সংসৃতি প্রযোজিত ও দেবেশ চট্টোপাধ্যায় নির্দেশিত নাটক ‘হয়বদন’
অপূর্ণকে পূর্ণ করার ইচ্ছা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু এই ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে মানুষ প্রতিমুহূর্তে লড়ে চলেছে তার নিজেরই মস্তিষ্ক ও মননের সঙ্গে। আর প্রতিনিয়ত এই দ্বন্দ্বের কারণে যা হয়তো হওয়ার কথা ছিল আমাদের, তা না হয়ে আমরা হয়ে উঠছি অন্যি কিছু। এই দুই ‘ম’ অর্থাৎ মস্তিষ্ক আর মননের দ্বন্দ্বই উঠে এসেছে সংসৃতির সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘হয়বদন’ নাটকে, যার নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়।
‘হয়’ অর্থাৎ ঘোড়া এবং ‘বদন’ অর্থাৎ মুখমণ্ডল। নাটকের নামটিকে ভেঙে দেখলে বোঝা যায় নাটকটি একটি অদ্ভুত ঘোড়ামুখো মানুষকে নিয়ে, যে এই অদ্ভুত জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে সম্পূর্ণ মানুষ হতে চায়। আবার এই কাহিনির সমান্তরালে বয়ে চলে আরও এক গল্প, যেখানে পাত্র-পাত্রীরা হল দেবদত্ত, কপিল ও পদ্মিনী। সেখানেও দেখা যায় এক আকস্মিক পরিস্থিতিতে দুই বন্ধুর দেহ ও মাথা অদল বদলের ফলে তৈরি হওয়া এক আশ্চর্য জটিলতা। এই জটিলতাই আসলে মগজ ও মননের সেই দ্বন্দ্ব, যা মানুষকে দাঁড় করায় পূর্ণতা আর অপূর্ণতার প্রশ্নের মাঝখানে।

‘হয়বদন’ নাটকটি মূলত সংস্কৃত ‘কথাসরিৎসাগর’-এর একটি গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। জার্মান ঔপন্যা সিক থমাস ম্যা ন সংস্কৃত কথাসরিৎসাগরের একটি গল্প অবলম্বনে রচনা করেন ‘The Transposed Head’ নামক একটি উপন্যাস। সেই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭১ সালে গিরিশ কারনাড কন্নড় ভাষায় রচনা করেন ‘হয়বদন’ নাটকটি, এবং তার ঠিক পরের বছরেই অর্থাৎ ১৯৭২ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় নাটকটি। ‘The Transposed Head’ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও নাটককার গিরিশ কারনাডের ছোঁয়ায় নাটকটি পেয়েছে এক অন্য মাত্রা, যুক্ত হয়েছে নতুন স্তর, যেখানে ঘোড়ামুখো এক অদ্ভুত অসম্পূর্ণ মানুষ চাইছে পূর্ণ মানুষ হতে।

‘হয়’ অর্থাৎ ঘোড়া এবং ‘বদন’ অর্থাৎ মুখমণ্ডল। নাটকের নামটিকে ভেঙে দেখলে বোঝা যায় নাটকটি একটি অদ্ভুত ঘোড়ামুখো মানুষকে নিয়ে, যে এই অদ্ভুত জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে সম্পূর্ণ মানুষ হতে চায়।
১৯৭২ সালে গিরিশ কারনাডের এই ‘হয়বদন’ নাটকটি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এসে পড়ে কবি-অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের হাত ধরে। নাটকটির মূল চলন অক্ষুণ্ণ রেখেও গম্ভীরতা ও লাঘবতার মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যের সেতু রচনা করে শঙ্খ ঘোষ ‘হয়বদন’-কে করে তুলেছেন বাংলার এক নিজস্ব নাটক। নাট্য নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের মতে নাটকটির বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন, কাব্যময়তা ও রচনাশৈলী ‘হয়বদন’-কে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। তাঁর মতে, “হয়বদন যতটা গিরিশ কারনাডের, ততটাই শঙ্খ ঘোষেরও নাটক”।
নাটকটি মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রেও দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ও রেখেছেন বাঙালিয়ানার ছাপ। গিরিশ কারনাড নাটকে যেখানে যক্ষগান ব্যবহার করেছেন, সেখানে দেবেশবাবু ব্যবহার করেছেন বাংলার নিজস্ব দক্ষিণ দিনাজপুরের লোকনৃত্য খন। এই প্রসঙ্গে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “শঙ্খবাবু যেমন তাঁর ভাষা ও কাব্যময়তা দিয়ে নাটকটিকে বাংলার মাটিতে এনেছেন, আমিও প্রোডাকশান ডিজাইন দিয়ে চেষ্টা করেছি পুরোটাকে বাংলার লোকনাট্যের ফরম্যাটে নিয়ে আসার”।


নাটকটি মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রেও দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ও রেখেছেন বাঙালিয়ানার ছাপ। গিরিশ কারনাড নাটকে যেখানে যক্ষগান ব্যবহার করেছেন, সেখানে দেবেশবাবু ব্যবহার করেছেন বাংলার নিজস্ব দক্ষিণ দিনাজপুরের লোকনৃত্য খন।
যেসব শিল্প, সাহিত্য অতিক্রম করেছে দেশ-কাল-সীমানার গণ্ডি, সেখানে অনুবাদ সাহিত্যগুলো মূল কাহিনিকে বজায় রেখেই অঞ্চলভেদে তৈরি করে নেয় নিজস্ব রূপ, নিজস্ব শৈলী। নাটকের ভূমিকায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, “অনুবাদে ব্যবহৃত প্রথম গণেশ-স্তোত্রটিতে, আশ্চর্যরকম শব্দসামীপ্যের সুযোগ পেয়ে, জড়িয়ে নিয়েছি ‘বুড়ো আংলা’-র একটি অংশ”। তাঁর এই উক্তিটিই বুঝিয়ে দেয় কীভাবে কন্নড় ভাষার একটি সাহিত্য মিশে যায় বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে। আর মঞ্চেও যক্ষগান, মুখা নাচ মিলে যায় বাংলার লোকনৃত্য খন-এর সঙ্গে। এমনকি মঞ্চে আবহ সংগীতের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে ঢোল, বাঁশি, দোতারা প্রভৃতি বাংলার নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র। তাই বলাই যায় সংস্কৃত যে কাহিনি একদিন উদ্বুদ্ধ করেছিল জার্মান ঔপন্যাসিক থমাস ম্যানকে সেটাই গিরিশ কারনাডের হাতে পেয়েছিল এক অন্য মাত্রা। আবার ওই নাটকই বাংলার অনুবাদকার শঙ্খ ঘোষ ও নাট্য নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের মননে ও চিন্তায় হয়ে উঠেছে বাংলার এক নিজস্ব নাট্যসম্পদ।
____
স্থিরচিত্র: শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়