যা দেখার সুযোগ করে দিয়েছে ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
জন্মলগ্ন থেকে এপর্যন্ত অনেক দাগে কলকাতার নাগরিক দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। দাগের উপর দাগ তার উপর আবার দাগ। প্রত্যেকটি দাগ কলকাতার বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গভীর হয়েছে, বিস্ফারিত হয়েছে, যেমন গাছের গায়ে কাটা দাগ হয় তেমনি। ১৯৬০ সালে কলকাতার এ দাগের ক্ষত কেমন ছিল?
কলকাতার শরীরে তখন বঙ্গভঙ্গের ক্ষত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত, স্বাধীনতা পাওয়ার ক্ষত। যে ক্ষত কয়েক বছরের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়বে কন্ট্রোল রেশনিং, কালোবাজার দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত বীভৎস হত্যাকাণ্ড, বঙ্গবিভাগজনিত লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু, স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রকল্পজনিত বিপুল মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবদলের সামগ্রিক প্রতিক্রিয়ায় মাধ্যমে। ১৯৬০ সালে, এই প্রক্রিয়াগুলির ঠিক আগের পর্যায়ে কেমন ছিল কলকাতা, তারই প্রামাণ্য নির্দশন ‘পোর্ট্রেট অফ আ সিটি’ (Portrait of a city)–একটি শহরের অববয়। এই তথ্যচিত্রটি প্রজন্মের জন্য রেখে গিয়েছেন চিত্রসমালোচক-পরিচালক চিদানন্দ দাশগুপ্ত।
ভারতের ফিল্ম ডিভিশিনের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই তথ্যচিত্রে ২০ মিনিটের ভিতর চিদানন্দ দেখিয়েছেন কীভাবে কলকাতার নাগরিক জীবনে ধীরে ধীতে গতি পাচ্ছে। কীভাবে কারখানা, বাজার-ব্যবসা, সংবাদপত্রের অফিস, রেসকোর্স, মানবিক-সামাজিক অবনমন আরও নানাকিছু গতিশীল হয়ে উঠছে। ১৯৬০-এর কলকাতা শহর হল ‘কাগজ’ ও ‘ফাইলের’ শহর, অফিসার ও কেরানীর শহর, সাংবাদিক ও উকিল-মোক্তারের শহর, বিদ্যাবুদ্ধিজীবীর শহর—যাঁরা নিজেরা উৎপাদন করেন না শুধু, চাষী-মজুরের উৎপাদন সুনির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে গলাধঃকরণ করে জীবন্ধারণ করেন। কাগজের কারখানা থেকে উৎপন্ন হাজার হাজার টন কাগজ ‘কনজিউম’ করে সমাজে ‘সার্ভিস’ দেন। চিদানন্দ এই ডকু-ছবিতে এও দেখিয়েছেন, বাংলার বাইরে থেকে রুটিরুজির জন্য আসা শত-শত মানুষ আশ্রয় নিচ্ছেন কলকাতায়। হাওড়া-শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে গড়ে উঠছে তাঁবু, বসতি। এই শহরকে কেন্দ্র করেই জন্ম নিচ্ছিল অভুক্ত, ঠাঁইহীন মানুষের বাঁচার স্বপ্ন। চরম দারিদ্রতা মধ্যেও এই শহরের আকাশ নীল ছিল, ভালোবাসা ছিল, চা-সিগারেট-শিল্পআন্দোলন-আড্ডা ছিল। অশান্তির ভিতর সংরক্ষিত বুদ্ধের সাময়িক শান্তি তখনও ছিল এই শহরে।
বারীন সাহা এক্সট্রিম লং, প্যান কিংবা ক্লোজআপ শট-এ ষাটের দশকের কলকাতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন এই তথ্যচিত্রে। এ বছর চিদানন্দ দাশগুপ্তের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ‘পোর্ট্রেট অফ আ সিটি’ এবং পূর্ণদৈর্ঘের ছবি-‘আমোদিনী’।
বারীন সাহার ক্যামেরা এই তথ্যচিত্রের অন্যতম সম্পদ। এক্সট্রিম লং, প্যান কিংবা ক্লোজআপ শট-এ ৬০-এর দশকের কলকাতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন পর্দায়।
চিদানন্দ চিত্রসমালোচক হিসেবে যতটা পরিচিত, চিত্র-পরিচালক হিসেবে নন। অথচ, ভারত সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের হয়ে বেশ কয়েটি তথ্যচিত্র এবং দু’টি সিনেমা পরিচালনা করেন। চিদানন্দ দাশগুপ্ত শুধু ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির পুরোধা ছিলেন না, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি নিজেকে জড়িয়েছিলেন। ১৯৫৯-এ ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটি তাঁর তত্ত্বাবধানেই যাত্রা শুরু করেছিল, যা ভারতের ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টে গুরু দায়িত্ব পালন করে। এই মুভমেন্টের মুখ ছিলেন চিদানন্দ। তিনিই একমাত্র বাঙালি, সেসময় যিনি চলচ্চিত্রবিদ হিসেবে চলচ্চিত্র সমালোচনাকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে যুগ্মসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ম কোয়ার্টার্লি’। ব্রিটিশ ফিল্ম পত্রিকা ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’-এর নিয়মিত লেখক ছিলেন। দ্য পোয়েট্রি অব জীবনানন্দ দাশ (১৯৭২), দ্য সিনেমা অফ সত্যজিৎ রায় (১৯৮০), টকিং অ্যাবাউট ফিল্মস্ (১৯৮১), দ্য পেইন্টেড ফেস (১৯৯২) -তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য ইংরেজি বই। ভারত সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের হয়ে বেশ কয়েটি তথ্যচিত্র এবং দু’টি সিনেমা পরিচালনা করেন। নেদারল্যান্ডসের ২৭তম রোটারডাম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, জার্মানির ৪৪তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ম্যানহেইম-হিডেলবার্গ এবং ভারতের বোম্বে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জুরি ছিলেন চিদানন্দ। ১৯৯২ সালে ভারতে ‘ফিপ্রেসকি’ অর্থাৎ ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল দে লা প্রেস সিনেমাটোগ্রাফি-র ফাউন্ডার-প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
ছবিটি দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব কমিটিকে ধন্যবাদ। এই প্রজন্ম, যাঁদের চিদানন্দ বা কলকাতার ইতিহাস সম্বন্ধে বিশেষ ধারণা নেই, তাঁদের উপকারে লাগতে পারে এই ডকু-ছবিটি।