উচ্চমাধ্যমিকে সপ্তম রূপান্তরিত নারী স্মরণ্যার হাতে গড়া দুর্গা

স্মরণ্যা ঘোষ বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী

ন্তানদের হাতেই মা রূপ পান, চিন্ময়ী থেকে মৃন্ময়ী হয়ে ওঠেন। মা এবং সন্তানের সম্পর্ক সবসময়েই এক অন্য মাধুর্যের। এটা সেইরকমই এক সন্তানের গল্প, যার হাতে প্রতিমা মৃন্ময়ী রূপ পান প্রতি বছর। স্মরণ্যা ঘোষ (Saranya Ghosh HS), ২০২৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪৯০ নম্বর পেয়ে সপ্তম স্থানাধিকারী হন তিনি। তবে শুধু এই কারণেই তিনি বাঙালির কাছে বিশেষ নয়। স্মরণ্যা প্রথম উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকা-য় রামধনুর রং ঢেলেছিলেন। তিনি একজন রূপান্তরিত নারী। বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই নিজের হাতে প্রতিমা বানিয়ে স্মরণ্যা নিজেই দুর্গাপুজো করেন। তবে গতবছর থেকে নারী হিসাবেই মায়ের আরাধনা করছেন তিনি।

স্মরণ্যা বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “সবাই যে ‘আমি’-টাকে বাইরে থেকে দেখছে, তা ছাড়াও আমার মধ্যে আরেকটা ‘আমি’ আছে, যে আমিটাকে শুধুমাত্র আমি নিজে চিনি। আমার নিজের শরীর এবং মনকে নিয়ে আমার যত প্রশ্ন, যত দ্বন্দ্ব, যত অভিযোগ, সেইগুলো যার কাছে প্রথম বলেছি তিনি আমার ঈশ্বর, মা দুর্গা।”

স্মরণ্যা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়েন তখন থেকেই বুঝতে পারতেন তাঁর মধ্যে কিছু একটা অন্যরকম হয়েছে, তবে সেটা কী তা বুঝতে পারতেন না। স্মরণ্যা বলেন, “যখন আমার পুরুষ থেকে নারীর রূপ ধারণের যাত্রাটা চলছে, তখন বিভিন্ন সামাজিক পারিবারিক প্রতিকূলতা যে আসেনি, তা নয়। সেই সময়কালেও আমি বারবার দেবী দুর্গাকে স্মরণ করেছি যাতে তিনি সবটা ঠিক করে দেন।”

কিন্তু এ তো গেল মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের কথা। মূর্তি তৈরি বা বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা কীকরে হল? এ প্রসঙ্গে স্মরণ্যা জানান, “ছোটোবেলা থেকেই আমি চাইতাম আমার বাড়িতে দুর্গাপুজো হোক। যখন বাড়িতে পুজো হয়, তখন তার একটা আলাদাই মাধুর্য তৈরি হয়। এক সময় নিজে থেকেই মনে হয় যে নিজে প্রতিমা তৈরি করে বাড়িতে পুজোর আয়োজন করব। প্রথম প্রথম কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছিল না আমার মূর্তি তৈরি করার। মূলত ইউটিউব দেখে এবং প্রতিমা দেখে মূর্তি তৈরি করা শুরু করি।” মূর্তি তৈরির সময় আবহে সারাক্ষণ বেজে চলে গান। সে গান হতে পারে শাক্ত পদাবলীর আগমনী, হতে পারে কোনও শ্যামাসংগীত, বা রবীন্দ্রসংগীত।

মূর্তি তৈরি করে দুর্গাপুজো করার ক্ষেত্রে নানান প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়েছে স্মরণ্যাকে। প্রতিকূলতা মূলত দুটি দিক থেকে এসেছিল, প্রথমটি একজন অব্রাহ্মণের দুর্গাপুজো করার ক্ষেত্রে বিরোধিতা, দ্বিতীয়টি এক রূপান্তরকামী নারীর দুর্গাপুজো করার ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা। স্মরণ্যা বলেন, “যখন দুর্গাপুজো শুরু করি তখন আমি পুরুষ রুপেই পুজো করতাম, তবে তখন প্রতিকূলতা ছিল অন্যরকম, পারিপার্শ্বিক সমাজ একজন অব্রাহ্মণের হাতে মায়ের আরাধনা মেনে নেওয়ার পরিপন্থী ছিল। তবুও আমার ইচ্ছা বজায় রেখে পুজো করে যাই।”

লকডাউনের সময় থেকেই নিজের ব্যাপারে সচেতন হতে শুরু করেন স্মরণ্যা। ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেন নিজেকে পরিবর্তন করার। গত বছর তিনি প্রথম নারী রূপে দুর্গার আরাধনা করেন। তিনি বলেন, “একটা সংশয় ছিল যে আমার পারিপার্শ্বিক লোকজন এবং সর্বোপরি বন্ধুরা হয়তো আমার পাশে থাকবে না, পুজোয় আমার বাড়িতে প্রতিমা দর্শন করতে আসবে না। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যা দৈব নির্ধারিত হিসেবে হয়তো দাগিয়ে দেওয়া যায় না, তবে সেই ঘটনাটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব আনন্দ দিয়েছিল। যখন সপ্তমী পুজোর আরতি করছি এবং মনে মনে ভাবছি এ বছর কি আমার বন্ধুরা আমার বাড়িতে আসবে না? ঠিক তখনই ঘটনাচক্রে আমার সবকটি বন্ধুদের গ্রুপ আলাদা আলাদাভাবে একই সময়ে আমার বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। বাড়ির পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে আমি ঘরের মধ্যে তাদের দাঁড়ানোর জায়গাটুকু দিতে পারছিলাম না। এই ঘটনাটি যেমন আনন্দের, তেমনই সারা জীবন মনে রাখার মতো।”

স্বামী কৃষ্ণানন্দের গানে আছে, “তুমি পুরুষ কি নারী, বুঝিতে নারি।/ স্বয়ং না বুঝালে তা কি বুঝিতে পারি।/ তুমি আধা-রাধা-আধা-কৃষ্ণ সাজিলে বৃন্দাবনে।/ একবার বিরাজ গো মা হৃদি কমলাসনে।” বোঝা যায় নিজের শরীর ও মনের ভিন্নতার সম্পর্কে সচেতন হয়ে নতুনভাবে নতুন জীবনে বাঁচতে চাওয়া কিন্তু ব্যাপকার্থে আবহমান সংস্কৃতির পরিপন্থী নয়, বরং দেবী মাহাত্ম্যের অনুগামী। স্মরণ্যা যে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তা যেমন উচ্চমাধ্যমিকের ইতিহাসে বিরল, ঠিক তেমনভাবেই দুর্গাপুজোর ইতিহাসেও বিরলতম।

Developed by DXDasia