রাজ্য বনদপ্তরের সৌজন্যে ১৯৯৫ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে উৎসর্গ করা হয় এই অভয়ারণ্য
করোনা ভাইরাসের প্রভাব কিছুটা লাঘব হতেই হইহই করে বাহিরমুখী হচ্ছেন ভ্রমণপ্রিয় বাঙালি। পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্রে বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সতর্ক এবং কড়া হচ্ছে প্রশাসনও। ঝঞ্ঝাট যাদের মোটেই পছন্দ নয়, তাঁরা নিরিবিলিতে ঘুরে আসতেই পারেন উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ মহকুমায় অবস্থিত বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Bibhutibhushan Sanctuary) বা পারমাদন ফরেস্ট-এ। ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত এই হরিণালয়ের সৌন্দর্য্য ইতিহাসকে বহন করে চলে।
কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ১১০ কিলোমিটার, নয় নয় করে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ। ট্রেনে যেতে চাইলে নামতে হবে বনগাঁ অথবা রানাঘাট স্টেশনে। স্টেশন থেকে বাস কিংবা ভাড়া করা গাড়িতে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া পারমাদন ফরেস্টে (Parmadan Forest)।
সম্প্রতি রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এই অভয়ারণ্যটি নতুন করে সাজানো হয়েছে। শিশু উদ্যান-সহ মূল বাগানের রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বহু দুষ্প্রাপ্য গাছের নামকরণ এবং নতুন গাছের চারা রোপণও চলছে পুরোদমে।
কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত এই বনের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে সুন্দরী ইছামতী। নদীর অন্য প্রান্তে ওপার বাংলা। জঙ্গলের অন্য পারে উপজাতি অধ্যুষিত মঙ্গলগঞ্জ গ্রামে ইংরেজদের নির্মম অত্যাচারের স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে কুখ্যাত নীলকুঠি। কতই না ইতিহাস নদীর দু-পাড় জুড়ে। ছোটো ছোটো ডিঙির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এখনও জেগে ওঠে সেই সব অজানা ইতিহাস। ১৯৬৪ সালে মাত্র ১৪টি চিত্রা হরিণ নিয়ে শুভ সূচনা হয়। এর ঠিক এক বছর পর গহীন অরণ্যে আরও ২৬টি একই প্রজাতির হরিণ আনা হয়। বর্তমানে হরিণের সংখ্যা প্রায় আড়াইশো ছাড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০০০ সালের বন্যা বহু জৈব প্রাণ কেড়ে না নিলে হরিণের সংখ্যা ৪০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যেত।
হরিণের পাশাপাশি অর্জুন, অশ্বত্থ, বট, শিশু, শিমূল, শিরীষ, কদম, গামার প্রভৃতি বনস্পতি এবং আকাশমণি, কাঞ্চন, করঞ্জ, জারুল, বেল, খয়ের, জামে ছাওয়া বনভূমিতে প্রায় শতাধিক মরসুমী পরিযায়ী পাখির (Migrant Bird) বাস। বন দপ্তরের হিসাব বলছে, এখানে প্রায় ৭০ ধরনের প্রজাপতি ও বিভিন্ন ধরণের সরীসৃপ প্রাণী রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখ্য চন্দ্রবোড়া ও কেউটে।
১৯৮০ সালে অভয়ারণ্যের স্বীকৃতি পায় উত্তর ২৪-পরগণা জেলার বাগদা ব্লকের পারমাদন বনভূমিটি। দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য বৃহস্পতিবার বাদে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টে পর্যন্ত খোলা থাকে টিকিট কাউন্টার। এখান থেকে টিকিট সংগ্রহ করে ঢুকতে হয় অন্দরে।
পারমাদনের খুব কাছেই সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Bibhutibhushan Bandyopadhyay) বসতভিটে। লেখক ব্যারাকপুরের মামাবাড়িতে থাকলেও তাঁর বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে সবুজ প্রকৃতি। উল্লেখযোগ্য লেখার মধ্যে রয়েছে ‘আরণ্যক’, ‘ইছামতী’ প্রভৃতি। ‘‘শুইয়া আছি, হঠাৎ কীসের পায়ের শব্দে উঠিয়া বসিয়া শিয়রের দিকে চাহিয়া দেখি ঝোপের নিভৃততর দুর্গমতম অঞ্চলে নিবিড় লতাপাতার জড়াজড়ির মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে একটা হরিণ। ভালো করিয়া চাহিয়া দেখি বড় হরিণ নয়, হরিণ শাবক। সে আমায় দেখিতে পাইয়া অবোধ বিস্ময়ে বড় বড় চোখে আমার দিকে চাহিয়া আছে, ভাবিতেছে এ আবার কোন অদ্ভুত জীব।’’ – ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের এই অংশটা পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পারমাদন অরণ্যের কথাই। তাই সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্মান জানাতে ১৯৯৫ সালে এই অভয়ারণ্য উৎসর্গ করা হয় তাঁর নামে।
সম্প্রতি রাজ্য সরকারের (West Bengal Government) উদ্যোগে এই অভয়ারণ্যটি নতুন করে সাজানো হয়েছে। শিশু উদ্যান-সহ মূল বাগানের রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বহু দুষ্প্রাপ্য গাছের নামকরণ এবং নতুন গাছের চারা রোপণও চলছে পুরোদমে। সাদা ময়ূর, কাঠবিড়ালি, খরগোশ ও টিয়া পাখির সম্মিলিত সহাবস্থানে এই অভয়ারণ্যের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে পর্যটকদের কাছেও।
রাজ্যের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের (Jyotipriyo Mallik) তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন বনাঞ্চলের রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্যের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। ব্যতিক্রম নয় বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যও। প্রাচীন গাছগুলির রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নতুন গাছ রোপণের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে সরকার। পরিবেশ দূষণ রোধে যা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে। এছাড়াও বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার দিকেও নজর দিয়েছে রাজ্য বনদপ্তর।
পারমাদন বা বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে পা রাখলে, সতেজতা, মুক্ত অক্সিজেন, নদীর উপর মৃদু মন্দ বাতাসের ছোঁয়া, হরিণের দাপাদাপি, চেনা ইতিহাসের চিহ্ন, পাখির কলরব আর তার সঙ্গে সবুজ ভেদ করে এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ জেঁকে বসে মনে। শহরের কোলাহল থেকে খানিক দূরে নিরিবিলিতে ইছামতীর ধারে এই সবুজের সন্ধান নাগরিক জীবনের এক পরম তৃপ্তি। সবুজের আচ্ছন্নতা, পশু-পাখির অবাধ বিচরণ ও নদীর স্নিগ্ধতা সব মিলিয়ে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য মনে গেঁথে রাখার মতো।
সূত্র – রাজ্য বনদপ্তরের ফেসবুক পেজ।