বিনোদিনী অপেরা : নারী দিবসে কলকাতার মঞ্চে অবন্তী, সুদীপ্তার ট্রিবিউট

বিনোদিনীর ভূমিকায় রয়েছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী

লকাতার প্রথম ‘পাবলিক’ থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে যে অভিনেত্রী আহুতি দিয়েছিলেন নিজের সর্বস্বকে, তাঁর নামের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চ। তিনি নটী বিনোদিনী।

আজ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস। ২০২৩ সালে এই দিনে যখন দিকে দিকে নারী ক্ষমতায়ন, নারীর কাজের স্বীকৃতি নিয়ে নানান অনুষ্ঠান চলছে, তখন কলকাতার স্টার থিয়েটারের দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় বিনোদিনীর সঙ্গে হওয়া বঞ্চনার ইতিহাস, তাঁর চাপা কান্না। যদিও সেদিন স্টার থিয়েটারের ঠিকানা ছিল আলাদা, কিন্তু ‘স্টার’ নামটি আজও সমাজকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করে জন্ম না কর্ম কোনটা হওয়া উচিত মানুষের পরিচয়? যে অভিনেত্রী নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে আহুতি দিয়েছিলেন পাবলিক থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মহাযজ্ঞে, কেন তাঁর নামে রাখা গেল না একটা থিয়েটারের নাম?

এই উত্তরই বোধহয় বারবার খোঁজে আজকের প্রজন্ম, তাই নাটকের সঙ্গে যাঁর নাম সমার্থক তাঁর নাটকীয় জীবনই বারবার উঠে আসে যাত্রা আর নাটকের মঞ্চে, সেলুলয়েডের পর্দায় অথবা রোজকার ছোটোপর্দায়। কিন্তু শুধু তো বিনোদিনী নন, আরও অনেক অভিনেত্রী যাঁরা মঞ্চকে শুধুই দিয়ে গেলেন, নারী দিবসে তাঁদের কথাই মঞ্চে তুলে আনছেন দুই নারী, পরিচালক অবন্তী চক্রবর্তী এবং অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী। নাটকের নাম ‘বিনোদিনী অপেরা’‌। যেখানে বিনোদিনীর ভূমিকায় সুদীপ্তা চক্রবর্তী অভিনয় করবেন।

শুধু অভিনয় জীবন নয়, ব্যক্তি বিনোদিনীর ভালোলাগা- খারাপলাগার খোঁজও নিয়েছেন শিবাশীষ বন্দোপাধ্যায়। তাই নিজের চুলের প্রতি বিনোদিনীর যে ভালোবাসা তাও তুলে এনেছেন এই মঞ্চে।

বারো বছরের মঞ্চ সাফল্যের পর যখন বিনোদিনী সরে যান থিয়েটারের পাদ প্রদীপের আলো থেকে, তখন তাঁর বয়স মাত্র চব্বিশ। নাচে, গানে, অভিনয়ে দক্ষ এই অভিনেত্রী এই এক যুগের যাত্রাতেই পেরিয়ে গেছেন বহু যুগের পথ। তাই মঞ্চে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক নিয়ে কাজ করা পরিচালক আকৃষ্ট হয়েছেন তাঁর জীবনের যাত্রায়। ‘বিনোদিনী অপেরা’ নাটক সম্পর্কে অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “অবন্তীর সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না, কিন্তু যখন ওঁর সঙ্গে এই কাজের কথা হয় আমি রাজি হয়ে যাই, কারণ বিনোদিনীকে নিয়ে অনেক রকম কাজ হলেও এই ধরনের কাজ আগে হয়নি। আর শুধু বিনোদিনী নয়, বিনোদিনীর মতো থিয়েটারে উৎসর্গীকৃত অনেক অভিনেত্রীর জীবনই উঠে এসেছে এই নাটকে।”

নাটকের বুননেও আছে অভিনবত্ব। এই নাটকের মধ্যেই বিনোদিনী অভিনীত বিভিন্ন নাটকের অংশ নিয়ে মূল কাহিনির নকশিকাঁথা বুনেছেন অবন্তী চক্রবর্তী ও শিবাশীষ বন্দোপাধ্যায়। তবে সুদীপ্তা চক্রবর্তীর মতে, “এটা ঠিক নাটক নয়, অপেরা। কারণ এখানে গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আর পুরোটাই লাইভ মিউজিক, যেখানে গিরিশ ঘোষের নাটকের গানের পাশাপাশি থাকছে রবীন্দ্রনাথের নাটকের গানও। অনেক মাস ধরে গানের মহড়া চলেছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রাজ্যশ্রী ঘোষের কাছে।”

শুধু অভিনয় জীবন নয়, ব্যক্তি বিনোদিনীর ভালোলাগা- খারাপলাগার খোঁজও নিয়েছেন শিবাশীষ বন্দোপাধ্যায়। তাই নিজের চুলের প্রতি বিনোদিনীর যে ভালোবাসা তাও তুলে এনেছেন এই মঞ্চে। সঞ্চয়ন ঘোষ মঞ্চ সজ্জাতেও এনেছেন সেই প্রসঙ্গ। সুদীপ্তা চক্রবর্তী ছাড়াও নাটকে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন সুজন মুখোপাধ্যায়, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, অভিজিৎ গুহ প্রমুখ।

অভিনেতা সুজন মুখোপাধ্যায় একটি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “অবন্তী চক্রবর্তীর পরিচালনায় এক নতুন বিপ্লব বলা যেতে পারে। ও আমার খুবই প্রিয় পরিচালক। তাই হাজার অসুবিধার মধ্যেও গুরমুখ রায় মুৎসুদ্দি সাজতে বাধ্য হয়েছি ওর অনুরোধে।”

আসলে নাটকের মঞ্চ ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ নয়, বরং অনেকের জীবনের কথা বলা এক একটা চরিত্রের রূপকে। বিনোদিনীও তাই একা কোনো নারী নন, তিনি বহু যুগের বহু ক্ষেত্রের সেই নারীদের প্রতিনিধি, যাঁরা শুধুই ভালোবাসতে জানেন, ভালোবেসে লড়তে জানেন। তবে হয়তো পাওয়া হয় না অনেক কিছুই। তাই ক্ষোভে অপমানে নীরবে তাঁরা সরে দাঁড়ান জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে। তাঁদের ভালোবাসা হয়ে যায় অমর। আর সেখানেই তাঁদের জয়। ৮ মার্চ নারী দিবসে সন্ধে সাড়ে ছটায়, কলকাতার আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস মঞ্চে সেই জয়গানই গাওয়া হবে ‘বিনোদিনী অপেরা’র আঙ্গিকে। আজ এ নাটকের প্রথম অভিনয়ে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ। নাটকের পরবর্তী অভিনয় আগামী ২৬ মার্চ, রবীন্দ্র সদনে।

Developed by DXDasia