানো গেল। সিনেমায় তাঁর অভিনয় দেখে চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তীদেবী আর মেয়ে অপর্ণা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। অপর্ণা নাকি বলেছিলেন, ‘‘কত দিন বাদে বাবাকে দেখলাম যেন!’’ 

 

প্রবাসী বাঙালি হওয়ার জন্য গোড়ার দিকে বাংলায় তেমন সড়গড় ছিলেন না অনিল চট্টোপাধ্যায়। পরে সেই বাংলাতেই হয়ে উঠলেন তুখোড়। অভিনয়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। যে দেশেই গেছেন, আগে শিখে নিয়েছেন সেই দেশের মূল ভাষা। অভিনয়ের জন্য বিপুল খ্যাতি, সম্মান, শ্রদ্ধা কুড়িয়েও তিনি শেষ অবধি মাটির মানুষটিই থেকে গেছেন আজীবন। অদ্ভুত অদ্ভুত মজায় চমকে দিয়েছেন সবাইকে। নিজের বাড়ি হয়নি, ব্যাঙ্কে মোটা টাকাও জমাতে পারেননি অনিল চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু জমিয়ে রেখে গেছেন অভিনীত অসংখ্য চিরস্মরণীয় চরিত্র। আর অসংখ্য ছবি। এ তাঁর আরেক নেশা। পেন, পেন্সিল, জলরং, চারকোল নিয়ে সুযোগ পেলেই বসে যেতেন। এই ‘দ্বিতীয়’ ভালোবাসাটি অবশ্য অনেকটাই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ‘প্রথম প্রেম’ সিনেমার আলোয়।

আজ থেকে ঠিক তিরানব্বই বছর আগে জন্মেছিলেন অনিল চট্টোপাধ্যায়।    

 

Developed by DXDasia